কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮

উড়ো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পায়ে হেঁটেই মহাত্মা গান্ধী সড়কে উঠতে হলো। রাস্তা পার হতে হতেই মেঘভাঙা বৃষ্টি নামলো। কোনোমতে আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের সামনে আশ্রয় নিয়েছি। কাপড় কেনার অজুহাতে শাম্মি আপা স্টোরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমি আর সানি বাইরে অপেক্ষা করছি। আদি মোহনী মোহন কাঞ্জিলাল ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শাড়ির ব্র্যান্ড। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি মূলত বাংলার ঐতিহ্যবাহী জামদানি, বেনারসি, বালুচরি, ঢাকাই মসলিন ও তাঁত শিল্পের জন্য দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। পথের ধারে কোনো গাড়ি থেমে নেই। ব্যস্ত নগরীর সব বাহন শুধুই ছুটছে। প্রায় আধঘণ্টা পর বৃষ্টির গতি কিছুটা কমলো। ঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সড়কে দাঁড়াতে হলো। এই আবহাওয়ায় ২০০ রুপির কমে শিয়ালদহ স্টেশনে যেতে কোনো ট্যাক্সিই রাজি না। শেষ পর্যন্ত একটি তিন চাকার অটো পেলাম। বাংলাদেশে এই বাহন বেবি ট্যাক্সি কিংবা টেম্পু বলেই বেশি পরিচিত। আমাদের ওখানে এই বাহন এখন বিলুপ্ত। যে কটা আছে সেগুলো বেকারির রুটি-বিস্কুট বহন করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এই অটোর পেছনে তিনজন আর চালকের দুইপাশে দুজন বসতে পারেন। শিয়ালদহ যেত

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮

উড়ো বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পায়ে হেঁটেই মহাত্মা গান্ধী সড়কে উঠতে হলো। রাস্তা পার হতে হতেই মেঘভাঙা বৃষ্টি নামলো। কোনোমতে আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের সামনে আশ্রয় নিয়েছি। কাপড় কেনার অজুহাতে শাম্মি আপা স্টোরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমি আর সানি বাইরে অপেক্ষা করছি। আদি মোহনী মোহন কাঞ্জিলাল ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শাড়ির ব্র্যান্ড। ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি মূলত বাংলার ঐতিহ্যবাহী জামদানি, বেনারসি, বালুচরি, ঢাকাই মসলিন ও তাঁত শিল্পের জন্য দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। পথের ধারে কোনো গাড়ি থেমে নেই। ব্যস্ত নগরীর সব বাহন শুধুই ছুটছে। প্রায় আধঘণ্টা পর বৃষ্টির গতি কিছুটা কমলো। ঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সড়কে দাঁড়াতে হলো। এই আবহাওয়ায় ২০০ রুপির কমে শিয়ালদহ স্টেশনে যেতে কোনো ট্যাক্সিই রাজি না। শেষ পর্যন্ত একটি তিন চাকার অটো পেলাম। বাংলাদেশে এই বাহন বেবি ট্যাক্সি কিংবা টেম্পু বলেই বেশি পরিচিত। আমাদের ওখানে এই বাহন এখন বিলুপ্ত। যে কটা আছে সেগুলো বেকারির রুটি-বিস্কুট বহন করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। এই অটোর পেছনে তিনজন আর চালকের দুইপাশে দুজন বসতে পারেন। শিয়ালদহ যেতে জনপ্রতি ১৫ রুপি খরচ হবে।

সময় গড়াচ্ছে। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই অটো নিয়ে ছুটলাম। শিয়ালদহ স্টেশনের কাছাকাছি এসে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো। মাথায় হাত রেখে কোনোরকমে একটা মার্কেটে আশ্রয় নিলাম। কোথায় আছি বুঝতে পারছি না? বৃষ্টিতে ঠিকানাতেও নজর দিতে পারিনি।

সেক্টর ফাইভে যেতে ধরতে হবে মেট্রো। অন্যথায় ৩০০-৪০০ রুপি খরচ করে নিউটাউন পৌঁছতে হবে। আর শিয়ালদহ মেট্রো থেকে সেক্টর ফাইভ মাত্র ২০ রুপি ভাড়া। ট্রাফিক সিগন্যালের ঝামেলা নেই, বিদ্যুৎ গতিতে ট্রেন ছুটবে। পথ চিনতে অসুবিধা হচ্ছে। এক ঘড়ি মেকানিকের সাহায্য চাইলাম।
‌‘এই যে দাদা বলবে, এখান থেকে মেট্রোস্টেশনে কিভাবে যাব?’
‘এই মার্কেটের শেষ সীমানায়।’
‘তো কতক্ষণ লাগবে যেতে?’
‘বৃষ্টি পড়ছে, তোমাদের হাতে তো ছাতা দেখছি না। ৫ মিনিট হাঁটতে হবে।’
‘এরপর?’
‘শেষ সীমানায় পৌঁছে হাতের বা পাশে খেয়াল করবে। তবেই মেট্রো দেখতে পাবে।’

ঘড়ি মেকানিকের বুঝিয়ে দেওয়ার পরও পথ গুলিয়ে ফেলেছি। কাদা পথ মাড়িয়ে মেট্রো ছেড়ে অনেকদূর চলে এসেছি। আবার উল্টো পথ ঘুরে কিছু পথ হাঁটতেই গোলাকৃতির একটি ভবন চোখে পড়লো। এটাই ভূগর্ভস্থ মেট্রোস্টেশন। একতলার কিছুটা বেশি গভীরের আন্ডারগ্রাউন্ডে নেমে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। সেখান থেকে চলন্ত সিঁড়িতে আরও নিচে নেমে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। শিয়ালদহ আর এসপ্লান্ডে এখনো যুক্ত হয়নি। এটা হলেই গোটা শহরের ভূগর্ভস্থ মেট্রোলাইন ছেয়ে যাবে।

akash

আমাদের গন্তব্য সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। জনপ্রতি ভাড়া ২০ রুপি। তিনটি কিউআর কোডসংবলিত টোকেন আকৃতির কাগজ দেওয়া হলো। সেই কোড স্ক্যান করেই নিরাপত্তা গেট পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে হয়। আমরা পৌঁছানোর আগেই প্ল্যাটফর্ম যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিল। ট্রেন আসতেই মুহূর্তের মধ্যে ভরে গেল। এখানে নারী-পুরুষ সমান। যে যেখানে সিট পেয়েছে বসে পড়ছে। মেট্রোতে এত ভিড় যে, শরীরটা ঠিকঠাক ঘোরানো কষ্টকর।

শিয়ালদহ থেকে ফুলবাগান স্টেশনে এসে থামল মেট্রো। এই পুরো অংশটাই মাটির নিচ দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে ট্রেন সুড়ঙ্গ ছেড়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। সল্ট লেক স্টেডিয়াম স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই হঠাৎ বদলে গেল চারপাশের দৃশ্য। অন্ধকার কংক্রিটের দেওয়াল সরে গিয়ে জানালার বাইরে ভেসে উঠল অন্য এক কলকাতা।

পুরোনো শহরের ভিড়, সরু রাস্তা আর শতবর্ষী ভবনের জায়গায় এখানে প্রশস্ত সড়ক, সারি সারি গাছ আর কাচে মোড়ানো বহুতল ভবন। মনে হচ্ছিল, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে চলে এসেছি। দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিবেকানন্দ যুব ভারতী ক্রীড়াঙ্গন। ফুটবলের শহর কলকাতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এটি। বেঙ্গল কেমিক্যাল স্টেশন পেরোতেই পাওয়া গেল পুরোনো শিল্পাঞ্চল আর আধুনিক অফিসপাড়ার মিশেলে নতুন এক বাণিজ্যনগরী।

সিটি সেন্টার ক্রস করছে মেট্রো। জানালায় চোখ রাখতেই জমজমাট শপিং মল, ক্যাফে আর তরুণদের আড্ডাখানা দেখার সুযোগ হলো। এরপর সেন্ট্রাল পার্ক, করুণাময়ী পেরিয়ে সবশেষে সেক্টর ফাইভ। এই স্টেশনের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আইটি অফিস, কাচে মোড়ানো বহুতল আর ব্যস্ত এক এলাকা।

পর্যটক হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর লেগেছে এই বৈপরীত্য। একদিকে কলেজ স্ট্রিট, শিয়ালদহ আর উত্তর কলকাতার শতবর্ষী ঐতিহ্য। অন্যদিকে মাত্র কয়েক মিনিটের মেট্রোযাত্রায় কাচে মোড়া আধুনিক নগরসভ্যতা। মনে হচ্ছিল, একই শহরের ভেতর দুটি আলাদা সময় পাশাপাশি বাস করছে।

akash

আধঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই লাইনের শেষ পথ সেক্টর ফাইভে পৌঁছে গেলাম। সেখান থেকে নেমে আইটি পার্ক পেরিয়ে ইলেকট্রিক বাস ধরে সোজা বিশ্ববাংলা চত্বর। নিউটাউনের প্রতীক হয়ে ওঠা স্থাপনাটি বিশাল এক বৃত্তাকার রিংয়ের মতো আকাশে ঝুলে আছে। মাঝখানে রয়েছে কাচঘেরা রেস্তোরাঁ, যেখান থেকে পুরো নিউটাউনকে পাখির চোখে দেখা যায়।

এর পাশেই বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্র ইকো পার্ক। এই পার্কের তিন ও চার নম্বর গেটের মাঝামাঝি আছে মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম। ইকো পার্কের ধারে অসংখ্য ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অপেক্ষা করছে। এই গাড়িগুলো মূলত ইকোপার্কের নানান গেটে নিয়ে পর্যটকদের নামিয়ে দেয়। এর বাইরে আর কিছু চেনাজানা নেই বেশি।
‘মাদারওয়াক্স মিউজিয়াম যাবে?’
‘এটা কোথায়?’
‘এখানে তো এমন কিছু দেখছি নে?’
অটোচালকের এই কথা শোনার পর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এতদূর থেকে এসে এত বড় ধোকা?

একে তো এখনো দুপুরের খাবার পেটে যায়নি। তার সঙ্গে লোকেশন নিয়ে ধাঁধার পাক! শাম্মি আপা আর সানির চোখগুলো মুহূর্তেই আগুনে গোলা হয়ে গেল। আমি তো তাদের চোখে চোখ রাখতেই ভয় পাচ্ছি। সকালবেলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মভিটায় যে ধাক্কাটা খেয়েছি, এখানেও বোধহয় সেটা হতে যাচ্ছে!

শাম্মি আপাকে ঠান্ডা থাকতে বললাম। সঙ্গে এ-ও বললাম, ‘আপা, ইন্টারনেটটা একটু শেয়ার করুন। গুগল ম্যাপ তো ঠিকই দেখাচ্ছে ইকো পার্কের তিন নম্বর গেটের কাছাকাছিই মাদারওয়াক্স মিউজিয়াম। তবু কেন কেউ কিছু চিনছে না?’ একপ্রকার অনিশ্চিয়তা নিয়েই অটোরিকশা নিয়ে এগোলাম। সে-ই সাহসিকতায় আমাদের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। ইকো পার্কের অপজিটে বিশাল ভবনে বড় বড় অক্ষরে লেখা মাদার ওয়াক্স মিউজিয়াম।

akash

মূলভবনে প্রবেশ করে ২৫০ রুপিতে তিনটা টিকিট সংগ্রহ করেছি। এরপর লিফটে করে সবচেয়ে ওপরের গ্যালারিতে প্রবেশ করেছি আমরা। এটাই ঘুরে ঘুরে ধীরে ধীরে নিচের তলার দিকে নামতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম এই স্থাপনার প্রতিটি পরতে পরতে গোটা বিশ্বের মহাতারকাদের স্মৃতিচিহ্ন ঠাঁই পেয়েছে। সেই আলোচনা হবে পরের পর্বে।

চলবে...

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow