চোখের পাতা দিয়ে পুরো উপন্যাস লিখে স্মরণীয় হয়ে আছেন যে সাংবাদিক

একটি ভয়াবহ স্ট্রোক মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছিল তার পুরো শরীরের স্বাধীনতা। বিখ্যাত সেই সাংবাদিক আজীবনের জন্য হয়ে পড়েন শয্যাশায়ী নড়াতে পারতেন না হাত, না পা, না ঠোঁট। শরীর যেন পরিণত হয়েছিল এক নীরব কারাগারে। শুধু একটি চোখের পাতা ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ জানালা। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই এক চোখের পলক দিয়েই সহকারীদের সাহায্যে তিনি লিখে ফেলেন একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাহিত্য ইতিহাসে এটি আজও মানব ইচ্ছাশক্তি, চেতনা ও অধ্যবসায়ের এক অবিস্মরণীয় বিস্ময়। এই অবস্থার নাম লকড-ইন সিন্ড্রোম (Locked-in Syndrome) চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ও হৃদয়বিদারক স্নায়বিক অবস্থাগুলোর একটি। এখানে রোগী সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন; সব শুনতে পান, বুঝতে পারেন, অনুভব করেন। কিন্তু নিজের শরীর নড়াতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারেন না। এ যেন না পুরোপুরি জীবিতের স্বাধীনতা, না মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, না অচেতনতার অন্ধকার। রোগী কেবল তাকিয়ে থাকেন। আর তার স্থির চোখের পাতার আড়ালে নীরবে জেগে থাকে একটি সম্পূর্ণ সচেতন পৃথিবী। লকড-ইন সিন্ড্রোম কি? এটি এক দুর্লভ প্রকৃতির ব্রেইন স্ট্রোকের

চোখের পাতা দিয়ে পুরো উপন্যাস লিখে স্মরণীয় হয়ে আছেন যে সাংবাদিক
একটি ভয়াবহ স্ট্রোক মুহূর্তেই কেড়ে নিয়েছিল তার পুরো শরীরের স্বাধীনতা। বিখ্যাত সেই সাংবাদিক আজীবনের জন্য হয়ে পড়েন শয্যাশায়ী নড়াতে পারতেন না হাত, না পা, না ঠোঁট। শরীর যেন পরিণত হয়েছিল এক নীরব কারাগারে। শুধু একটি চোখের পাতা ছিল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ জানালা। আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সেই এক চোখের পলক দিয়েই সহকারীদের সাহায্যে তিনি লিখে ফেলেন একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাহিত্য ইতিহাসে এটি আজও মানব ইচ্ছাশক্তি, চেতনা ও অধ্যবসায়ের এক অবিস্মরণীয় বিস্ময়। এই অবস্থার নাম লকড-ইন সিন্ড্রোম (Locked-in Syndrome) চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় ও হৃদয়বিদারক স্নায়বিক অবস্থাগুলোর একটি। এখানে রোগী সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন; সব শুনতে পান, বুঝতে পারেন, অনুভব করেন। কিন্তু নিজের শরীর নড়াতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারেন না। এ যেন না পুরোপুরি জীবিতের স্বাধীনতা, না মৃত্যুর নিস্তব্ধতা, না অচেতনতার অন্ধকার। রোগী কেবল তাকিয়ে থাকেন। আর তার স্থির চোখের পাতার আড়ালে নীরবে জেগে থাকে একটি সম্পূর্ণ সচেতন পৃথিবী। লকড-ইন সিন্ড্রোম কি? এটি এক দুর্লভ প্রকৃতির ব্রেইন স্ট্রোকের পরবর্তী অবস্থা। এই অবস্থায় রোগী প্রায় পুরোপুরি সচেতন থাকেন, সব শুনতে ও বুঝতে পারেন, কিন্তু নিজের শরীর নড়াতে পারেন না। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে রোগী কোমায় আছেন কিংবা কিছুই বুঝছেন না। অথচ বাস্তবে তিনি চারপাশের প্রতিটি শব্দ, কান্না, স্পর্শ ও কথোপকথন অনুভব করেন। শুধু স্বাভাবিক পদ্ধতিতে অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেন — তবে চোখের পলক বা উল্লম্ব দৃষ্টি (ওপর-নিচে) দিয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জানাতে পারেন। এই অবস্থার সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ফরাসি সাংবাদিক জিন ডোমিনিক ববি (Jean-Dominique Bauby)। স্ট্রোকের পর তার পুরো শরীর প্রায় অবশ হয়ে যায়, তিনি অনুভূমিক দিকে (আড়াআড়ি) চোখ নড়াতে পারতেন না, কিন্তু উল্লম্ব দিকে (ওপর-নিচে) নড়াতে পারতেন এবং কেবল চোখের পলক ফেলতে পারতেন। সেই উল্লম্ব দৃষ্টি ও পলক দিয়েই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত বই The Diving Bell and the Butterfly। তার সহকারীরা একে একে অক্ষর উচ্চারণ করতেন, আর তিনি চোখের পলকে অক্ষর নির্বাচন করতেন। কল্পনা করুন, একটি সম্পূর্ণ বই, শুধু একটি চোখের পাতার ইশারায় লেখা! কেনো হয়? লকড-ইন সিন্ড্রোম সাধারণত ব্রেইনস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পনসের (Pons) ভেন্ট্রাল (সামনের) অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে হয়। পনস মস্তিষ্কের চিন্তা ও শরীরের প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে সেতুর মতো কাজ করে। যখন স্ট্রোক, রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে এই অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তখন মস্তিষ্কের চেতনা অক্ষত থাকলেও শরীরে নির্দেশ পৌঁছানোর পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে রোগী সব বুঝতে পারেন, কিন্তু হাত-পা, মুখ কিংবা শরীর নড়াতে পারেন না। (খুবই বিরল ক্ষেত্রে ব্রেইনস্টেমের অন্য অংশেও ক্ষত হতে পারে, তবে মূল কারণ পনসের সামনের অংশ) এই রোগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, রোগী নিজের শরীরের ভেতর যেন বন্দি হয়ে যান। তিনি ব্যথা অনুভব করতে পারেন (যদিও তা সব ক্ষেত্রে এক রকম নাও থাকতে পারে), বিরক্ত হন, ভালোবাসা বোঝেন, একাকিত্বে কষ্ট পান, কিন্তু তা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা ভুল করে ভাবেন রোগী অচেতন। অথচ তিনি হয়ত সব শুনছেন। তাই লকড-ইন রোগীর পাশে কথা বলার সময় সম্মান, ধৈর্য ও মানবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  মনে রাখবেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোমা (অচেতন) আর লকড-ইন (সচেতন কিন্তু অবশ) সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা — একজন কোমায় থাকা রোগী চোখ খোলেন না, কিন্তু লকড-ইন রোগী চোখ খোলেন এবং উল্লম্ব দৃষ্টি বা পলকে অর্থপূর্ণ সাড়া দিতে পারেন। তবে এই অন্ধকার অবস্থার মাঝেও আশার আলো আছে। অনেক রোগী চোখের পলক, উল্লম্ব চোখের নড়াচড়া কিংবা আধুনিক আই-ট্র্যাকিং ও ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে শেখেন।  চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে মানুষের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তি কত গভীর ও বিস্ময়কর হতে পারে। কখনো কখনো একটি ক্ষীণ চোখের পলকই প্রমাণ করে দেয়, নীরব শরীরের ভেতর এখনো জেগে আছে একটি সম্পূর্ণ সচেতন পৃথিবী। ডা. সাঈদ এনাম  সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি)  (ডিএমসি কে-৫২, বিসিএস-২৪)

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow