গায়েবানা জানাজা নিয়ে ইসলাম কী বলে?

জন্ম নিলে একদিন মারা যেতে হবে। মায়াঘেরা দুনিয়ার রূপ-রঙ ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমাতে হবে— যেখানে কেউ কারও বন্ধু হবে না, হবে না শত্রুও। নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং তোমরা নিজ নিজ কাজের প্রতিফল সম্পূর্ণভাবেই কিয়ামতের দিন পাবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫, সুরা আনকাবুত : ৫৭) হাদিসে এসেছে, কেউ মৃত্যুবরণ করলে দ্রুত তার গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের কাজ যথাসম্ভব সম্পন্ন করা উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা মৃত ব্যক্তিকে তাড়াতাড়ি দাফন করবে। যদি সে নেক ব্যক্তি হয়, তবে তাকে তোমরা তার কল্যাণের নিকটবর্তী করে দিলে; আর যদি অন্য কিছু হয়, তবে মন্দকে তোমাদের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিলে। (বোখারি : ১৩১৫) জানাজার ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যক্তি বিশেষের গায়েবানা জানাজা পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাই অনেকেই জানতে চান, ‘গায়েবানা জানাজা জায়েজ কি না।’ নিচে কালবেলার পাঠকদের জন্য গায়েবানা জানাজার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো— গায়েবানা জানাজা কী? গায়েবানা জানাজা বলতে মৃতদেহ সামনে উপস্থিত না রেখে

গায়েবানা জানাজা নিয়ে ইসলাম কী বলে?

জন্ম নিলে একদিন মারা যেতে হবে। মায়াঘেরা দুনিয়ার রূপ-রঙ ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমাতে হবে— যেখানে কেউ কারও বন্ধু হবে না, হবে না শত্রুও। নিজের দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ আল কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং তোমরা নিজ নিজ কাজের প্রতিফল সম্পূর্ণভাবেই কিয়ামতের দিন পাবে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫, সুরা আনকাবুত : ৫৭)

হাদিসে এসেছে, কেউ মৃত্যুবরণ করলে দ্রুত তার গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের কাজ যথাসম্ভব সম্পন্ন করা উচিত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা মৃত ব্যক্তিকে তাড়াতাড়ি দাফন করবে। যদি সে নেক ব্যক্তি হয়, তবে তাকে তোমরা তার কল্যাণের নিকটবর্তী করে দিলে; আর যদি অন্য কিছু হয়, তবে মন্দকে তোমাদের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিলে। (বোখারি : ১৩১৫)

জানাজার ক্ষেত্রে অনেক সময় ব্যক্তি বিশেষের গায়েবানা জানাজা পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। তাই অনেকেই জানতে চান, ‘গায়েবানা জানাজা জায়েজ কি না।’

নিচে কালবেলার পাঠকদের জন্য গায়েবানা জানাজার বিস্তারিত তুলে ধরা হলো

গায়েবানা জানাজা কী?

গায়েবানা জানাজা বলতে মৃতদেহ সামনে উপস্থিত না রেখে বা দূরবর্তী কোনো স্থানে থাকা মৃত ব্যক্তির জন্য আয়োজিত বিশেষ নামাজকে বোঝানো হয়।

গায়েবানা জানাজা কি জায়েজ?

ইমাম আজম আবু হানিফা (রাহ.) ও তার অনুগামী সকল ইমাম এবং ইমাম মালেক (রাহ.) এর মতে- গায়েবানা জানাজা জায়েজ নেই। চাই দাফনের আগে হোক বা পরে। মাইয়্যিত শহরের ভিতরে থাক বা বাইরে। (মাবসুতে সারাখসী : ২/৬৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত, মানহুল জালী : ১/৩৭৬ পৃষ্ঠা)

ইসলামি গবেষণা পত্রিকা মাসিক আল কাউসারে বলা হয়েছে, জানাজা নামাজ সহিহ হওয়ার জন্য লাশ সামনে উপস্থিত থাকা আবশ্যক। অনুপস্থিত লাশের গায়েবানা জানাজা নামাজ আদায়ের বিধান নেই।

নবীজি (সা.)- এর জীবদ্দশায় অসংখ্য সাহাবি মদিনার বাইরে দূর-দূরান্তে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে তাদের গায়েবানা জানাজা পড়ার কোনো ঘটনা বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নেই। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামের জানাজা নামাজ পড়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী ছিলেন। এজন্য তিনি বলে দিয়েছিলেন যে, ‘তোমাদের কেউ মারা গেলে আমাকে জানাবে। কেননা আমার জানাজা নামাজ মৃতের জন্য রহমত। (সহিহ ইবনে হিব্বান :৩০৮৩)

তদ্রূপ খোলাফায়ে রাশেদিন থেকেও গায়েবানা জানাজা নামাজ পড়ার প্রমাণ নেই। অথচ তাদের খেলাফতকালে বিভিন্ন মুজাহিদ শহীদ হয়েছেন। গায়েবানা জানাজা নামাজ যদি সুন্নাহসম্মত হত, তাহলে সাহাবিগণ অবশ্যই উক্ত সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। কখনো পরিত্যাগ করতেন না।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রাহ.) যাদুল মাআদ গ্র্রন্থে লেখেন, অনুপস্থিত লাশের গায়েবানা জানাজা নামাজ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ ছিল না। কেননা অসংখ্য মুসলমান দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাজা পড়েননি। (যাদুল মাআদ :  ১/১৪৮)

সুতরাং বর্তমানে যেসব অনুপস্থিত লাশের গায়েবানা জানাজা পড়া হয়, তা সুন্নাহসম্মত নয় এবং সালাফের আমলের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এ প্রথা অবশ্যই বর্জনীয়।

কেউ কেউ গায়েবানা জানাজা প্রমাণ করার জন্য রাসুলে কারিম (সা.) কর্তৃক নাজাশী (রা.) -এর জানাজা পড়াকে দলিল হিসেবে পেশ করতে চান। কিন্তু পুরো বিষয়টা সামনে রাখলে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নাজাশীর জানাজা পড়ার ঘটনাটি বর্তমানে প্রচলিত গায়েবানা জানাজার জন্য দলিল হতে পারে না। কারণ সেটি ছিল বিশেষ একটি ঘটনা, যা ব্যাপকভাবে গায়েবানা জানাজা জায়েয হওয়াকে প্রমাণ করে না। এছাড়া মুসনাদে আহমদ ও সহিহ ইবনে হিব্বানে নাজাশীর জানাজা সম্পর্কিত একটি হাদিস দ্বারা বোঝা যায় যে, নাজাশীর লাশ কুদরতিভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনেই উপস্থিত ছিল।

ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমাদের ভাই নাজাশী ইন্তেকাল করেছে। সুতরাং তোমরা তার জানাজা আদায় করো।’ ইমরান (রা.) বলেন, অতপর রাসুলে কারিম (সা .) দাঁড়ালেন। আর আমরা তাঁর পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। অতপর তিনি তার জানাজা পড়ালেন। আমাদের মনে হচ্ছিল যে, নাজাশীর লাশ তাঁর সামনেই রাখা ছিল। (মুসনাদে আহমদ : ২০০০৫, সহিহ ইবনে হিব্বান : ৩০৯৮)

আর অনেক মুহাদ্দিস নাজাশীর জানাজা সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এ ঘটনাটি বিশেষ এক প্রয়োজনের কারণে সংঘটিত হয়েছিল। তা হলো, নাজাশীর মৃত্যু হয়েছিল এমন এক ভূখণ্ডে যেখানে তার জানাজা পড়ার মতো কোনো (মুসলিম) ব্যক্তি ছিল না। তাই আল্লাহর রাসুল (সা.) সাধারণ নিয়মের বাইরে তার জানাজা পড়িয়েছেন।

আল্লামা যায়লায়ী (রাহ.), আল্লামা ইবনে তাইমিয়াহ, আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম ও আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রাহ.)  এ মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (নাসবুর রায়া : ২/২৮৩, যাদুল মাআদ : ১/৫০২, ফয়যুল বারী : ২/৪৭০)

তবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) থেকে গায়েবানা জানাজা জায়েয হওয়ার একটি মত পাওয়া যায়। এই দুই ইমাম বলেছেন, মৃত ব্যক্তি ভিন্ন শহরে থাকলে গায়েবানা জানাজা জায়েজ। কিন্তু শহরের ভিতরে থাকা মাইয়্যেতের গায়েবানা জানাজা জায়েজ নয়। মাইয়্যেতকে উপস্থিত করতে হবে। (আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু : ১/৫০৪, মাকতাবাতুল হক্কানিয়্যাহ, পাকিস্তান, আল মাজমু : ৫/২৫৩)।

বিভিন্ন পরিস্থিতির আলোকে আলেমদের মতামত হলো, নাজাশীর জানাজা নবীজি (সা.)- এর জীবনের স্বাভাবিক রীতি বহির্ভূত মাত্র একটি ঘটনা। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যাপকভাবে প্রচলিত গায়েবানা জানাজাকে বৈধ বলার সুযোগ নেই। কেননা অনুসৃত সুন্নাহর সাথে এটির কোনো মিল নেই।

এছাড়া যে লাশের কোথাও জানাজার ব্যবস্থা আছে এবং তার জানাজা হয়েছে বা হচ্ছে তার গায়েবানা জানাযা পড়ার একটি ঘটনাও হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায় না। তাই এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

(সহিহ বোখারি : ৪০৯০, নাসবুর রায়া : ২/২৮৩, যাদুল মাআদ : ১/৫০২, উমদাতুল কারী : ৮/১১৯, ফয়যুল বারী :  ২/৪৭০, ফাতহুল কাদির : ২/৮০-৮১, আলমাবসূত-সারাখসী :  ২/৬৮, বাদায়েউস সানায়ে : ২/৪৮, রদ্দুল মুহতার  : ২/২০৯, ইলাউস সুনান :  ৮/২৮৩)

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow