করোনাকালে চাকরি হারিয়ে মৌচাষে সফল শাহ আলম

করোনাকালের দুঃসময় এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা। অনেকের জন্য সেই সময় ছিল শুধু অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার নাম। চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন হাজারো মানুষ। কিন্তু সেই দুর্যোগের মাঝেও কেউ কেউ খুঁজে নিয়েছেন নতুন পথ, নতুন স্বপ্ন। তেমনই একজন মোহাম্মদ শাহ আলম, চাকরি হারিয়ে মৌচাষকে বেছে নিয়ে আজ হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার মধুপুর গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মোহাম্মদ শাহ আলম। তার সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। উদ্যোক্তা শাহ আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার আগে নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। নিয়মিত বেতনের চাকরি, মোটামুটি স্বচ্ছল জীবন। সবই চলছিল স্বাভাবিক। ২০২০ সালে করোনা এসে সব হিসাব উল্টে-পাল্টে দেয়। চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন তিনি। চাকরি হারিয়ে প্রথমদিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শাহ আলম। সংসারের খরচ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যান। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিশ্রম করলে পথ বের হবেই। এমন সময় ইউটিউবে মৌবাক্স দিয়ে মধু চাষের ভিডিও দেখে তিনিও কিছু করতে আগ্রহী হন। পরে গাজীপুর বিসিক থেকে মৌ

করোনাকালে চাকরি হারিয়ে মৌচাষে সফল শাহ আলম

করোনাকালের দুঃসময় এখনো মানুষের স্মৃতিতে তাজা। অনেকের জন্য সেই সময় ছিল শুধু অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার নাম। চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন হাজারো মানুষ। কিন্তু সেই দুর্যোগের মাঝেও কেউ কেউ খুঁজে নিয়েছেন নতুন পথ, নতুন স্বপ্ন। তেমনই একজন মোহাম্মদ শাহ আলম, চাকরি হারিয়ে মৌচাষকে বেছে নিয়ে আজ হয়েছেন সফল উদ্যোক্তা।

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার মধুপুর গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মোহাম্মদ শাহ আলম। তার সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। উদ্যোক্তা শাহ আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার আগে নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। নিয়মিত বেতনের চাকরি, মোটামুটি স্বচ্ছল জীবন। সবই চলছিল স্বাভাবিক। ২০২০ সালে করোনা এসে সব হিসাব উল্টে-পাল্টে দেয়। চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন তিনি।

চাকরি হারিয়ে প্রথমদিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন শাহ আলম। সংসারের খরচ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছু মিলিয়ে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যান। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিশ্রম করলে পথ বের হবেই। এমন সময় ইউটিউবে মৌবাক্স দিয়ে মধু চাষের ভিডিও দেখে তিনিও কিছু করতে আগ্রহী হন।

পরে গাজীপুর বিসিক থেকে মৌমাছি ও মধু উৎপাদন সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ নেন। মৌমাছির জীবন, মধু সংগ্রহ, মৌবাক্স ব্যবস্থাপনা—সবকিছু ধীরে ধীরে শেখা শুরু করেন। প্রশিক্ষণ শেষে বুঝতে পারেন, মধু চাষই হতে পারে তার নতুন জীবনের অবলম্বন। সাহস করে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২৫টি মৌবাক্স কিনে শুরু করেন মধু চাষ। শুরুটা সহজ ছিল না। মৌমাছির যত্ন, আবহাওয়ার প্রভাব, ফুলের প্রাপ্যতা—সবকিছুই ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তবুও ধৈর্য আর পরিশ্রম দিয়ে ধীরে ধীরে কাজ এগিয়ে নেন। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস।

jagonews

চলতি বছরে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের জন্য জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় এসেছেন শাহ আলম। বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি মৌবাক্স। বর্তমানে এ উদ্যোক্তার কাছে আছে ১৫০টি মৌবাক্স। প্রতিটি বাক্স থেকে দেড় থেকে ২ কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ হচ্ছে।

সরিষার মধুর পাশাপাশি লিচু ফুলের মধু, কালোজিরার মধু এবং সুন্দরবনের খাঁটি মধুও মৌবাক্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। বছরের ৬ থেকে ৮ মাস তাকে এ কাজেই ব্যস্ত থাকতে হয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় ফুলের মৌসুম অনুযায়ী মৌবাক্স নিয়ে ছুটে বেড়াতে থাকেন। সংগ্রহ করা মধু তিনি মূলত পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। শাহ আলমের এই মৌচাষ অন্যদের কর্মসংস্থানেরও মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যেখানে চারজন শ্রমিক কাজ করছেন।

মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘সরিষা ফুলের মধুর জন্য জামালপুরে এসেছি। এখানে সরিষার আবাদ অনেক হয়। প্রথম প্রথম মধু কম সংগ্রহ হলেও গত দুই বছর ধরে ভালো হচ্ছে। ১০ দিন পর পর বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করি। এই মৌসুমে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার সরিষার মধু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।’

আরও পড়ুন
মাগুরায় মধু চাষে বাবা-ছেলের বাজিমাত 
বান্দরবানে বাড়ছে মৌচাষ, রয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা 

তিনি বলেন, ‘সরিষার পাশাপাশি লিচু ফুলের, কালোজিরার মধু এবং সুন্দরবনের খাঁটি মধুও মৌবাক্সের মাধ্যমে সংগ্রহ করি। সরিষা ও লিচু ফুলের মধু সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। পাইকারি প্রতিটি মণ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করি। কালোজিরার মধু এবং সুন্দরবনের খাঁটি মধু যদিও কম পরিমাণে পাওয়া যায়, তবে এর দাম তুলনামূলক বেশি।’

jagonews

বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘ভালো মানের খাঁটি মধু হওয়ায় বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না। নিয়মিত ক্রেতারা আগেভাগেই অর্ডার দিয়ে রাখেন। ক্ষেত থেকেই বিভিন্ন কোম্পানি মধু নিয়ে যায়। এ ছাড়া খুচরাও অনেকেই কেনেন।’

মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘মধু চাষ থেকে পাওয়া আয়ের বড় একটি অংশ সঞ্চয় না করে সংসার চালানোর পাশাপাশি পুঁজিতে পরিণত করছি। প্রতি বছর আয় থেকে নতুন করে মৌবাক্স কিনে সংখ্যা বৃদ্ধি করছি। একটি মৌবাক্সের দাম ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। শুরুতে আমার ছিল মাত্র ২৫টি বাক্স, আজ ১৫০টি বাক্স। যা বর্তমানে আমার বিশাল পুঁজি।’

তিনি বলেন, ‘বর্ষাকাল বা ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিদের চিনি খাওয়াতে হয়। এতে ৩-৫ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। এ ছাড়া পরিবহন, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলেও প্রতি বছর মোটা অঙ্কের লাভ থাকে।’

মৌচাষই বদলে দিয়েছে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার চিত্র। ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর আতঙ্ক নয় বরং আত্মবিশ্বাস নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন মোহাম্মদ শাহ আলম। এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘চাকরি হারানোটা তখন অনেক কষ্টের ছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, ওই ঘটনাই আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। যদি সাহস না করতাম, তাহলে আজ এই অবস্থানে আসতে পারতাম না।’

jagonews

শাহ আলমের এই গল্প শুধু একজন মানুষের সাফল্যের গল্প নয়; এটি হাজারো বেকার যুবক ও কর্মহীন মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। প্রমাণ করে—সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ দিয়েও সম্মানজনক জীবন গড়া সম্ভব। মৌমাছির গুঞ্জনের মাঝেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন জীবনের নতুন দিশা—যার নাম স্বনির্ভরতা, আত্মসম্মান ও সাফল্য।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow