ক্ষমতার পালাবদলে বদলায় শুধু সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা উপজেলার ছটংগা মাঠ। একসময় যেখানে মৌসুমজুড়ে ফল, ছোলা, বাদাম, মসুরসহ নানা ফসলে সবুজ হয়ে থাকত বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। সেখানে এখন চোখে পড়ে অসংখ্য গভীর গর্ত। পুকুর পুনঃখননের অনুমতির আড়ালে এখানে চলেছে অবাধে বালু ও উর্বর মাটি উত্তোলন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে শুধু সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব- বন্ধ হয়নি অবৈধ বালু বাণিজ্য। এর ফলে শত শত হেক্টর আবাদি ফসলি জমি হচ্ছে অনাবাদি, বাড়ছে খাদ্যঝুঁকি। ‘তাদের মূল লক্ষ্য টাকা উপার্জন করা। এক বিঘা জমি কেটে পাঁচ বিঘার সমপরিমাণ বালু বিক্রি করে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে ভারি যানবাহন চলাচলে রাস্তা ভেঙে গেছে, মানুষের চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ আরও পড়ুন ফলন কমার শঙ্কা / ইটভাটায় যাচ্ছে কৃষি জমির ‘টপসয়েল’ সরেজমিনে দেখা যায়, দিন-রাত ট্রাক্টর ও ডাম্পট্রাকে মাঠ থেকে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ কার্যক্রমে কৃষিজমির উর্বর মাটির স্তর (টপ সয়েল) অপসারণ করায় তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল খাদ। ফলে আবাদযোগ্য জমি হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি উৎপাদন ও
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা উপজেলার ছটংগা মাঠ। একসময় যেখানে মৌসুমজুড়ে ফল, ছোলা, বাদাম, মসুরসহ নানা ফসলে সবুজ হয়ে থাকত বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। সেখানে এখন চোখে পড়ে অসংখ্য গভীর গর্ত। পুকুর পুনঃখননের অনুমতির আড়ালে এখানে চলেছে অবাধে বালু ও উর্বর মাটি উত্তোলন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে শুধু সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব- বন্ধ হয়নি অবৈধ বালু বাণিজ্য। এর ফলে শত শত হেক্টর আবাদি ফসলি জমি হচ্ছে অনাবাদি, বাড়ছে খাদ্যঝুঁকি।
‘তাদের মূল লক্ষ্য টাকা উপার্জন করা। এক বিঘা জমি কেটে পাঁচ বিঘার সমপরিমাণ বালু বিক্রি করে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে ভারি যানবাহন চলাচলে রাস্তা ভেঙে গেছে, মানুষের চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, দিন-রাত ট্রাক্টর ও ডাম্পট্রাকে মাঠ থেকে বালু তুলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ কার্যক্রমে কৃষিজমির উর্বর মাটির স্তর (টপ সয়েল) অপসারণ করায় তৈরি হয়েছে বিশাল বিশাল খাদ। ফলে আবাদযোগ্য জমি হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশ।
জানা যায়, দর্শনা দক্ষিণ চাঁদপুর গ্রামের মৃত আফাজ উদ্দিনের ছেলে আকমত আলী গত ৫ মার্চ পাড় বাঁধাই করে পুকুর খননের আবেদন করেন দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসনের কাছে। তবে উপজেলা প্রশাসন সেই সময় আবেদনকারী মো. আকমত আলীর নামে কেবল পুকুর পুনঃখননের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে অনুমতিপত্রে উপজেলা প্রশাসন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বালু ও মাটি উত্তোলন করা যাবে না, মাত্র ২ থেকে ৩ ফুট পুনঃখনন করা যাবে, মাটি কাটার নামে ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ এবং উত্তোলিত বালু বা মাটি বিক্রির আগে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে।
‘ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মীর যোগসাজশে এসব কার্যক্রম চলছে বলেই প্রশাসনিক তৎপরতার পরও বালু উত্তোলন থামছে না।’

ইটভাটার কবলে কৃষি: সংকট ও প্রতিকার
কিন্তু সরেজমিনে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে অভিযোগ করেন, বাস্তবে উপজেলা প্রশাসনের কোনো শর্ত মানা হচ্ছে না। একজনের নামে অনুমতি নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র (সিন্ডিকেট) বাণিজ্যিকভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছে। এছাড়া অনুমোদিত গভীরতার চেয়ে অনেক বেশি খনন করা হচ্ছে এবং দিন-রাত ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বালু বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য টাকা উপার্জন করা। এক বিঘা জমি কেটে পাঁচ বিঘার সমপরিমাণ বালু বিক্রি করে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে ভারি যানবাহন চলাচলে রাস্তা ভেঙে গেছে, মানুষের চলাচলই কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে কোনো স্থানীয় বাসিন্দা ইচ্ছুক নয়। তারা শুধু বলেন, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মীর যোগসাজশে এসব কার্যক্রম চলছে বলেই প্রশাসনিক তৎপরতার পরও বালু উত্তোলন থামছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ বালু উত্তোলন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন দর্শনা পৌর এলাকার ১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জয়নাল আবেদীন নফর। সরকার পরিবর্তনের পর একই কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে দর্শনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক জালাল উদ্দিন লিটন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক ফারুক হোসেন, ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মন্টু এবং দর্শনা পৌর যুব জামায়াতের সেক্রেটারি তানজিল হোসাইনের বিরুদ্ধে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্তরা দাবি করেন প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই পুকুর পুনঃখননের কাজ করা হচ্ছে, উত্তোলনরত বালি ব্যবহার হচ্ছে উন্নয়ন কাজে।

প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে চলছে ভূমি রূপান্তর
দর্শনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক জালাল উদ্দিন লিটন বলেন, ‘ইউএনও স্যার আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, আপনারা বিষয়টি বোঝেন। ঢাকায় যেন কোনো ধরনের ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ না ওঠে। এমন হলে উন্নয়ন কার্যক্রমও ব্যাহত হবে।’
দর্শনা পৌর যুব জামায়াতের সেক্রেটারি তানজিল হোসাইনের দাবি, এ এলাকায় আজ থেকে বালু উত্তোলন শুরু হয়নি। প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরেই এ কার্যক্রম চলে আসছে। দুটি পুকুরের কাজ নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সময়টা এমন ছিল যে বিষয়টি নিয়ে আমাদের কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রশীদ ঝন্টু বলেন, যুবদলের যে নেতার নামে অভিযোগ এসেছে, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেন, এরকম কোনো বিষয়ে আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি।
এ বিষয়ে কয়েকদিন আগে দামুড়হুদা উপজেলার তৎকালীন (ভারপ্রাপ্ত) নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দর্শনা থানার মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে হাতেনাতে পাওয়া যায়নি। জেলা আইন-শৃঙ্খলা সভাতেও বিষয়টি উপস্থাপন করেছি। জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন বলেন, আমি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। অভিযোগ পেয়েছি। আমরা বড় অভিযান পরিচালনা করবো, সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার বলেন, কৃষিজমি থেকে বালু বা মাটির ওপরের উর্বর স্তর (টপ সয়েল) কেটে নেওয়া হলে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা নষ্ট হয়। এতে জৈব উপাদান ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কমে যায়, ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে কৃষির জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
পরিবেশবিদ ও কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিজমির উর্বর মাটি অপসারণ এবং অবাধে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে শুধু ফসল উৎপাদনই ব্যাহত হবে না, পরিবেশের ভারসাম্য, ভূ-প্রকৃতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং গ্রামীণ অবকাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই কৃষিজমি রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?

