গাইবান্ধায় আড়াই বছর ধরে আটকে শত কোটি টাকার ৯ সেতুর কাজ
৩ প্যাকেজে শুরু হয় ১১টি সেতু নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ১১৬ কোটি টাকা উপকারের বদলে দুর্ভোগের কারণ নির্মাণাধীন সেতু গাইবান্ধায় প্রায় আড়াই বছর ধরে ১০০ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য নয়টি সেতুর কাজ আটকে আছে। এরমধ্যে চারটি সেতুর কাজ শুরুই হয়নি। পাঁচটির কাজ বন্ধ আছে। এতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এসব সেতুর নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে, তা নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। সরকারের অনেক টাকা বাড়তি খরচ হবে। গাইবান্ধা সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) কার্যালয় সূত্র জানায়, গাইবান্ধা জেলায় তিনটি প্যাকেজে মোট ১১টি সেতুর নির্মাণকাজ হাতে নেওয়া হয়। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৬৮০ দশমিক ৭৩ মিটার। সেতুগুলো নির্মাণে মোট ১১৬ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়। ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন)’ প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধা জেলার অংশে এসব সেতুর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে সওজ বিভাগ। আরও পড়ুন শেরপুরে পাহাড়ি ঢলে মানুষসহ ভেসে গেল সেতু সূত্রটি আরও জানায়, প্র
- ৩ প্যাকেজে শুরু হয় ১১টি সেতু নির্মাণ
- ব্যয় ধরা হয় ১১৬ কোটি টাকা
- উপকারের বদলে দুর্ভোগের কারণ নির্মাণাধীন সেতু
গাইবান্ধায় প্রায় আড়াই বছর ধরে ১০০ কোটির বেশি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য নয়টি সেতুর কাজ আটকে আছে। এরমধ্যে চারটি সেতুর কাজ শুরুই হয়নি। পাঁচটির কাজ বন্ধ আছে। এতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এসব সেতুর নির্মাণকাজ কবে শুরু হবে, তা নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অভিজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণ কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। সরকারের অনেক টাকা বাড়তি খরচ হবে।
গাইবান্ধা সড়ক ও জনপদ বিভাগ (সওজ) কার্যালয় সূত্র জানায়, গাইবান্ধা জেলায় তিনটি প্যাকেজে মোট ১১টি সেতুর নির্মাণকাজ হাতে নেওয়া হয়। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৬৮০ দশমিক ৭৩ মিটার। সেতুগুলো নির্মাণে মোট ১১৬ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়। ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন)’ প্রকল্পের আওতায় গাইবান্ধা জেলার অংশে এসব সেতুর নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে সওজ বিভাগ।

শেরপুরে পাহাড়ি ঢলে মানুষসহ ভেসে গেল সেতু
সূত্রটি আরও জানায়, প্রথম প্যাকেজে দুইটি সেতু ধরা হয়। একটি করতোয়া নদীর ওপর পলাশবাড়ী-ঘোড়াঘাট সড়কের পলাশবাড়ী উপজেলার করতোয়াপাড়া এলাকায় এবং আরেকটি সেতু (ঘাঘট-৩) ঘাঘট নদীর ওপর সাদুল্লাপুর-নলডাঙ্গা সড়কের সাদুল্লাপুর উপজেলার জামুডাঙ্গা এলাকায়। সেতু দুইটির দৈর্ঘ্য ২৪৩ দশমিক ৪৯ মিটার। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৬ কোটি ৫৮ দশমিক ৫২ লাখ টাকা। কাজের দায়িত্ব পান ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মঈন উদ্দিন বাসি লিমিটেড।
২০২২ সালের ২ অক্টোবর সেতু দুইটির কাজ শুরু হয়। কাজ শেষ করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর। এসময়ে শুধু করতোয়া পাড়া এলাকার সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এটি যানবহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। কিন্তু জামুডাঙ্গা এলাকায় সেতুর পিলার ও পাটাতন (স্ট্রাকচার) কাজ সমাপ্ত হয়। সংযোগ সড়কের কাজ হয়নি।
দ্বিতীয় প্যাকেজে ছয়টি সেতুর কাজ হাতে নেওয়া হয়। এরমধ্যে পাঁচটি সেতু গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের জেলা শহরের নিউ ব্রিজ রোড এলাকায় ঘাঘট নদীর ওপর একটি (ঘাঘট-২), সদর উপজেলার মাঠেরহাট এলাকায় একটি, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হলহলিয়া এলাকায় একটি, বাজারপাড়া এলাকায় একটি ও কদমতলি এলাকায় একটি। অপরটি গাইবান্ধা-নাকাইহাট-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শাকদহ এলাকায়। সেতু ছয়টির মোট দৈর্ঘ্য ২৯৭ দশমিক ৬০ মিটার। ব্যয় ধরা হয় ৬২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। কাজের দায়িত্ব পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাসুদ হাইটেক।
২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর সেতুগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শেষ করার কথা ছিল। এসময়ে নিউ ব্রিজ রোড এলাকায় (ঘাঘট-২) এবং শাকদহ সেতুর পিলার ও পাটাতন (স্ট্রাকচার) কাজ সমাপ্ত হয়েছে। সংযোগ সড়ক হয়নি। মাঠেরহাট এলাকায় সেতুর পাইল সম্পন্ন হয়ে কাজ বন্ধ রয়েছে। এই প্যাকেজে বাজারপাড়া, হলহলিয়া ও কদমতলি এলাকায় সেতুর কাজ শুরুই হয়নি।
তৃতীয় প্যাকেজে রয়েছে তিনটি সেতু। এগুলো হচ্ছে সাঘাটা উপজেলায় বারকোনা-জুমারবাড়ি-সোনাতলা সড়কের বাজিতনগর এলাকায় একটি ও একই সড়কের কালিতলা এলাকায় একটি। অপরটি আলাই নদীর ওপর গাইবান্ধা-বালাসি সড়কের সদর উপজেলার পুলবন্দি এলাকায়। সেতু তিনটির দৈর্ঘ্য ১৩৯ দশমিক ৬৩ মিটার। এতে ২৬ কোটি ৯৬ দশমিক ৭০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। কাজের দায়িত্ব পায় ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান টেকনো বিলডার লিমিটেড এবং আমিনুল হক।
২০২২ সালের ২ নভেম্বর তিনটি সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর শেষ করার কথা ছিল। এরমধ্যে বাজিতনগর এলাকায় সেতুর কাজ সম্প্রতি শুরু করা হয়েছে। পুলবন্দি সেতুর পিলার ও পাটাতনের (স্ট্রাকচার) কাজ সমাপ্ত হয়েছে। সংযোগ সড়ক হয়নি। কালিতলা এলাকায় সেতুর কাজ শুরুই হয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শাকদহ এলাকায় সেতুটি ছয়টি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দু’পাশের কোনো সংযোগ সড়ক নেই। সেতুর লোহার রডে মরিচা পড়েছে। সেতুর মুখ ঝোপ-জঙ্গলে ঢেকে গেছে। যাতায়াত ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয়দের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জেলা শহরের পুলবন্দি, নিউ ব্রিজ ও জামুডাঙ্গা সেতুর একই অবস্থা।
পিলার ও পাটাতন সম্পন্ন হওয়া চারটি সেতু সংলগ্ন এলাকাবাসী জানায়, প্রায় আড়াই বছর আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও শ্রমিকরা কর্ম এলাকা থেকে ইট, সিমেন্ট, বালু ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে যায়। তখন থেকে সেতুর কাজ বন্ধ রয়েছে। প্রায় তিন বছর হয়ে যাচ্ছে, কাজ শুরুর কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শাকদহ এলাকার ফারুক হোসেন বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে সেতু নিমার্ণের কাজ বন্ধ। যে সেতু আমাদের উপকারের জন্য নির্মাণ করা হয়, সেই সেতু এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে পাশের পুরাতন সেতু দিয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হচ্ছে।
একই এলাকার স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা নতুন সেতুর লোহার রড কেটে নিয়ে যাচ্ছে।’
গাইবান্ধা জেলা শহরের অটোচালক হুমায়ুন মিয়া বলেন, ‘নতুন সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় নিউ ব্রিজ রোড এলাকার পুরাতন সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চালাতে হচ্ছে। বড় কোনো দুর্ঘটনার আগেই নতুন সেতু চালু করা দরকার।’

শতবর্ষী রেলসেতুতে ঝুঁকির ভার
গাইবান্ধা শহরের ট্রাকচালক আশরাফুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় শহরের নতুনব্রীজ ও পুলবন্দি সেতু দুটি নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। আশঙ্কা করছেন পুরোনো সেতুগুলো যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
এসব বিষয়ে গাইবান্ধা সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যার কারণে ১১টির মধ্যে চারটি সেতুর কাজ শুরু করা যায়নি। ফলে সেতুর কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে থেমে রয়েছে। ২০২৫ সালে ৩ জুন ভূমি অধিগ্রহণের ৭ ধারা নোটিশ জারি হয়েছে। বর্তমানে প্রাক্কলন প্রস্তুতের কাজ চলমান। প্রাক্কলনের কাজ শেষ হলে ৮ ধারা নোটিশ এবং অর্থ প্রদান করা সম্ভব হবে। তখন সেতুর অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। বাকি অসমাপ্ত সেতুগুলোর কাজ সম্পন্ন করতে সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সেতুর কাজ বিলম্বের বিষয়ে জানতে প্রথম প্যাকেজের ঠিকাদার মঈন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাসুদ হাইটেক স্বত্তাধিকারী এবং তৃতীয় প্যাকেজের ঠিকাদার আমিনুল হকে ফোন ধরেননি।
এফএ/এএসএম
What's Your Reaction?
