গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ, কীভাবে কমাবেন

গর্ভধারণ একটি স্বাভাবিক ও আনন্দঘন প্রক্রিয়া হলেও অনেক সময় তা নানা জটিলতার কারণে মাঝপথে থেমে যায়। গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ এমনই একটি পরিস্থিতি, যা শুধু শারীরিক নয়; মানসিকভাবেও একজন নারীর জন্য গভীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই মনে করেন এটি হঠাৎ ঘটে, কিন্তু বাস্তবে গর্ভপাতের পেছনে থাকে নানা শারীরিক, জেনেটিক, হরমোনজনিত ও জীবনযাপন-সংক্রান্ত কারণ। এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের গাইনী, প্রসূতি ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. সুমাইয়া শারমিন বলেন, ‘গর্ভপাত একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এর কারণগুলো জানা এবং সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক যত্ন ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে গর্ভপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘গর্ভধারণের আগে সব ধরনের শারীরিক পরীক্ষা করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রেসার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা অন্য কোনো হরমোনের সমস্যা থাকলে সেটা আগেই নিয়ন্ত্রণ করে নিতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে এনে তবেই গর্ভধারণের পরিকল্পনা করা উচিত।’ গর্ভপাত কী? গর্ভাবস্থার ২০তম সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের স্বাভাবিকভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া বা বেরিয়ে যাওয়াকে গর্ভপাত বলা

গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ, কীভাবে কমাবেন

গর্ভধারণ একটি স্বাভাবিক ও আনন্দঘন প্রক্রিয়া হলেও অনেক সময় তা নানা জটিলতার কারণে মাঝপথে থেমে যায়। গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ এমনই একটি পরিস্থিতি, যা শুধু শারীরিক নয়; মানসিকভাবেও একজন নারীর জন্য গভীর কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই মনে করেন এটি হঠাৎ ঘটে, কিন্তু বাস্তবে গর্ভপাতের পেছনে থাকে নানা শারীরিক, জেনেটিক, হরমোনজনিত ও জীবনযাপন-সংক্রান্ত কারণ।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের গাইনী, প্রসূতি ও বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. সুমাইয়া শারমিন বলেন, ‘গর্ভপাত একটি সাধারণ সমস্যা হলেও এর কারণগুলো জানা এবং সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক যত্ন ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে গর্ভপাত প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘গর্ভধারণের আগে সব ধরনের শারীরিক পরীক্ষা করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রেসার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা অন্য কোনো হরমোনের সমস্যা থাকলে সেটা আগেই নিয়ন্ত্রণ করে নিতে হবে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে এনে তবেই গর্ভধারণের পরিকল্পনা করা উচিত।’

গর্ভপাত কী?

গর্ভাবস্থার ২০তম সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের স্বাভাবিকভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া বা বেরিয়ে যাওয়াকে গর্ভপাত বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি প্রথম তিন মাসের মধ্যেই ঘটে। অনেক নারী বুঝতেই পারেন না যে তারা গর্ভবতী ছিলেন, এমন অবস্থাতেও প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভপাত হয়ে যেতে পারে। নানা কারণে গর্ভপাত হয়ে থাকে। তবে এর প্রধান কিছু কারণ রয়েছে। 

জেনেটিক বা ক্রোমোজোমজনিত সমস্যা

গর্ভপাতের সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ভ্রূণের জেনেটিক ত্রুটি। ডা. সুমাইয়া শারমিন বলেন, ‘যখন ভ্রূণের ক্রোমোজোমে ত্রুটি থাকে, তখন শরীর নিজেই সেটিকে ধরে রাখতে পারে না।’ এটি সাধারণত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য নয়।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা

গর্ভধারণের জন্য প্রোজেস্টেরন নামক হরমোন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই হরমোনের অভাব হলে ভ্রূণ জরায়ুতে সঠিকভাবে স্থাপিত হতে পারে না, ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।

আরও পড়ুন:

জরায়ুর গঠনগত সমস্যা

জরায়ুর অস্বাভাবিক গঠন, ফাইব্রয়েড, বা জন্মগত ত্রুটি থাকলে গর্ভধারণ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে জরায়ুর দেওয়াল দুর্বল থাকলেও গর্ভপাত হতে পারে।

সংক্রমণ

বিভিন্ন ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ (যেমন: রুবেলা, টক্সোপ্লাজমা, লিস্টেরিয়া) গর্ভপাতের কারণ হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকা জরুরি।

মায়ের বয়স

৩৫ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর গুণগত মান কমে যায়, যা গর্ভধারণে প্রভাব ফেলে।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড সমস্যা বা অটোইমিউন রোগ থাকলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে।

জীবনযাত্রার অভ্যাস

ধূমপান, মদ্যপান, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, অপুষ্টি বা অতিরিক্ত মানসিক চাপ এসবই গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়। ডা. সুমাইয়া শারমিন বলেন, ‘গর্ভধারণের আগে থেকেই সুস্থ জীবনযাপন শুরু করা উচিত।’

আঘাত বা দুর্ঘটনা

গর্ভাবস্থায় পড়ে যাওয়া, পেটে আঘাত লাগা বা দুর্ঘটনা ঘটলে গর্ভপাত হতে পারে।

হরমোনজনিত রোগ (পিসিওএস)

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) থাকলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আগের গর্ভপাতের ইতিহাস

যাদের আগে একাধিকবার গর্ভপাত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পুনরায় গর্ভপাতের আশঙ্কা বেশি থাকে। তবে সঠিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে অনেকেই সফলভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেন।

গর্ভপাতের লক্ষণ

  • তলপেটে ব্যথা বা ক্র্যাম্প
  • যোনিপথে রক্তপাত
  • টিস্যু বা রক্ত জমাট বের হওয়া
  • হঠাৎ গর্ভাবস্থার লক্ষণ কমে যাওয়া

এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায় যে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. সুমাইয়া শারমিন। যথা-

  • গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো
  • সুষম খাদ্য গ্রহণ
  • নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড সেবন
  • ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা
  • মানসিক চাপ কমানো
  • নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
  • মানসিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ

গর্ভপাতের পর অনেক নারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। হতাশা, দুঃখ, অপরাধবোধ এসব অনুভূতি স্বাভাবিক। পরিবার ও কাছের মানুষের সমর্থন এই সময় খুবই জরুরি। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়াও উপকারী হতে পারে। গর্ভপাত একটি সংবেদনশীল বিষয়, যা নিয়ে অনেকেই কথা বলতে সংকোচবোধ করেন। কিন্তু সচেতনতা এবং সঠিক তথ্য জানলে অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ডা. সুমাইয়া শারমিনের মতে, প্রতিটি গর্ভধারণ আলাদা। তাই কোনো সমস্যা হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। মাতৃত্বের পথ সবসময় সহজ নয়, তবে সচেতনতা, যত্ন এবং সঠিক চিকিৎসা এই পথকে অনেকটাই নিরাপদ করে তুলতে পারে।

জেএস/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow