জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটুক আগামী বাজেটে

একটি দেশের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং এটি একটি জাতির আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক রূপরেখা। প্রতিবছর জুন মাস এলে সাধারণ মানুষের নজর থাকে জাতীয় সংসদের দিকে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস—সবখানেই উচ্চারিত হয় এক প্রশ্ন - বাজেটে আমাদের জন্য কী আছে? কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে এক গভীর ব্যবধান তৈরি করেছে। একদিকে আকাশচুম্বী বাজারদর, অন্যদিকে সীমিত রাজস্ব আহরণ—প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই দ্বিমুখী চাপে এবারের বাজেট এক কঠিন সমীকরণে রূপ নিয়েছে। সংকট ও স্বপ্ন: বাজেট ভাবনা ২৩ এপ্রিল ২০২৬, জাতীয় সংসদে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও কৌশলগত দিকনির্দেশনামূলক বাজে

জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটুক আগামী বাজেটে

একটি দেশের বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং এটি একটি জাতির আগামী এক বছরের অর্থনৈতিক রূপরেখা। প্রতিবছর জুন মাস এলে সাধারণ মানুষের নজর থাকে জাতীয় সংসদের দিকে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস—সবখানেই উচ্চারিত হয় এক প্রশ্ন - বাজেটে আমাদের জন্য কী আছে? কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও সরকারের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে এক গভীর ব্যবধান তৈরি করেছে। একদিকে আকাশচুম্বী বাজারদর, অন্যদিকে সীমিত রাজস্ব আহরণ—প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এই দ্বিমুখী চাপে এবারের বাজেট এক কঠিন সমীকরণে রূপ নিয়েছে।

সংকট ও স্বপ্ন: বাজেট ভাবনা

২৩ এপ্রিল ২০২৬, জাতীয় সংসদে চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও কৌশলগত দিকনির্দেশনামূলক বাজেট। সরকার প্রায় ৯.২ থেকে ৯.৩ লাখ কোটি টাকার এই বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জনস্বস্তি নিশ্চিত করা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

পাশাপাশি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, এই পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমন বাস্তবতায় সরকার ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

মূল্যস্ফীতি ও জনদুর্ভোগ:

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্যমতে, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক সময় ১০ থেকে ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে। যখন চাল, ডাল, তেল ও ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তখন বড় বড় মেগা প্রজেক্টের আলোচনা তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় এবারের বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা—এমন একটি কর কাঠামো ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, যা সরাসরি তাদের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) শর্ত পূরণ এবং রাজস্ব বাড়ানোর চাপে সরকারকে ভ্যাটসহ পরোক্ষ কর বৃদ্ধির পথে হাঁটতে হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

রাজস্ব আহরণ: লক্ষ্যমাত্রা ও সীমাবদ্ধতা

একটি জনকল্যাণমুখী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আহরণ অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে—প্রায় ৮–৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রতি বছর বাজেটে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্থবছর শেষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তা অর্জনে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ঘাটতি বিদ্যমান। বাস্তবতা হলো, প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করে যখন সরকার পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন আয় বৈষম্য আরও গভীর হয়। অন্যদিকে, জনগণের প্রত্যাশা হলো—পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার এবং কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা। কিন্তু নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এসব প্রত্যাশার প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে দেখা যায় না।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের হাহাকার

একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হলো তার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত, কিন্তু বাংলাদেশে তা ২ শতাংশের নিচেই ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে "লার্নিং ডেফিসিট" বা শিখন ঘাটতি মেটাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন, তা বাজেটে পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বরাদ্দ এখনো তলানিতে। সরকারি হাসপাতালের সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পকেট থেকে প্রায় ৬৮ শতাংশ ব্যয় করতে হয়। জনগণের প্রত্যাশা হলো একটি নিরাপদ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং কর্মমুখী শিক্ষানীতি, কিন্তু প্রশাসনিক ব্যয় ও উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণের সুদ মেটাতেই বাজেটের সিংহভাগ অর্থ চলে যাচ্ছে।

বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ

দেশের স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একদিকে শিল্পমালিকরা উল্লেখ করছেন যে বাজারে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার জীবনযাপন করছে। এই বৈপরীত্য দেশের শ্রমবাজারের একটি গভীর কাঠামোগত সংকটকে নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা হলো এসএমই (SME) খাতে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগকে সফল করতে হলে দেশীয় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা, প্রণোদনা এবং নীতিগত সহায়তা বাজেটে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। অন্যদিকে, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাত—যেমন কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইটি সেবা—এখনো পর্যাপ্ত নীতি সহায়তা ও বাজেট বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশ আজ যখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, তখন এর মূল ভিত্তি হতে হবে একটি 'মানবিক' বাজেট; যা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেখাবে না, বরং মানুষের পুষ্টি, শিক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে কর ফাঁকি রোধ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে জনস্বার্থে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। পরিসংখ্যানের কচকচানি নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামী বাজেট হোক সংকটে থাকা মানুষের জন্য এক টুকরো আশার আলো।

সামাজিক সুরক্ষা: প্রতিশ্রুতি না প্রাপ্তি

বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা বহুমুখী হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রায় ২২–২৫ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষ এখনো এসব সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সঠিক বণ্টনের অভাবে বাজেটের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে টার্গেটেড, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জরুরি। অন্যদিকে, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। এসব উদ্যোগ দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক হলেও এগুলো কার্যকর করতে বাজেটে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ প্রয়োজন, যা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় আরও বাড়াচ্ছে এবং সামগ্রিক বাজেটে চাপ তৈরি করছে। এই বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জটি দ্বিমুখী—একদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সীমিত সম্পদের মধ্যে বাজেটের ভারসাম্য বজায় রাখা। তাই শুধু বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন দক্ষ বাস্তবায়ন ও প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা।

বৈদেশিক রিজার্ভ ও ডলার সংকট:

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে। কয়েক বছর আগে যেখানে রিজার্ভ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২০–২৫ বিলিয়ন ডলারে। এর ফলে ডলার সংকট তীব্র হয়েছে, আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটেছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্য আমদানির চাপ অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলছে। এই বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা হলো—বাজেটে এমন নীতি গ্রহণ করা, যা রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবাহ জোরদার এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

ঋণের বোঝা ও বাজেটের সক্ষমতা:

বাজেটের একটি বড় অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে ক্রমেই সীমিত করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মোট বাজেটের প্রায় ১৫–২০ শতাংশই শুধু সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে—যা উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর একটি উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করছে। গত কয়েক বছরে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। ফলে সরকারের আয় কম থাকায় যখন ব্যাংক খাত থেকে বড় অংকের ঋণ নেওয়া হয়, তখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ওপর। জনগণ চায় ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝা কমিয়ে আনা হোক এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে বাজেটকে আরও কার্যকর করা হোক, কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস ও ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির তেমন দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

কেমন বাজেট চাই : প্রত্যাশার রূপরেখা

বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের চাওয়া খুব বেশি জটিল নয়, বরং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। জনগণের এই আকুতিকে চারটি প্রধান স্তম্ভে ভাগ করা যায়: ​প্রথমত, একটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণমূলক বাজেট, যেখানে খাদ্য ও জ্বালানি খাতে কার্যকর নীতি থাকবে যাতে সাধারণের পকেটে স্বস্তি ফেরে।

​দ্বিতীয়ত, একটি মানুষকেন্দ্রিক বাজেট, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদী মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে।

​তৃতীয়ত, একটি বিনিয়োগবান্ধব বাজেট, যাতে বেসরকারি খাত সক্রিয় হয় এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

​চতুর্থত, একটি সুশাসনভিত্তিক বাজেট, যেখানে

ব্যয়সংকোচনের মাধ্যমে অপচয় ও দুর্নীতি কমিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

সুসংহত বাজেট বাস্তবায়নে আমাদের করণীয়:

এই প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

​প্রথমত, বাজার তদারকি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শুধু শুল্ক কমিয়ে নয়, বরং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে খাদ্য মূল্যস্ফীতি একক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে হবে। ​দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো। পরোক্ষ করের বোঝা না চাপিয়ে উচ্চবিত্ত ও কর ফাঁকিবাজদের থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। ​তৃতীয়ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় (Out-of-pocket expenditure) কমাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। ​চতুর্থত, কৃষি ও এসএমই খাতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ সফল করতে কারিগরি শিক্ষায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। ​পঞ্চমত, সুশাসন নিশ্চিত করা ও অপচয় রোধ। বিলাসদ্রব্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে হবে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশ আজ যখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে, তখন এর মূল ভিত্তি হতে হবে একটি 'মানবিক' বাজেট; যা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য দেখাবে না, বরং মানুষের পুষ্টি, শিক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে কর ফাঁকি রোধ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে জনস্বার্থে বিনিয়োগ বাড়ানো অপরিহার্য। পরিসংখ্যানের কচকচানি নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন জমিনে দাঁড়িয়ে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামী বাজেট হোক সংকটে থাকা মানুষের জন্য এক টুকরো আশার আলো।

লেখক : কলেজ শিক্ষক। [email protected]

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow