কুকুরের মুখ থেকে সামুদ্রিক কচ্ছপের ১২০টি ডিম উদ্ধার, পুনর্জন্মের আশা
কক্সবাজারের দরিয়ানগর সমুদ্রসৈকতে বালুচরে একদল বেওয়ারিশ কুকুর সামুদ্রিক মা কচ্ছপের ডিম টেনে বের করে নষ্ট করছিল। এমন অস্বস্তিকর দৃশ্য চোখে পড়ে স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইউনুসের। তিনি দ্রুত স্থানীয় তরুণদের সহায়তায় ১২০টি ডিম অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন।শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সেহরি ও ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বের হয়ে ভোর আনুমানিক সাড়ে ছয়টার দিকে দরিয়ানগর সৈকতের একটি নির্জন অংশে এই ঘটনাটি দেখতে পান ইউনুস। তিনি জানান, "দেখলাম কুকুরগুলো বালির নিচে কী যেন টেনে বের করছে। কাছে গিয়ে বুঝি, মা কচ্ছপ রাতে ডিম পেড়ে গেছে। কুকুরগুলো সেগুলো নষ্ট করে ফেলছিল।"স্থানীয় কয়েকজন তরুণকে নিয়ে তিনি দ্রুত কুকুরগুলোকে তাড়ান এবং বালু সরিয়ে অক্ষত ডিমগুলো সাবধানে সংগ্রহ করেন। পরে কক্সবাজার জেলা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একজন বনকর্মী ঘটনাস্থলে এসে ডিমগুলো গ্রহণ করেন।উপকূলীয় বন বিভাগের কলাতলী বিট কর্মকর্তা কেচু মারমা বলেন, "উদ্ধার করা ডিমগুলো বন বিভাগের হ্যাচারিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো নিরাপদে সাগরে ছেড়ে দেওয়া হবে।"বিশেষজ্ঞদের মতে, সামু
কক্সবাজারের দরিয়ানগর সমুদ্রসৈকতে বালুচরে একদল বেওয়ারিশ কুকুর সামুদ্রিক মা কচ্ছপের ডিম টেনে বের করে নষ্ট করছিল। এমন অস্বস্তিকর দৃশ্য চোখে পড়ে স্থানীয় পরিবেশকর্মী মোহাম্মদ ইউনুসের। তিনি দ্রুত স্থানীয় তরুণদের সহায়তায় ১২০টি ডিম অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন।
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সেহরি ও ফজরের নামাজ শেষে হাঁটতে বের হয়ে ভোর আনুমানিক সাড়ে ছয়টার দিকে দরিয়ানগর সৈকতের একটি নির্জন অংশে এই ঘটনাটি দেখতে পান ইউনুস। তিনি জানান, "দেখলাম কুকুরগুলো বালির নিচে কী যেন টেনে বের করছে। কাছে গিয়ে বুঝি, মা কচ্ছপ রাতে ডিম পেড়ে গেছে। কুকুরগুলো সেগুলো নষ্ট করে ফেলছিল।"
স্থানীয় কয়েকজন তরুণকে নিয়ে তিনি দ্রুত কুকুরগুলোকে তাড়ান এবং বালু সরিয়ে অক্ষত ডিমগুলো সাবধানে সংগ্রহ করেন। পরে কক্সবাজার জেলা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একজন বনকর্মী ঘটনাস্থলে এসে ডিমগুলো গ্রহণ করেন।
উপকূলীয় বন বিভাগের কলাতলী বিট কর্মকর্তা কেচু মারমা বলেন, "উদ্ধার করা ডিমগুলো বন বিভাগের হ্যাচারিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে সেগুলো নিরাপদে সাগরে ছেড়ে দেওয়া হবে।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামুদ্রিক কচ্ছপ সাধারণত গভীর রাতে নিরিবিলি ও তুলনামূলক নিরাপদ স্থান খুঁজে ডিম পাড়তে আসে। বালিতে গর্ত করে ডিম পেড়ে আবার বালি চাপা দিয়ে সাগরে ফিরে যায়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। এরপর নবজাতক কচ্ছপগুলো নিজেরাই সাগরের দিকে ছুটে যায়।
মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, "এই ডিমগুলোই কচ্ছপের ভবিষ্যৎ। সৈকতে কুকুর, পর্যটকের অসচেতনতা বা যানবাহনের কারণে অনেক সময় ডিম নষ্ট হয়ে যায়। আমরা সময়মতো দেখতে পেরেছি বলেই বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।"
কক্সবাজার উপকূল সামুদ্রিক কচ্ছপের অন্যতম ডিম পাড়ার স্থান হিসেবে পরিচিত। এখানে সাধারণত জলপাই রঙের অলিভ রিডলি প্রজাতির কচ্ছপ বেশি দেখা যায়। আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রজাতি হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলের অবকাঠামো নির্মাণ, আলোক দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং বেওয়ারিশ কুকুরের আক্রমণ- সব মিলিয়ে তাদের প্রজনন প্রক্রিয়া চাপে পড়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, সৈকতে কুকুর নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ডিম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। একই সঙ্গে প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট এলাকাকে ‘নো-ডিস্টার্ব জোন’ ঘোষণা ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পরিবেশ কর্মী এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, "ডিম পাড়ার মৌসুমে সৈকতের কিছু অংশে রাতের আলোকসজ্জা সীমিত রাখা দরকার। শব্দদূষণ কমাতে হবে। আর সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে - বালিতে অস্বাভাবিক গর্ত দেখলে তা নষ্ট না করে বন বিভাগকে জানাতে।"
দরিয়ানগরের এই ঘটনায় স্থানীয়দের তাৎক্ষণিক সাড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উপকূলজুড়ে নজরদারি বাড়ানো হলেও সব সময় ঘটনাস্থলে থাকা সম্ভব হয় না। তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
কেচু মারমা বলেন, "আমরা নিয়মিত টহল দিই এবং হ্যাচারিতে ডিম সংরক্ষণ করি। তবে সাধারণ মানুষ দ্রুত জানালে অনেক ডিম রক্ষা করা সম্ভব হয়।"
সামুদ্রিক কচ্ছপ সাগরের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তারা জেলিফিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণে রাখে। আবার বালুচরে ডিম পাড়ার মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান উপকূলে ছড়িয়ে পড়ে, যা উদ্ভিদ ও ক্ষুদ্র প্রাণীর জন্য সহায়ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মা কচ্ছপ জীবদ্দশায় বহুবার ডিম পাড়তে পারে, কিন্তু ডিম থেকে বাচ্চা হয়ে পূর্ণবয়স্ক কচ্ছপে রূপ নেওয়ার হার খুবই কম। শত ডিম থেকে হয়তো এক বা দুটি কচ্ছপ বড় হতে পারে। তাই প্রতিটি ডিমই মূল্যবান।
উদ্ধার করা ১২০টি ডিম এখন বন বিভাগের হ্যাচারিতে। নির্ধারিত সময় শেষে সেগুলো থেকে বাচ্চা ফুটে বের হলে ছোট্ট কচ্ছপগুলোকে সাগরে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই মুহূর্তটি শুধু প্রকৃতির এক চক্রের পূর্ণতা নয়, বরং একটি বিপন্ন প্রজাতির টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ।
পরিবেশ কর্মীদের মতে, দরিয়ানগরের ভোরের সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় - সৈকতের বালিতে চাপা পড়ে থাকা জীবনকে রক্ষা করতে কখনও কখনও একজন সচেতন মানুষের চোখই যথেষ্ট।
What's Your Reaction?