চোখের পলকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হিরোশিমা, শুরু হয় কালো বৃষ্টি

হিরোশিমা, আজ এটি শুধু জাপানের একটি শহরের নাম নয়। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। এর কালো অধ্যায় আট দশক পরও মানুষের বুকে ভয়ের কাঁপান ধরায়। কিন্তু কেন এখনো মানুষ হিরোশিমার নাম শুনলেই কিছুটা চমকে ওঠে। শুধু জাপান নয়, পুরো বিশ্ব এই ইতিহাস জানেন, আজও তারা সেই ক্ষত অনুভব করতে পারেন। দিনটি ছিল ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সাল। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানের হিরোশিমা শহরের সেদিনের সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কর্মীরা অফিসের জন্য বাসের অপেক্ষা করছেন, দোকানপাট সবে খুলতে শুরু করেছে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর থেকে কোনো পার্থক্য নেই। একই রকম, সবার যে যার প্রতিদিনের মতো দিনটি শুরু করেছেন। হামলার সময় হিরোশিমার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটি স্থাপনা আংশিকভাবে টিকে ছিল কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাদের সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে। তারা ভাবতেই পারেননি তাদের এতোদিনের চেনা শহরটির ইতিহাসই বদলে যাবে মাত্র কিছু মুহূর্ত পরই। সকাল তখন ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে হিরোশিমার আকাশে ফেলেছিল বিশ্বের প্রথ

চোখের পলকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হিরোশিমা, শুরু হয় কালো বৃষ্টি

হিরোশিমা, আজ এটি শুধু জাপানের একটি শহরের নাম নয়। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। এর কালো অধ্যায় আট দশক পরও মানুষের বুকে ভয়ের কাঁপান ধরায়। কিন্তু কেন এখনো মানুষ হিরোশিমার নাম শুনলেই কিছুটা চমকে ওঠে। শুধু জাপান নয়, পুরো বিশ্ব এই ইতিহাস জানেন, আজও তারা সেই ক্ষত অনুভব করতে পারেন।

দিনটি ছিল ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সাল। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানের হিরোশিমা শহরের সেদিনের সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক। শিশুরা স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কর্মীরা অফিসের জন্য বাসের অপেক্ষা করছেন, দোকানপাট সবে খুলতে শুরু করেছে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোর থেকে কোনো পার্থক্য নেই। একই রকম, সবার যে যার প্রতিদিনের মতো দিনটি শুরু করেছেন।

jagonewsহামলার সময় হিরোশিমার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটি স্থাপনা আংশিকভাবে টিকে ছিল

কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাদের সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে। তারা ভাবতেই পারেননি তাদের এতোদিনের চেনা শহরটির ইতিহাসই বদলে যাবে মাত্র কিছু মুহূর্ত পরই। সকাল তখন ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান এনোলা গে হিরোশিমার আকাশে ফেলেছিল বিশ্বের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’। এরপর যা ঘটেছিল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।

বোমাটি কিন্তু মাটিতে পড়েনি। প্রায় ৬০০ মিটার উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিল। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি হয় তীব্র আলোর ঝলক, কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং প্রচণ্ড শকওয়েভ। বিস্ফোরণস্থলের আশপাশে থাকা অসংখ্য মানুষ মুহূর্তের মধ্যেই প্রাণ হারান। অনেকের শরীর এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে তাদের পরিচয় শনাক্ত করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিস্ফোরণের পর কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ভবন ধসে পড়ে। কাঠের তৈরি ঘরবাড়িগুলোতে আগুন ধরে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো শহর বিশাল অগ্নিকাণ্ডে পরিণত হয়। কারণ জাপানের তখনকার বেশিরভাগ বাড়ি কাঠের তৈরি ছিল। যে কারণে আগুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ আগুন থেকে বাঁচতে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু নদীগুলোও মৃত ও আহত মানুষের ভিড়ে পরিণত হয়েছিল। নদীর পানি তখন আর চোখে পড়ছে না। চারপাশে মৃতদেহের স্তূপ আর আহত মানুষের আর্তনাত, রক্ত মিশে হিরোশিমার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

jagonewsবোমাটি কিন্তু মাটিতে পড়েনি, প্রায় ৬০০ মিটার উচ্চতায় বিস্ফোরিত হয়েছিল

যারা বেঁচে আছেন তারা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না কী হলো, কী হচ্ছে, তিনি কি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। তবে তখন অনেক ভাগ্যবান মানুষ বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কী আসলেই ভাগ্যবান বলা যায়? হিরোশিমায় বোমা হামলার আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল বিকিরণ বা রেডিয়েশন। বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়া অনেক মানুষ প্রথমে সুস্থ মনে হলেও কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারো চুল ঝরে যায়, কারো শরীরে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়, আবার অনেকের জ্বর, বমি ও দুর্বলতা দেখা দেয়। সে সময় চিকিৎসকেরা এসব লক্ষণের কারণও পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। পরে জানা যায়, এগুলো ছিল তেজস্ক্রিয়তার মারাত্মক প্রভাব।

হামলার পর আকাশে তৈরি হয় বিশাল ধোঁয়ার মেঘ। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় ‘ব্ল্যাক রেইন বা কালো বৃষ্টি’। এই বৃষ্টিতে তেজস্ক্রিয় ধুলা, ছাই ও ধোঁয়ার কণা মিশে ছিল। ফলে পানির রং হয়ে গিয়েছিল একদম কালো। মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে যেন কালো কোনো তরল ঝরে পড়ছে মাটিতে। যারা এই বৃষ্টির সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাদের অনেকেই পরে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।

হিরোশিমার মানুষের জীবনে এই হামলার প্রভাব বহু বছর ধরে রয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও হাজার হাজার মানুষ ক্যানসার, বিশেষ করে লিউকেমিয়া এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হন। অনেক শিশুর জন্মগত শারীরিক সমস্যাও দেখা যায়। পারমাণবিক বিস্ফোরণের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আজও গবেষণা চলছে।

জাপানে পারমাণবিক বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’। তারা শুধু হামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী নন, বরং পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার জীবন্ত দলিল। বহু হিবাকুশা সারা বিশ্বে ঘুরে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো দেশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করে।

হামলার সময় হিরোশিমার অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেলেও কয়েকটি স্থাপনা আংশিকভাবে টিকে ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ‘জেনবাকু ডোম’ বা বর্তমান হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল। ধ্বংসস্তূপ হিসেবে এটি সংরক্ষণ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের সেই বিভীষিকা ভুলে না যায়।

jagoআজকের হিরোশিমা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শহর

হিরোশিমার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট, জাপানের আরেক শহর নাগাসাকিতেও দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। দুটি হামলায় ১৯৪৫ সালের শেষে এসে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরই জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু আজকের হিরোশিমা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি শহর। এখন আধুনিক স্থাপনা, ব্যস্ত সড়ক ও উন্নত অবকাঠামোয় ভরপুর এই শহর। প্রতি বছর ৬ আগস্ট শান্তির বার্তা নিয়ে বিশ্ববাসীকে একত্রিত করে। সেখানে নিহতদের স্মরণে নীরবতা পালন করা হয় এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানানো হয়। তারা আজও সেই হতভাগ্য মানুষগুলোর কথা স্মরণ করেন। যারা অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। যাদের মধ্যে হয়তো আজ কেউ অন্যভাবে ইতিহাসের পাতায় থাকতে পারতেন। বিখ্যাত কোনো চিকিৎসক, গবেষক, নায়ক কিংবা গায়ক।

হিরোশিমার ইতিহাস শুধু একটি শহরের ধ্বংসের গল্প নয়; এটি মানবসভ্যতার জন্য এক কঠিন সতর্কবার্তা। কয়েক সেকেন্ডের একটি বিস্ফোরণ যে কত লাখ মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ এবং একটি শহরের ইতিহাস বদলে দিতে পারে, হিরোশিমা তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ। তাই এই দিনের স্মৃতি আজও বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য সব সময় সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow