কোটা সংস্কারের দাবি থেকে ইতিহাস বদলের যাত্রা

২০২৪ সালের ১ জুলাই- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল এই দিনে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে।  দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া সেই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে টানা ৩৬ দিনের কর্মসূচি ১ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়। যদিও এই আন্দোলন ১৫ জুলাই থেকে সহিংস রূপ নেয় এবং ১৬ জুলাই থেকে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাইয়ের শেষদিকে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।  ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। আন্দোলনের প্রেক্ষাপট শুরু হয় ২০১৮ সালে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতৃত্বে সে বছরের জানুয়ারি থেকে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে ইতিহাস বদলের যাত্রা

২০২৪ সালের ১ জুলাই- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল এই দিনে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। 

দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া সেই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলো আজ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে টানা ৩৬ দিনের কর্মসূচি ১ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়। যদিও এই আন্দোলন ১৫ জুলাই থেকে সহিংস রূপ নেয় এবং ১৬ জুলাই থেকে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকে। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের মধ্যে দিয়ে আন্দোলন দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাইয়ের শেষদিকে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। 

৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।

আন্দোলনের প্রেক্ষাপট শুরু হয় ২০১৮ সালে। সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতৃত্বে সে বছরের জানুয়ারি থেকে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার ৪ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে।

পরবর্তীকালে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ওই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়।

এই রায়ের পর ফের আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল হয়। সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও শিক্ষার্থীরা ফলাফলের অপেক্ষা না করে কোটা বাতিলের নতুন নির্বাহী আদেশের দাবি জানান।

৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা পুনর্বহালের রায় বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ হয়। জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, জগন্নাথ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন। ৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আবার বিক্ষোভ করে দাবি মানতে সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন, নয়তো সর্বাত্মক আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

একই দাবিতে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদল সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর স্মারকলিপি দেয়। এদিকে হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ৪ জুলাই দিন নির্ধারণ করা হয়।

২০২৪ সালের ১ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে নতুন সংগঠন গঠিত হয়। এর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশ হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে সমাবেশ করেন। সমাবেশ থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পরিপত্র পুনর্বহালসহ কয়েকটি দাবিতে আরও তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়- ২ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে পদযাত্রা এবং ৩ ও ৪ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজ ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ। দাবি পূরণের জন্য ৪ জুলাই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের দাবির আইনি সুরাহা করতে হবে। সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিমের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের গ্রন্থাগার খোলা রাখতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের হলসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ১ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় শহীদ মিনারের পাদদেশে সমাবেশ ও পরে মিছিল করেন। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে বেলা ১১টা ৫৭ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৭ মিনিট পর্যন্ত ১০ মিনিটের প্রতীকী অবরোধ পালিত হয়। কোটা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য মহাসড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

একই দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় দিনের মতো প্যারিস রোডে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন।

কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অন্য দাবির মধ্যে ছিল- ভবিষ্যতে সরকার কোটাব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল রেখে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা দ্রুত বাতিল করা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow