কিডনি প্রতিস্থাপনে আইনি জটিলতা, বিদেশে ছুটছেন রোগীরা

উন্নত বিশ্বে প্রায় ৭০ শতাংশ কিডনি প্রতিস্থাপনই সম্পন্ন হয় মরণোত্তর কিডনি দাতার (ক্যাডাভেরিক) মাধ্যমে। তবে আইনি জটিলতা এবং সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে এখনো এই মরণোত্তর অঙ্গদান কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। ফলে দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা যাচ্ছেন। সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ষষ্ঠ বাংলাদেশ কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন ‘জীবন্ত এবং মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন, ২০২৬’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে। সভায় উপস্থিত ছিলেন কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, কোরিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুরি এন এবং অস্ট্রেলিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরিমি চ্যাপম্যানসহ আরও অনেকে। উন্নত বিশ্বে মরণোত্তর অঙ্গদানই প্রধান ভরসা সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত বিশ্বে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও বিশ্বমানের হাসপাতাল সুবিধা রয়েছে। সেখানে মৃত্যুর আগে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার ব্যা

কিডনি প্রতিস্থাপনে আইনি জটিলতা, বিদেশে ছুটছেন রোগীরা

উন্নত বিশ্বে প্রায় ৭০ শতাংশ কিডনি প্রতিস্থাপনই সম্পন্ন হয় মরণোত্তর কিডনি দাতার (ক্যাডাভেরিক) মাধ্যমে। তবে আইনি জটিলতা এবং সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশে এখনো এই মরণোত্তর অঙ্গদান কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। ফলে দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মারা যাচ্ছেন।

সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ষষ্ঠ বাংলাদেশ কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য জানান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন ‘জীবন্ত এবং মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন, ২০২৬’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, কোরিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুরি এন এবং অস্ট্রেলিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরিমি চ্যাপম্যানসহ আরও অনেকে।

উন্নত বিশ্বে মরণোত্তর অঙ্গদানই প্রধান ভরসা

সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত বিশ্বে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো ও বিশ্বমানের হাসপাতাল সুবিধা রয়েছে। সেখানে মৃত্যুর আগে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।

তারা আরও উল্লেখ করেন, জীবিত নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি নিলে দাতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। তাই উন্নত দেশগুলোতে মরণোত্তর অঙ্গদানকেই প্রধান বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অঙ্গ সংযোজন আইন কিছুটা সহজ করা হলেও মরণোত্তর প্রতিস্থাপন এখনো সেভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।

বছরে প্রয়োজন ১০ হাজার, হচ্ছে মাত্র ২৫০

তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। তবে নানা সীমাবদ্ধতায় দেশে বছরে গড়ে মাত্র ২৫০ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।

দেশে আইনি জটিলতা এড়াতে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে (যেমন- ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড) গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা গেলে এই বিপুল সংখ্যক রোগীর দেশেই চিকিৎসা সম্ভব হতো, যা দেশের চিকিৎসাসেবার ওপর আস্থা বাড়াবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।

আইন সংশোধন ও দাতা সংকট

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে প্রথম ‌‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ পাস হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে এই আইন কিছুটা সংশোধন করা হলেও তা এখনো চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। বিদ্যমান সংশোধনী অনুযায়ী, নির্ধারিত ২৩ জন নিকটাত্মীয়ের বাইরে অন্য কেউ কোনো রোগীকে কিডনি দান করতে পারেন না। অথচ ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আত্মীয় না হলেও মানবিক কারণে বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিডনি দানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তীব্র দাতা সংকট তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৭৫ কোটি রোগীই জানেন না যে এই প্রাণঘাতী রোগটি নীরবে তাদের কিডনি বিকল করে দিচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত হন, যার ৮৫ শতাংশই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগী সঠিক চিকিৎসার অভাবে সংকটাপন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবেন।

সেমিনারে বক্তারা দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন বাড়াতে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি মরণোত্তর অঙ্গদানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানান।

এসইউজে/এসএনআর 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow