চীন কীভাবে ইরান যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে?

চলতি সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের বিষয়ে বেইজিংয়ের গৃহীত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সোমবার সৌদি আরব যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় শি জিনপিং শান্তি পুনরুদ্ধারের সহায়ক সব প্রচেষ্টার প্রতি চীনের সমর্থন এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। শি জিনপিং বলেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখা উচিত, কারণ এটি আঞ্চলিক দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা করে। তবে তিনি প্রধান কোনো পক্ষের নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে গত সাত সপ্তাহ ধরে এই কৌশলগত জলপথকে অচল করে রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান বেশিরভাগ সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল ইরানের সব বন্দরে অবরোধ আরোপ করে। শি জিনপিংয়ের সংযত বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সে সময় এক

চীন কীভাবে ইরান যুদ্ধ থেকে লাভবান হচ্ছে?

চলতি সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের বিষয়ে বেইজিংয়ের গৃহীত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সোমবার সৌদি আরব যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় শি জিনপিং শান্তি পুনরুদ্ধারের সহায়ক সব প্রচেষ্টার প্রতি চীনের সমর্থন এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

শি জিনপিং বলেন, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখা উচিত, কারণ এটি আঞ্চলিক দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা করে।

তবে তিনি প্রধান কোনো পক্ষের নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে গত সাত সপ্তাহ ধরে এই কৌশলগত জলপথকে অচল করে রেখেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান বেশিরভাগ সামুদ্রিক যান চলাচলের জন্য এই প্রণালি বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গত ১৩ এপ্রিল ইরানের সব বন্দরে অবরোধ আরোপ করে।

শি জিনপিংয়ের সংযত বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সে সময় একই দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আমি যুদ্ধে জিতছি, অনেক ব্যবধানে, সবকিছু খুব ভালোভাবে চলছে এবং ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি ‌‘চুক্তি’ না করা পর্যন্ত নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের বক্তব্য এই ইঙ্গিত দেয় যে, চীন কীভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধকে বিশ্বের দুটি পরাশক্তির মধ্যে নিজেকে অধিক দায়িত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করতে ব্যবহার করেছে। যে প্রায়ই সামনে ও কেন্দ্রে থাকার চেয়ে নেপথ্যে থাকতেই বেশি পছন্দ করে।

আব্বা ইবান ইনস্টিটিউট ফর ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড ফরেন রিলেশনস-এর এশিয়া-ইসরায়েল নীতি কর্মসূচির প্রধান গেদালিয়াহ আফটারম্যান বলেন, চীন কোনো নাটকীয় পদক্ষেপ না নিয়ে বরং অপেক্ষা করে ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং সুযোগ এলে তা কাজে লাগিয়ে লাভবান হচ্ছে, আর আমেরিকানদের এই জগাখিচুড়ি সামলাতে দিচ্ছে।

অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘হস্তক্ষেপ না করার’ দীর্ঘস্থায়ী নীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্কের সুবাদে বেইজিং নিজেকে যুক্তির কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিশনের মতে, চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তেল কিনে থাকে। এছাড়া ২০২১ সালে তেহরানের সঙ্গে একটি ২৫ বছর মেয়াদী ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে।

একই সঙ্গে বেইজিং গত এক দশক ধরে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে চীন। ঝেজিয়াং আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ইনস্টিটিউটের ডিন মা জিয়াওলিন বলেন, এসব দেশ শত্রু হলেও আমাদের বন্ধু।

আফটারম্যানের মতে, হস্তক্ষেপ না করার প্রতি চীনের অঙ্গীকারই সম্ভবত একটি প্রধান কারণ ছিল, যার জন্য চলতি মাসের শুরুতে দেশটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে। ওই প্রস্তাবে সদস্যদেরকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য প্রতিরক্ষামূলক প্রকৃতির সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। চীন সিরিয়া ও মিয়ানমারের মতো সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতেও হস্তক্ষেপের অনুরূপ প্রচেষ্টায় ভেটো দিয়েছে।

তাইপের সোসাইটি ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো চ্যাং চিং বলেছেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগের বিপরীতে এই অঞ্চলে অর্থনীতিই বেইজিংয়ের শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ব্যবসার জন্য শান্তি ভালো, যুদ্ধ নয়।

তিনি বলেন, তারা শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে। সংঘাতে কে জিতবে তা নিয়ে তারা সত্যিই চিন্তিত নয়। তাদের ইচ্ছা হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির আশপাশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করা।

বেইজিংভিত্তিক হুটং রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার ফেং চুচেং বলেন, এই যুদ্ধের আরও তীব্রতা চীনের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে এমন মাত্রায় হুমকির মুখে ফেলবে যা সরাসরি হস্তক্ষেপে বাধ্য করতে পারে, কারণ দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানির ৪০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

চলতি মাসে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো একটি গবেষণা নোটে তিনি বলেন, বেইজিংয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের জড়িয়ে পড়া ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি নাজুক ভারসাম্য বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করবে।

এদিকে বেইজিং যুদ্ধের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে সমন্বয় সাধনে সাহায্য করার জন্য ‘সবার বন্ধু’ হিসেবে নিজের অবস্থানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত ২৬টি ফোন কল করেছেন, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ দূত ঝাই জুন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রায় দুই ডজন বৈঠক করেছেন।

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গত সপ্তাহে সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোন কলের আগে আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে একটি বৈঠকেও অংশ নিয়েছিলেন।

এসব কূটনৈতিক তৎপরতার পরেও বেইজিং আশ্চর্যজনকভাবে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতায় সাহায্য করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকাকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছে, যা যুদ্ধের অন্যান্য ঘটনায় তার ভূমিকার তুলনায় নগণ্য। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ।

পর্যবেক্ষকদের মতে, এর কারণ হলো চীন একটি জটিল শান্তি চুক্তিতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চায়। সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্রিউ থম্পসন বলেন, তারা শান্তি প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন না করেই শান্তিস্থাপক হওয়ার চেষ্টা করছে। মূল কথা হলো, মধ্যপ্রাচ্য চীনের মূল আগ্রহের বিষয় থেকে অনেক দূরে, তাই তাদের ব্যয় করার মতো রাজনৈতিক পুঁজি সীমিত।

তবুও এর প্রচেষ্টা অলক্ষিত থাকবে না, বলেছেন ঝেজিয়াং আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াওলিন মা। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আমি মনে করি বিশ্ব জানে কে স্থিতিশীলতা দেয়, কে নিরাপত্তা দেয় এবং কে আন্তর্জাতিক আইন ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে চীন পর্দার আড়ালে ভারসাম্য পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। চলতি মাসের শুরুতে, সিএনএন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় যে, চীন ইরানে ম্যান-পোর্টেবল এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম (ম্যানপ্যাড) এর একটি চালান পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সিএনএন-এর এই প্রতিবেদনের পর চলতি মাসে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি দ্বিতীয় তদন্তে জানা যায় যে, ইরান ২০২৪ সালে একটি চীনা গুপ্তচর স্যাটেলাইট সংগ্রহ করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে এটি ব্যবহার করেছে।

বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজির পোস্টডক্টরাল ফেলো জোডি ওয়েন আল জাজিরাকে বলেন, মে মাসে শি জিনপিং এবং ট্রাম্পের মধ্যে পরিকল্পিত বৈঠকের আগে বেইজিং এতটা ‘অসতর্ক’ হবে বলে তিনি মনে করেন না।

ওয়েন আল জাজিরাকে বলেন, চীনা সরকারের জন্য, চীন-ইরান সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ এবং তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলো... চীন-মার্কিন সম্পর্ক।

শি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি এবং মার্কিন শুল্ক নিয়ে আলোচনা করার আশা করছেন, যিনি আলাদাভাবে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। বেইজিং দ্বিতীয় চীন-আরব শীর্ষ সম্মেলনের জন্যও প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে।

আফটারম্যান বলেন, ইরান যুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি বিবেচনা করার সময় চীন এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে।

তিনি বলেন, সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে চীন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার পথে হাঁটছে। দেশটি পুনর্গঠন প্রচেষ্টা, নবায়িত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নতুন করে বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী দিনগুলোর কথা ভাবছে। চীন উপসাগরের উভয় দিকেই খুব ভালো অবস্থানে থাকতে চায়।

সূত্র: আল জাজিরা

টিটিএন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow