‘ছেলেটার পোড়া শরীর, হাত-পা বেঁকে যাচ্ছে, চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব’
‘ছেলেটার পোড়া শরীর। অর্ধেক শরীরই পুড়েছে। হাসপাতাল থেকে আনার পর পোড়া জায়গাগুলো কুঁচকে যাচ্ছে, হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস হাসপাতালে ছিল। এখনো চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে আমি নিঃস্ব। কেউ আমাদের পাশে নেই।’ কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে ফেরা নাভিদ নেওয়াজ দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান। ৩৬ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বিভীষিকাময় সেই ঘটনার এক বছর উপলক্ষে রোববার (১৯ জুলাই) মোবাইল ফোনে নাভিদের বাবার সঙ্গে কথা হয়। কথোপকথনের শুরুতেই কেমন আছেন- প্রশ্ন করতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে যান তিনি। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চলে উদ্ধার অভিযান/ফাইল ছবি মিজানুর রহমান বলেন, ‘যারা আরও আহত আছে, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। নাভিদের মতো আরও অনেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদেরও একই সমস্যা। কারও শরীরের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে, কারও হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সবাই চিকিৎসা করতে হিমশিম খাচ্ছে।’ ‘সন্তানদের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র, স্কুল কর্তৃপক্ষ, কেউ আমাদ
‘ছেলেটার পোড়া শরীর। অর্ধেক শরীরই পুড়েছে। হাসপাতাল থেকে আনার পর পোড়া জায়গাগুলো কুঁচকে যাচ্ছে, হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস হাসপাতালে ছিল। এখনো চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার খরচ যোগাতে গিয়ে আমি নিঃস্ব। কেউ আমাদের পাশে নেই।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বেঁচে ফেরা নাভিদ নেওয়াজ দীপ্তর বাবা মিজানুর রহমান।
৩৬ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া বিভীষিকাময় সেই ঘটনার এক বছর উপলক্ষে রোববার (১৯ জুলাই) মোবাইল ফোনে নাভিদের বাবার সঙ্গে কথা হয়। কথোপকথনের শুরুতেই কেমন আছেন- প্রশ্ন করতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে যান তিনি।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চলে উদ্ধার অভিযান/ফাইল ছবি
মিজানুর রহমান বলেন, ‘যারা আরও আহত আছে, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। নাভিদের মতো আরও অনেকে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদেরও একই সমস্যা। কারও শরীরের চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে, কারও হাত-পা বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সবাই চিকিৎসা করতে হিমশিম খাচ্ছে।’
‘সন্তানদের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র, স্কুল কর্তৃপক্ষ, কেউ আমাদের খোঁজ রাখে না। ক্ষতিপূরণ নেই, কোনো পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও নেই’ যোগ করেন তিনি।
দুর্ঘটনার সময় নাভিদ মাইলস্টোনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বয়স ছিল ১২ বছর। আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। তার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে যায়।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর, এখনো তাড়া করে ভয়ংকর স্মৃতি

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির বছরপূর্তিতে দোয়া-স্মরণসভা
৩৬ বার অপারেশন, ৮ দফা স্কিন গ্রাফটিং
নাভিদের বাবা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে ৯৭ দিন চিকিৎসা নিয়েছে। এরপর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে বাড়িতে ফিরি। চিকিৎসাকালে তার শরীরে ৩৬ বার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। স্কিন গ্রাফটিং (শরীরের একটি অংশ থেকে ত্বক কেটে নিয়ে অন্য ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রতিস্থাপন) করা হয়েছে আটবার।’
তিনি জানান, উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর নাভিদকে ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। এরপর ২২ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ), ৩৫ দিন হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) এবং সবশেষ ৪০ দিন সে কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিল।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্বজনদের আর্তনাদ/ফাইল ছবি
দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল চিকিৎসা
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, ‘যে প্রশিক্ষণ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিল, সেটির ফুয়েল অনেক পাওয়ারফুল। যেখানে লেগেছে, একেবারে জ্বলে গেছে, ঝলসে গেছে। একবার অপারেশন করলে ঠিক হয়ে গেলেও তিন মাস পর আবার ওখানে পচন ধরতে পারে। তখন ফের অপারেশন করা লাগে। এটা অনেক এক্সপেন্সিভ (ব্যয়বহুল)।’
নাভিদের চিকিৎসার কথা স্মরণ করে অধ্যাপক নাসির উদ্দীন জানান, ওর পুড়ে যাওয়ার ধরন ছিল মিশ্র। তবে বেশির ভাগ জায়গায় ছিল গভীর পোড়া। দুই হাত, পিঠ ও শরীরের কিছু অংশ এবং শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার শ্বাসযন্ত্রে গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ফুসফুসে পানি জমে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘তিন দফায় আমরা ভেবেছিলাম, নাভিদ হয়তো বাঁচবে না। তার মা-বাবাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতও করতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ও চিকিৎসকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সে বেঁচে আছে। এ ধরনের রোগীদের জন্য যে চিকিৎসাটা নিয়মিত লাগে, সেটা চালিয়ে নিতেই হবে।’

‘স্বপ্নে দেখি আরিয়ানের সঙ্গে খেলছি, টিফিন খাচ্ছি, দৌড়াচ্ছি’

‘ছুটির পর আইসো একসঙ্গে দোল খাবো বলা ফুলগুলো হারিয়ে গেছে’
খোঁজ রাখি, যতটুকু করা যায় করছি: স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা
এ বিষয়ে কথা হলে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, ‘আহতদের প্রায় সবাই ক্লাসে ফিরেছে। কয়েকটা বাচ্চা আছে, যাদের অবস্থা বেশি খারাপ, তারা ধীরে ধীরে উন্নতি করছে। তাদের পরিবারের সবার সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হয়। আমাদের দিক থেকে যা করার, আমরা তা করছি।
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার সেসময় একটা ঘোষণা দিয়েছিল। নিহতদের জন্য ২০ লাখ এবং আহতদের জন্য ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদের অনেকবার বলেছে টাকাটা গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু অভিভাবকরা যেহেতু টাকাটা নিতে রাজি হননি, ফলে আমরা টাকাটা গ্রহণ করিনি। এ কারণে একজন অভিভাবকও টাকা পাননি।’
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন/ছবি: জাগো নিউজ
ফিরে দেখা সেই দিনটি
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে।
দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট শিশুদের কোমল শরীর। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। সেদিন প্রাণ হারান পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
এএএইচ/একিউএফ
What's Your Reaction?