কিচেনে চিৎকার নয়, চাই মেন্টরশিপ

শেফ মোহাম্মদ অলিউর এক সময় কিচেন মানেই ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, ভয়ভীতি আর চিৎকার-চেঁচামেচির পরিবেশ। জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই দেখা যেত একজন শেফের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান অস্ত্র হলো উচ্চস্বরে ধমক, অপমান কিংবা তীব্র মানসিক চাপ। ফলে অনেকের কাছেই ধারণা তৈরি হয়েছিল—একজন সফল শেফ হতে হলে কঠোর এবং ভয়ঙ্কর হওয়াই যেন একমাত্র পথ।কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক বিশ্বে কিচেন লিডারশিপের ধারণাও বদলে যাচ্ছে দ্রুত। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার কিচেনগুলো এখন আর ‘ভয়ভিত্তিক নেতৃত্বে’ বিশ্বাস করে না। বরং সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে মেন্টরশিপ, পারস্পরিক সম্মান, টিমওয়ার্ক এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স। ইউরোপীয়ান কুইজিন স্পেশালিস্ট ও কিচেন প্রফেশনাল শেফ মোহাম্মদ অলিউরের মতে, একজন শেফের প্রকৃত দক্ষতা কেবল তার রান্নার মানে নয়, বরং তিনি কীভাবে একটি টিমকে গড়ে তুলছেন এবং ভবিষ্যতের দক্ষ শেফ তৈরি করছেন, তার ওপরও নির্ভর করে। ইউরোপের কিচেন থেকে শেখার বিষয় ইউরোপের অধিকাংশ আধুনিক কিচেনে কাজের চাপ অত্যন্ত বেশি। সেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য রয়েছে। তবে সেই চাপ সামলানোর পদ্ধতিতে রয়েছে বড় পার্থক্য। ভয় বা অপমানের পরিবেশ কখনো

কিচেনে চিৎকার নয়, চাই মেন্টরশিপ

শেফ মোহাম্মদ অলিউর

এক সময় কিচেন মানেই ছিল কঠোর শৃঙ্খলা, ভয়ভীতি আর চিৎকার-চেঁচামেচির পরিবেশ। জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই দেখা যেত একজন শেফের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান অস্ত্র হলো উচ্চস্বরে ধমক, অপমান কিংবা তীব্র মানসিক চাপ।

ফলে অনেকের কাছেই ধারণা তৈরি হয়েছিল—একজন সফল শেফ হতে হলে কঠোর এবং ভয়ঙ্কর হওয়াই যেন একমাত্র পথ।কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক বিশ্বে কিচেন লিডারশিপের ধারণাও বদলে যাচ্ছে দ্রুত।

ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পেশাদার কিচেনগুলো এখন আর ‘ভয়ভিত্তিক নেতৃত্বে’ বিশ্বাস করে না। বরং সেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে মেন্টরশিপ, পারস্পরিক সম্মান, টিমওয়ার্ক এবং ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স।

ইউরোপীয়ান কুইজিন স্পেশালিস্ট ও কিচেন প্রফেশনাল শেফ মোহাম্মদ অলিউরের মতে, একজন শেফের প্রকৃত দক্ষতা কেবল তার রান্নার মানে নয়, বরং তিনি কীভাবে একটি টিমকে গড়ে তুলছেন এবং ভবিষ্যতের দক্ষ শেফ তৈরি করছেন, তার ওপরও নির্ভর করে।

ইউরোপের কিচেন থেকে শেখার বিষয়

ইউরোপের অধিকাংশ আধুনিক কিচেনে কাজের চাপ অত্যন্ত বেশি। সেখানে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য রয়েছে। তবে সেই চাপ সামলানোর পদ্ধতিতে রয়েছে বড় পার্থক্য।

ভয় বা অপমানের পরিবেশ কখনো সৃজনশীলতা তৈরি করতে পারে না। কর্মীরা হয়তো ভয়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মবিশ্বাস, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং কর্মদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইউরোপের অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন এক্সিকিউটিভ শেফ এবং একজন কমি শেফের দায়িত্ব ও অবস্থানে পার্থক্য থাকলেও মানুষ হিসেবে সম্মানের ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন রাখা হয় না। ভুল হলে প্রকাশ্যে অপমান না করে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সমাধানের পথ দেখানো হয়।

একই সঙ্গে সেখানে কিচেন পরিচালিত হয় একটি নির্দিষ্ট সিস্টেমের মাধ্যমে, কোনো ব্যক্তির মেজাজ বা ব্যক্তিগত ইগোর মাধ্যমে নয়। ফলে কর্মপরিবেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও পেশাদার থাকে।

‘বস’ এবং ‘মেন্টর শেফ’-এর মধ্যে পার্থক্য

একজন সাধারণ বস তার ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিতে চান। অন্যদিকে একজন মেন্টর শেফ নিজের টিমকে দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

ভুলের ক্ষেত্রে একজন কর্তৃত্ববাদী নেতা কর্মীকে দোষারোপ করেন, কিন্তু একজন মেন্টর ভুলের কারণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে তা এড়ানোর কৌশল শেখান। নলেজ শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। অনেক জায়গায় এখনো দেখা যায়, কিছু সিনিয়র শেফ নিজেদের বিশেষ রেসিপি বা কৌশল গোপন রাখতে চান।

বিপরীতে আধুনিক কিচেন সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়—জ্ঞান যত বেশি ভাগ করা হবে, পুরো টিম তত বেশি শক্তিশালী হবে।টিমওয়ার্কের ক্ষেত্রেও মেন্টরশিপভিত্তিক নেতৃত্বের গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ একটি সফল ডিশ তৈরি হওয়া থেকে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ একাধিক মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল।

বাংলাদেশের কিচেন সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন

দেশের হোটেল ও রেস্টুরেন্ট খাতে দক্ষ জনবল সংকটের অন্যতম কারণ হলো কর্মক্ষেত্রের নেতিবাচক পরিবেশ। অনেক তরুণ স্বপ্ন নিয়ে এই পেশায় এলেও দীর্ঘ সময় মানসিক চাপ, অপমানজনক আচরণ এবং অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের কারণে তারা পেশা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। ফলে দক্ষ জনবল তৈরি এবং ধরে রাখা—দুই ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানের হসপিটালিটি ও কালিনারি ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হলে কিচেনের নেতৃত্বের ধরণ পরিবর্তন করা জরুরি। ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে কাজ আদায় করা সম্ভব হলেও তা কখনো দীর্ঘমেয়াদি আনুগত্য, শ্রদ্ধা বা পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।

মানুষের মন পোড়ানোর জন্য নয় কিচেনের আগুন

শেফ মোহাম্মদ অলিউর বলেন, কিচেনের আগুন রান্নার জন্য, মানুষের মন পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য নয়। একজন প্রকৃত শেফের সাফল্য শুধু তার সিগনেচার ডিশে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার কিচেন থেকে কতজন দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং পেশাদার শেফ তৈরি হয়েছে, সেটিও তার সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

তার মতে, বাংলাদেশের কালিনারি সেক্টরকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হলে একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্বের পরিবর্তে মেন্টরশিপ, সম্মান এবং শেখানোর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে কারণ আধুনিক কিচেন আর চিৎকার করা ‘বস’ খুঁজছে না; তারা খুঁজছে এমন একজন মেন্টর, যিনি মানুষ গড়তে জানেন।

লেখক: শেফ মোহাম্মদ অলিউর
ইউরোপীয়ান কুইজিন স্পেশালিস্ট, কিচেন প্রফেশনাল

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow