কালাই বড়িতেই ঘুরছে অর্থের চাকা, বদলাচ্ছে শত কারিগরের জীবন

ভোরের আলো ঠিকমতো ছড়িয়ে পড়ার আগেই রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের কাশিয়াপুকুর গ্রাম জেগে ওঠে। গ্রামের পাকা রাস্তার দুই ধারে সারি সারি চাটাই পাতা থাকে আগের রাত থেকেই। তার ওপর গোল গোল করে সাজানো কালাই ডালের বড়ি। রোদের প্রথম ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে শুকাতে থাকা এসব বড়ির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শত বছরের ঐতিহ্য আর কয়েকশ মানুষের জীবিকার গল্প। বাপ-দাদার সময় থেকে চলে আসা এই বড়ি তৈরির কাজই কাশিয়াপুকুর গ্রামের প্রায় ২০০টি পরিবারের প্রধান অবলম্বন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা ধরে রেখেছেন এ ব্যতিক্রমী পেশা। এখন এই বড়ি বিক্রি করেই প্রতিটি পরিবার মাসে গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন, যা তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে। শীত ও শুষ্ক মৌসুম এলেই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে শুরু হয় নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞ। তখন যেন ঘুমেরও অবকাশ নেই। রাত ১২টার দিকে মাশকলাইয়ের ডাল, কুমড়া আর আতপ চাল ভিজিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে বড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়। রাত ৩টায় শীতের ঠান্ডা পানি ব্যবহার করেই ডাল ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর মেশিনে পিষে ভোর হওয়ার আগেই বড়ি বানানোর উপযোগী মিশ্রণ তৈরি করা হয়। সকাল ৬টা থেকেই নারী-পুরুষ সবাই মিলে চা

কালাই বড়িতেই ঘুরছে অর্থের চাকা, বদলাচ্ছে শত কারিগরের জীবন

ভোরের আলো ঠিকমতো ছড়িয়ে পড়ার আগেই রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের কাশিয়াপুকুর গ্রাম জেগে ওঠে। গ্রামের পাকা রাস্তার দুই ধারে সারি সারি চাটাই পাতা থাকে আগের রাত থেকেই। তার ওপর গোল গোল করে সাজানো কালাই ডালের বড়ি। রোদের প্রথম ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে শুকাতে থাকা এসব বড়ির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শত বছরের ঐতিহ্য আর কয়েকশ মানুষের জীবিকার গল্প।

বাপ-দাদার সময় থেকে চলে আসা এই বড়ি তৈরির কাজই কাশিয়াপুকুর গ্রামের প্রায় ২০০টি পরিবারের প্রধান অবলম্বন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা ধরে রেখেছেন এ ব্যতিক্রমী পেশা। এখন এই বড়ি বিক্রি করেই প্রতিটি পরিবার মাসে গড়ে ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় করছেন, যা তাদের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে।

শীত ও শুষ্ক মৌসুম এলেই গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে শুরু হয় নিরবচ্ছিন্ন কর্মযজ্ঞ। তখন যেন ঘুমেরও অবকাশ নেই। রাত ১২টার দিকে মাশকলাইয়ের ডাল, কুমড়া আর আতপ চাল ভিজিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে বড়ি তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়। রাত ৩টায় শীতের ঠান্ডা পানি ব্যবহার করেই ডাল ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর মেশিনে পিষে ভোর হওয়ার আগেই বড়ি বানানোর উপযোগী মিশ্রণ তৈরি করা হয়। সকাল ৬টা থেকেই নারী-পুরুষ সবাই মিলে চাটাইয়ে সারি সারি বড়ি সাজাতে থাকেন। টানা তিন থেকে চার দিন রোদে শুকানোর পরই বাজারজাতের জন্য বড়ি প্রস্তুত হয়।

এই বড়ির কদর এখন আর শুধু পুঠিয়া বা রাজশাহী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি দিনাজপুরের হিলি বন্দর হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যাচ্ছে পুঠিয়ার কালাই বড়ি। ফলে কৃষক-কৃষাণিরা আর্থিকভাবে হচ্ছেন আরও লাভবান। অনেক পরিবার এই আয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন, কেউ আবার ঘর সংস্কার কিংবা নতুনভাবে জীবন সাজানোর স্বপ্ন দেখছেন।

পুঠিয়ার কালাই বড়ির ইতিহাস ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে— একসময় এই বড়ি পুঠিয়ার রাণী ভুবন মোহনী দেবীরও প্রিয় খাবার ছিল। রাজপরিবারের রান্নাঘর থেকে সাধারণ মানুষের হাঁড়িতে জায়গা করে নেওয়া এই বড়ি যুগ যুগ ধরে বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।

কাশিয়াপুকুর গ্রামের মো. নুরুল ইসলাম বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকেই কুমড়াবড়ি তৈরি আমাদের একমাত্র পেশা। বাপ-দাদার মুখে শুনেছি, এই বড়ি পুঠিয়া রানীও খেয়েছেন। এটি তার খুব প্রিয় খাবার ছিল।

ওই গ্রামের কৃষক সেকেন্দার আলী বলেন, প্রত্যেকদিন প্রায় দুই মণ কালাই দিয়ে এই বড়ি তৈরি করি। এই বড়ি রাজশাহীর বিভিন্ন বাজারে পাইকারি বিক্রি করি। প্রতি কেজি বড়ি ১৬০ থেকে মানভেদে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। কৃষকসহ আনুষঙ্গিক সব খরচ বাদ দিয়ে আমার মাসে প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হয়।

একই গ্রামের কৃষানি নাজমা খাতুন বলেন, ভোরের আলো ফোটার আগেই চার-পাঁচজন কাজের মহিলা এসে এই বড়ি তৈরির কাজ শুরু করে। তাদেরকে প্রত্যেককে দৈনিক ৭০ টাকা করে মাইনা দেওয়া হয়। আমার অন্য কোনো পেশা নেই, এটি আমার মূল পেশা। এখান থেকে যে আয় আসে তা দিয়েই সংসার চালাই। 

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ মিতা সরকার কালবেলাকে বলেন, বাঙালি কৃষ্টি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই বড়ি কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। আমরা এই কালাই বড়ির প্রধান উপকরণ মাষকলাই চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। যাতে করে এই বড়ি তৈরিতে কৃষকরা আরও বেশি উৎসাহ পায়। পরিকল্পিত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী শিল্পে রূপ নিতে পারে। 

তিনি আরও বলেন, কাশিয়াপুকুর গ্রাম ছাড়াও পুঠিয়া উপজেলার উজানখলশি ইউনিয়নের আড়ইল গ্রামেও এখনো টিকে আছে বাপ–দাদার এই আদি পেশা। সেখানকার কৃষক-কৃষকরাও একইভাবে বড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের কাছে এই বড়ি কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি তাদের পরিচয়, তাদের শ্রমের সম্মান আর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার এক জীবন্ত উদাহরণ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow