গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫ হাজার ১০২ কোটি ৩৫ লাখ ৮ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) দুপুরে নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বাজেট ঘোষণা ও সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাজেট উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিলেন- প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তানজিলা খানম, প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল বারেক, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক, সচিব (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ ফিরোজ আল মামুন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্টাফ অফিসার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সোহেল রানা, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এস এম কিবরিয়া, বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়ার্ড সচিব, করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি।
প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার বলেন, গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী এবং দ্রুত বর্ধনশীল মহানগর। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাসের এ নগরীতে প্রতিনিয়ত নাগরিক সেবার চাহিদা বাড়ছে। সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়েও নাগরিকদের উন্নত, টেকসই ও সময়োপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নগরবাসীর সমস্যাগুলো সরাসরি শুনে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলেও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, ওয়ার্ড সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নাগরিক সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
প্রশাসক বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সড়ক, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণ এবং সংস্কারের জন্য প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া খাল পুনঃখনন, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ পরিবেশ খাতে প্রায় ১ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা, পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রায় ১১২ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শওকত হোসেন সরকার বলেন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ৩৭টি নতুন যানবাহন সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন স্থানে ২০টি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গৃহীত কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে দেড় লাখের বেশি লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, ৫৭টি ওয়ার্ডে মাইকিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস অভিযান এবং পরিবেশবান্ধব বিটিআই (BTI) বায়োপেস্টিসাইড পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের বিষয়ে প্রশাসক বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১৯টি খালের মধ্যে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মোগর খাল ও চিলাই খালের পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতায় গাছা খালের পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে। পর্যায়ক্রমে নগরীর সব খাল পুনঃখননের আওতায় আনা হবে।
স্বাস্থ্যসেবায় সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, রুটিন ইপিআই, হাম-রুবেলা এবং টাইফয়েড টিকাদান কর্মসূচিতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এমআর টিকাদান কর্মসূচিতে জাতীয়ভাবে প্রথম এবং টাইফয়েড টিকাদানে ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
শিক্ষা খাতেও নতুন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, টঙ্গীতে সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। কোনাবাড়িতে নতুন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী অর্থবছর থেকে সেখানে পাঠদান শুরু হবে। পাশাপাশি নগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে ৫৭টি খেলার মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কোনো ধরনের হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয়নি। পরবর্তী পুনর্মূল্যায়ন করা হবে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১০২ কোটি ৩৫ লাখ ৮ হাজার টাকা, ব্যয় ২ হাজার ৪৮০ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সম্ভাব্য সমাপনী স্থিতি ২ হাজার ৮২১ কোটি ৮৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।
নগরবাসীর উদ্দেশে শওকত হোসেন বলেন, গাজীপুরকে পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য মহানগরে পরিণত করতে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ বাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নাগরিকদের সহযোগিতাই একটি টেকসই ও সুন্দর নগর গড়ে তোলার প্রধান শক্তি।
তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক প্রচার এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে গণমাধ্যম নগর উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।
বাজেট ঘোষণার পর উপস্থিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আশা প্রকাশ করেন, প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নাগরিক সেবার মান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এবং দেশের অন্যতম আধুনিক ও পরিকল্পিত মহানগর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।