গম আমদানি রেকর্ড উচ্চতায়, কমছে চাষের জমি

বাংলাদেশে উৎপাদিত গমের পরিমাণ দিন দিন কমতে থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। এর ফলে রেকর্ড স্পর্শ করেছে গম আমদানির পরিমাণ ও ব্যয়। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে গম আমদানি বাবদ খরচ ছিল ২৪,৭৯০ মিলিয়ন টাকা, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা রেকর্ড বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৫,৪৮৭ মিলিয়ন টাকায়। অর্থাৎ মাত্র চার বছরে এই ব্যয় বেড়েছে ১৩ গুণেরও বেশি। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় কমে ২২৪,৭৭২ মিলিয়ন টাকায় নেমেছিল, তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ গম আমদানিতে ২২৩,৭৫৮ মিলিয়ন টাকা ব্যয় করে ফেলেছে। যা ইঙ্গিত করে যে, এবার বার্ষিক ব্যয় গত বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমদানির ওপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার মূল কারণ গমের চাষ ক্রমাগত কমে যাওয়া। বিবিএসের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪.৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে গমের চাষ হয়েছিল, যা কমতে কমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২.৮০ লাখ হেক্টরে নেমে এসেছে—যা গত এক দশকের মধ্যে

গম আমদানি রেকর্ড উচ্চতায়, কমছে চাষের জমি
বাংলাদেশে উৎপাদিত গমের পরিমাণ দিন দিন কমতে থাকায় আমদানির ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে। এর ফলে রেকর্ড স্পর্শ করেছে গম আমদানির পরিমাণ ও ব্যয়। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে গম আমদানি বাবদ খরচ ছিল ২৪,৭৯০ মিলিয়ন টাকা, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা রেকর্ড বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৫,৪৮৭ মিলিয়ন টাকায়। অর্থাৎ মাত্র চার বছরে এই ব্যয় বেড়েছে ১৩ গুণেরও বেশি। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় কমে ২২৪,৭৭২ মিলিয়ন টাকায় নেমেছিল, তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ গম আমদানিতে ২২৩,৭৫৮ মিলিয়ন টাকা ব্যয় করে ফেলেছে। যা ইঙ্গিত করে যে, এবার বার্ষিক ব্যয় গত বছরের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমদানির ওপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার মূল কারণ গমের চাষ ক্রমাগত কমে যাওয়া। বিবিএসের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪.৪৪ লাখ হেক্টর জমিতে গমের চাষ হয়েছিল, যা কমতে কমতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২.৮০ লাখ হেক্টরে নেমে এসেছে—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ১৩.৪৮ লাখ টন থেকে কমে ১০.৪১ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মোট উৎপাদন মূলত ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ টনের মধ্যেই স্থবির হয়ে আছে। কৃষি পরিসংখ্যানের অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ প্রায় ২০ লাখ টন গম উৎপাদন করেছিল। সে সময় শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক আকারে গম চাষ হতো। উৎপাদনের এই ঘাটতি এখন মেটানো হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গম আমদানি যেখানে ছিল ৫৮.৮১ লাখ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬২.৩৫ লাখ টনে। আর চলতি অর্থবছরের ১০ জুন পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৭২.৪৬ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা একটি নতুন বার্ষিক রেকর্ডের আভাস দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে হিসাব করা হয়েছে যে, স্থানীয় উৎপাদন এখন বাংলাদেশের গমের মোট চাহিদার মাত্র ১৩ শতাংশ পূরণ করতে পারে। বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সিদ্দিকুন নবী মণ্ডল জানান, মানুষের খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন এবং নুডলস, পাস্তা ও বেকারি পণ্যের মতো গমজাত খাদ্যের চাহিদা বাড়ায় দেশে গমের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি বলেন, ফলন বা উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও চাষের জমি কমে যাওয়ার কারণেই মূলত অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমছে। স্বাধীনতার পর যেখানে প্রতি হেক্টরে গড় গম উৎপাদন ছিল প্রায় এক টন, উন্নত জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তির কল্যাণে তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৮ টনে, তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান যে, গম চাষের জমিগুলো এখন ভুট্টা, শাকসবজি, আলু এবং মশলার মতো অধিক লাভজনক শীতকালীন ফসলের দখলে চলে যাচ্ছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, একজন কৃষক যদি এক হেক্টর জমিতে গম চাষ করে ১,০০,০০০ টাকা আয় করেন, তবে সেখানে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু একই জমিতে উৎপাদন খরচ একটু বেশি হলেও ভুট্টা বা সবজির মতো ফসল থেকে ২,০০,০০০ থেকে ২,৫০,০০০ টাকা আয় করা সম্ভব। দিনশেষে কৃষকরা কেবল লাভ-ক্ষতির অনুপাত না দেখে মোট আয়ের দিকেই নজর দেন। তার এই বক্তব্যের সুর মিলিয়ে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক আবদুর রশীদ জানান, গত এক দশকে তিনি গমের চাষ পাঁচ বিঘা থেকে কমিয়ে মাত্র এক বিঘায় নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ভুট্টা এবং শাকসবজি চাষে আমি বেশি লাভ পাচ্ছি, অন্যদিকে গম উৎপাদনের খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। গম চাষ কমে যাওয়ার পেছনে অন্যান্য প্রধান কারণ হিসেবে সিদ্দিকুন নবী মণ্ডল উল্লেখ করেন ফলন তোলার মৌসুমে বাজারে কম মূল্য পাওয়া, সরকারি সহায়তার অভাব এবং অসময়ে বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ুজনিত সমস্যা। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফসল কাটার মৌসুমে অসময়ের বৃষ্টি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গম এই ধরনের আবহাওয়ার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, যা কৃষকদের উৎপাদন ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তবে জনাব মণ্ডল উল্লেখ করেন যে, অন্যান্য দানাদার ফসলের তুলনায় গমের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম সেচের প্রয়োজন হয়। ফলে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে গম চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ইনসেনটিভ (প্রণোদনা), সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে উপযুক্ত এলাকাগুলোতে গম চাষ বাড়ানোর জোরালো যৌক্তিকতা রয়েছে। এদিকে খাদ্য নীতি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের সরবরাহ ঘাটতি এবং মূল্যের আকস্মিক ধাক্কার মুখে ফেলতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভারতের গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা থেকে দেশের ঝুঁকি কমাতে তারা তাপ-সহনশীল গমের জাত সম্প্রসারণ, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা জোরদার করা, কৃষকদের জন্য ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং কৌশলগত খাদ্য মজুত বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow