গণঅভ্যুত্থানের মামলায় ঢালাও আসামি, সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হতাহতের ঘটনায় হওয়া অধিকাংশ মামলা এখন রয়েছে বিচারিক প্রক্রিয়ায়। তবে এলোপাতাড়িভাবে করা এ বিপুলসংখ্যক মামলায় ঢালাও আসামি থাকায় সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেক মামলায় ঘটনার বর্ণনা ও স্থান নিয়ে রয়েছে অসঙ্গতির অভিযোগ। এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকা মহানগরীতে মামলা হয়েছে সাত শতাধিক। যেখানে হাজার হাজার আসামির মধ্যে একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সংস্থা ও সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একটি হত্যাকাণ্ডে শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয় না। অথচ অনেক মামলায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিপুলসংখ্যক আস

গণঅভ্যুত্থানের মামলায় ঢালাও আসামি, সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে হতাহতের ঘটনায় হওয়া অধিকাংশ মামলা এখন রয়েছে বিচারিক প্রক্রিয়ায়। তবে এলোপাতাড়িভাবে করা এ বিপুলসংখ্যক মামলায় ঢালাও আসামি থাকায় সুষ্ঠু বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেক মামলায় ঘটনার বর্ণনা ও স্থান নিয়ে রয়েছে অসঙ্গতির অভিযোগ।

এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকা মহানগরীতে মামলা হয়েছে সাত শতাধিক। যেখানে হাজার হাজার আসামির মধ্যে একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন সংস্থা ও সূত্রে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।

তবে রাষ্ট্রপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে এবং নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিদের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

একটি হত্যাকাণ্ডে শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয় না। অথচ অনেক মামলায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিপুলসংখ্যক আসামি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সুযোগে প্রতারক চক্রও মামলাগুলোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।- আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুব

এক ঘটনায় একাধিক মামলা, ভিন্ন বয়ান

 

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া কয়েকটি হত্যা মামলার তদন্তে গুরুতর অসঙ্গতি উঠে এসেছে, যেখানে বাদীর পরিচয়, ঘটনার স্থান ও বর্ণনায় বড় ধরনের গরমিল পাওয়া যায়। ঢাকার ভাটারা থানায় দায়ের করা ট্রাকচালক জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় বাদী হন শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি, যিনি ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য নন। এজাহারে তিনি পরিচয় দেন সহযাত্রী/পরিচিত ব্যক্তি। তিনি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

তবে মামলার তদন্তে দেখা যায়, ঘটনাটি ভাটারায় নয়, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া এলাকায় ঘটে, যেখানে জাহাঙ্গীর ইটপাথরের আঘাতে আহত হয়ে পরে হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় তার পরিবার আলাদাভাবে উল্লাপাড়া থানায় মামলা করে এবং ভাটারায় হামলা বা পুড়িয়ে হত্যার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

একইভাবে জাকির হোসেন হত্যা মামলায় আমান নামের এক ব্যক্তি খালাতো ভাই পরিচয়ে শেখ হাসিনাসহ ১৬৫ জনকে আসামি করে ভাটারা থানায় মামলা করেন। অথচ তদন্তে উঠে আসে, জাকির ভাটারার নতুন বাজার এলাকায় নয়, কদমতলীর দক্ষিণ দনিয়ার শাহী মসজিদের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তার মা রোকেয়া বেগম এ ঘটনায় কদমতলী থানায় পৃথক মামলা করেন।

পেশায় ওয়াসার পানির লাইনের মিস্ত্রি জাকিরের মৃত্যুর স্থান ও ঘটনার বর্ণনায় এ দুই মামলার মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

রমজান মিয়া জীবন হত্যা মামলাতেও একই ধরনের গরমিল দেখা গেছে। এ মামলায় তার চাচা পরিচয়ে জামিল আহম্মেদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে প্রধান আসামি করে ২৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন এবং ঘটনাস্থল হিসেবে ভাটারার যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকা উল্লেখ করেন।

কিন্তু তদন্তে জানা যায়, জীবন আসলে গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর মারা যান। তার বাবা জামাল উদ্দিন এ ঘটনায় পল্টন থানায় পৃথক মামলা করেন। পেশায় জুতা কারখানার কর্মী জীবনের ক্ষেত্রে ভাটারায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এসব ঘটনায় তদন্তকারীরা দেখতে পান, ভুক্তভোগীর পরিবারের বাইরে অন্য ব্যক্তিরা বাদী হয়ে ভিন্ন স্থান ও বর্ণনা দিয়ে মামলা করেছেন, যা পরবর্তীতে তদন্তে ‘তথ্যগত ভুল’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ফলে এসব মামলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

এ তিন মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৪৯৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আদালত প্রতিবেদনগুলো গ্রহণ করেন।

এলোপাতাড়ি মামলায় ঢালাও আসামি, সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র হয়ে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন/ফাইল ছবি

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানায় জাহাঙ্গীর হত্যা মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, তিনি একটি ‘জেনুইন’ মামলা করেছিলেন কিন্তু প্রকৃত ঘটনা চাপা পড়েছে। তার অভিযোগ, নিহতের পরিবার অর্থের বিনিময়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছে।

অন্যদিকে, রমজান ও জাকির হত্যা মামলার বাদীরা ভাটারা থানায় এজাহারে যে মোবাইল ফোন নম্বর দিয়েছিলেন তা বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন
হত্যা মামলায় শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদেরসহ ১২৪ জনকে অব্যাহতি
আহতদের ‘সন্ধান না পাওয়ায়’ শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

আবার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর অসঙ্গতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ‘শিশু জিহাদ হত্যা’ মামলা। এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও, তদন্ত শেষে সবাইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অব্যাহতি পাওয়া অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই ও সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ হাসিনার ভাগ্নে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আব্দুল্লাহ আল মামুন।

তদন্তে পুলিশ দেখতে পায়, যাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল সেই শিশু জিহাদ জীবিত। সে নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে জানায়, তিনি নিহত নয়, কেবল আহত হয়েছে। এছাড়া মামলায় ঘটনাস্থল হিসেবে কেরানীগঞ্জের বছিলা ব্রিজ উল্লেখ করা হলেও প্রকৃত ঘটনা ঘটে ঢাকার হাজারীবাগ এলাকায়। এই দুটি বড় অসঙ্গতি জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো এবং ভুল স্থান উল্লেখ মামলাটিকে দুর্বল করে তোলে।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বদিয়ার রহমান তদন্ত শেষে গত বছরের ১১ আগস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেন। পরে একই বছরের ৩০ অক্টোবর আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে সব আসামিকে অব্যাহতি দেন।

তদন্তে আরও উঠে আসে, মামলার বাদী শিশুটির বাবা জহিরুল ইসলাম। যিনি পেশায় একজন দিনমজুর। পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার আশায় অন্যের প্ররোচনায় মামলা করেছিলেন। যদিও এজাহারে শিশুকে মৃত দেখানো হয়েছিল, এ বিষয়ে বাদী অবগত ছিলেন না বলেও জানা যায়।

এ ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে হাজারীবাগ এলাকায় আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন একটি মামলা দায়ের হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

মামলার বাদী জহিরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

মামলা-বাণিজ্য ও অপ্রাসঙ্গিক আসামি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে মামলার ওজন নষ্ট করার জন্য বাইরের বা নির্দোষ ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মামলা-বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।

আরও পড়ুন
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাবেক দুই পুলিশের ফাঁসি, ৩ জনের যাবজ্জীবন
৬ লাশ পোড়ানোর মামলা: সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

উদাহরণ হিসেবে তিনি সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুলি করার অভিযোগে মামলা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তার মতে, এ ধরনের অন্তর্ভুক্তি মামলার মেরিট বা গুণাগুণ নষ্ট করে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে কারও নাম মামলায় না জড়িয়ে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে মামলাগুলো নতুন করে সঠিকভাবে সাজানো জরুরি।

এ বিষয়ে কথা হলে ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্দোলনের সময় যারা পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে আমরা দেখছি যে অধিকাংশ মামলায় শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই।’

তিনি জানান, একটি হত্যাকাণ্ডে শতাধিক মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয় না। অথচ অনেক মামলায় অপ্রাসঙ্গিকভাবে বিপুলসংখ্যক আসামি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সুযোগে প্রতারক চক্রও মামলাগুলোর ভেতরে ঢুকে পড়েছে। যার ফলে প্রকৃত অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রে পার পেয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে- কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়। এ লক্ষ্যেই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(ক) ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশি তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিরা হয়রানি থেকে বাঁচতে তদন্তাধীন অবস্থায় প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন।- পিপি ওমর ফারুক ফারুকী

এমন অবস্থায় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এ আইনজীবী বলেন, নিরপরাধ ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭(এ) ধারার মাধ্যমে মামলাগুলো থেকে নিরপরাধদের অব্যাহতি দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যাতে তারা মামলাবাজ প্রতারকদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

ঢাকায় মামলার সংখ্যা

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ৭৬২ থেকে ৭৬৮টি মামলা হয়েছে। যদিও সূত্রটি পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছে।

তদন্তে নির্দোষ অধিকাংশ আসামি

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্র জানিয়েছে, তাদের দায়িত্বে থাকা মামলাগুলোর গত মার্চ পর্যন্ত তদন্তে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এলোপাতাড়ি মামলায় ঢালাও আসামি, সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কানিহতদের একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে মারা যান/ছবি: সংগৃহীত

পিবিআই আন্দোলন-সংক্রান্ত মোট ১৯৫টি মামলার তদন্ত করেছে। এর মধ্যে আটটি হত্যা মামলাসহ ৮২টি মামলায় সাত হাজার ৬৫৪ জনকে আসামি করা হলেও তাদের মধ্যে চার হাজার ৭৯৫ জনের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ মেলেনি। অর্থাৎ প্রায় ৬৩ শতাংশ আসামিই নির্দোষ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, কেবল তাদেরই অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে।

মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতি

মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রপক্ষের প্রস্তুতির বিষয়টি। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও আদালতে কার্যকরভাবে মামলা পরিচালনা নিয়ে এখনো সরকারি কৌঁসুলিদের সুস্পষ্ট বক্তব্য বা কৌশল প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে তদন্তে থাকা দুর্বলতা আদালতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন
মাকে লেখা আনাসের চিঠি: ‘স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না’
আম্মু আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দাও, যেন আল্লাহ আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন
আমাকে যারা পঙ্গু বানিয়েছে তাদের বিচার চাই: জুলাই যোদ্ধা আদহাম

আইনজীবীদের মতে, অভিযোগপত্রে অপ্রাসঙ্গিক আসামি, ঘটনাস্থল নিয়ে অসঙ্গতি ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি- এসব বিষয় বিচারিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিতে পারে। এছাড়া তারা বলছেন, ফৌজদারি মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি এড়াতে শুরু থেকেই যথাযথ যাচাই-বাছাই জরুরি ছিল।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, দ্রুত বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তাদের একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা রয়েছে। যে-ই অপরাধ করবেন, শাস্তি পেতে হবে। এই নীতিতে তারা কাজ করছেন। এখানে কোনো শিথিলতার সুযোগ নেই।

তিনি জানান, অধিকাংশ মামলা বর্তমানে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং এরই মধ্যে বেশ কিছু মামলার রায়ও দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। তারপরও তারা বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন। 

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে সব মামলাই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।- ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন

নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি

পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে- কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না পায়। এ লক্ষ্যেই ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(ক) ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুলিশি তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিরা হয়রানি থেকে বাঁচতে তদন্তাধীন অবস্থায় প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন। অর্থাৎ, চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আগেই খালাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে পরবর্তীতে দোষ প্রমাণিত হলে সেই ব্যক্তির নাম আবারও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তারা কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে সব মামলাই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালে নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

আন্দোলনে হতাহতের চিত্র

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছিলেন, নিহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

এলোপাতাড়ি মামলায় ঢালাও আসামি, সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কাগণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলছে/ফাইল ছবি

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৮৪৪ জন শহীদের নাম-ঠিকানা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রাথমিক তালিকায় নিহতের সংখ্যা এক হাজার ৫৮১ জন উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, নিহতদের একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলি ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে মারা যান।

বিভিন্ন তথ্যে দেখা গেছে, ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত শুধু ঢাকা মহানগরীতেই অন্তত ৪২৬ জন নিহত হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক ১১৭ জনের মৃত্যু ঘটে যাত্রাবাড়ীতে। এছাড়া, উত্তরায় ৭০ এবং মিরপুরে ৬২ জন প্রাণ হারায়। সারাদেশে নিহতদের মধ্যে প্রায় ৫৪০ জনই ঢাকা বিভাগের।

আরও পড়ুন
এখনো স্বাভাবিক কাজ করতে পারেন না ডান হাতে গুলি লাগা মারুফ
আমাদের রাস্তাঘাটে মেরে ফেললে কি বিচার হবে, যেমন হাদিরে মারছে
আহতদের ‘সন্ধান না পাওয়ায়’ শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, আন্দোলনের সময় অন্তত এক হাজার ৭০০ জন আহত অবস্থায় ভর্তি হয় এবং সেখানে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এছাড়া, ঢাকা মহানগর পুলিশের ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালে রাজধানীতে ১৪ পুলিশ সদস্য নিহত হন।

আহতের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ১৯ হাজার থেকে ২০ হাজারের বেশি।

এমডিএএ/একিউএফ/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow