জবাবদিহিতাহীন সংস্কৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

আমাদের দেশে ধর্ষণ সহ যৌন সহিংসতা যেন খুব সাধারণ ঘটনা, পত্রিকা খুললেই প্রতিদিন ৭/৮ টি ঘটনা ধীরে ধীরে আমাদের অনুভূতিকে যেন ভোঁতা করে তুলেছে। কিন্তু নেত্রকোনার মদন উপজেলায় এক শিশুকন্যার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদেরকে নিজেদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মাত্র ১১ বছরের একটি শিশু—যার শরীর-মন এখনো কৈশোরের প্রাথমিক পরিবর্তন বুঝে ওঠার অবস্থায় পৌঁছায়নি—সে এমন এক নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নরপিশাচের নাম আমান উল্লাহ সাগর, মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল।  এই ঘটনা আমাদের কল্পনাকেও স্তব্ধ করে দেয়। মাসিক, ডিম্বাণু বা যৌনতা সম্পর্কে যার কোনো ধারণাই নেই, সেই শিশুটি যখন হঠাৎ তলপেটে অস্বস্তি অনুভব করে, ভেতরে কিছু নড়াচড়া টের পায়—এই অভিজ্ঞতা তার জন্য কতটা বিভ্রান্তিকর ও ভীতিকর, তা কোনো স্বাভাবিক মানুষ কল্পনাতেও নিতে পারবে কিনা, তা জানা নেই আমার।  এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে এর সঙ্গে কিছু সরলীকৃত ও একমুখী প্রতিক্রিয়াও সামনে আসছে। অনেকে কেবল নারী মাদ্রাসা বন্ধের কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ছেলে শিশুরাও এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই

জবাবদিহিতাহীন সংস্কৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব

আমাদের দেশে ধর্ষণ সহ যৌন সহিংসতা যেন খুব সাধারণ ঘটনা, পত্রিকা খুললেই প্রতিদিন ৭/৮ টি ঘটনা ধীরে ধীরে আমাদের অনুভূতিকে যেন ভোঁতা করে তুলেছে। কিন্তু নেত্রকোনার মদন উপজেলায় এক শিশুকন্যার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি আমাদেরকে নিজেদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মাত্র ১১ বছরের একটি শিশু—যার শরীর-মন এখনো কৈশোরের প্রাথমিক পরিবর্তন বুঝে ওঠার অবস্থায় পৌঁছায়নি—সে এমন এক নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নরপিশাচের নাম আমান উল্লাহ সাগর, মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। 

এই ঘটনা আমাদের কল্পনাকেও স্তব্ধ করে দেয়। মাসিক, ডিম্বাণু বা যৌনতা সম্পর্কে যার কোনো ধারণাই নেই, সেই শিশুটি যখন হঠাৎ তলপেটে অস্বস্তি অনুভব করে, ভেতরে কিছু নড়াচড়া টের পায়—এই অভিজ্ঞতা তার জন্য কতটা বিভ্রান্তিকর ও ভীতিকর, তা কোনো স্বাভাবিক মানুষ কল্পনাতেও নিতে পারবে কিনা, তা জানা নেই আমার। 

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে এর সঙ্গে কিছু সরলীকৃত ও একমুখী প্রতিক্রিয়াও সামনে আসছে। অনেকে কেবল নারী মাদ্রাসা বন্ধের কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ছেলে শিশুরাও এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রকাশ পায় না। 

মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণের ঘটনা সামনে এলেই খুব সাধারণ একটি আক্রমণ হচ্ছে ‘স্কুল-কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়েও তো হয়’ ধরনের তুলনা টানা, মূলত এটি বিভ্রান্তিকর কৌশল, যা অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় whataboutism হিসেবে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মূল অপরাধের দায় ও গুরুত্বকে আড়াল করে আলোচনাকে অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা সমাজে দেখা যায়। একই সঙ্গে Techniques of Neutralization অনুযায়ী এটি এমন এক মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে অপরাধ বা তার পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিরা ‘সব জায়গাতেই ঘটে’ বলে নৈতিক দায় কমিয়ে দেখাতে চান। 

ফলে ধীরে ধীরে ভয়াবহ অপরাধও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক বা সহনীয় বলে মনে হতে শুরু করে, যা ভুক্তভোগীর প্রতি সহানুভূতি কমায় এবং প্রতিষ্ঠানগত জবাবদিহিতা দুর্বল করে। বাস্তবে অপরাধবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলে—একটি অপরাধ অন্য অপরাধকে কখনোই বৈধতা দেয় না; বরং প্রতিটি ঘটনার জন্য আলাদা করে দায় নির্ধারণ, কাঠামোগত সমস্যা শনাক্ত করা এবং কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।

মাদ্রাসাগুলোর একটি অংশে এখনো নিবন্ধন, জবাবদিহিতা ও নিয়মিত রেকর্ড সংরক্ষণের ঘাটতি স্পষ্ট; ফলে কোনো অপরাধ ঘটলে তা শনাক্ত, নথিবদ্ধ ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঘটনা প্রকাশিত হলে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত ও বিচার এগোয়, অনেক ক্ষেত্রে মাদ্রাসায় সে ধরনের সুসংগঠিত ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকে। যদিও কিছু মাদ্রাসা বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ–এর আওতায় রয়েছে, তবুও অনিয়ন্ত্রিত অংশে তদারকির দুর্বলতা বড় ফাঁক তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় আস্থার প্রশ্ন—বাংলাদেশের মানুষের ইসলাম–এর প্রতি গভীর বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে চায়, যার ফলে গুরুতর অপরাধ নিয়েও অনেক সময় খোলামেলা আলোচনা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যে পরিবেশে জবাবদিহিতা নেই এবং কার্যকর নজরদারি অনুপস্থিত, সেখানে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনেক সময় বিকৃত আচরণকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। এই মানসিকতা ভবিষ্যতে সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করে এবং একটি বিপজ্জনক সামাজিক চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সামাজিক নীরবতার ফল।

এই ফল কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের জ্যামাইকা এলাকার সাটফিন বুলেভার্ডে অবস্থিত মসজিদ বিলাল কুইন্স ইসলামিক সেন্টারে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৫৫ বছর বয়সী তাজুল ইসলাম একাধিক মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন—এ ঘটনাও একই সত্যকে সামনে আনে। অর্থাৎ, এই ধরনের পরিবেশ শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ভবিষ্যতে সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করে এবং ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সামাজিক চক্রকে স্থায়ী করে তোলে। 

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দিন দিন শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে। শিশুদের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে মাদ্রাসা কিংবা কিন্ডারগার্টেনে। কেন এমনটা হচ্ছে? এর পেছনে আমাদের সামাজিক ও নীতিগত কিছু দুর্বলতা স্পষ্টভাবে কাজ করছে। 

প্রথমত, আমরা খুব সহজেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। কোনো সমস্যা হলেই সেটি সমাধান না করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে অভিভাবকদের আস্থা কমে যায়। 
দ্বিতীয়ত, নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার সন্তানের সারাদিনের দেখভালের জন্য মাদ্রাসাকে তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। সেখানে শিশুরা সারাদিন থাকে, বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম থাকে—অভিভাবকেরা এটাকে নিরাপত্তা হিসেবে দেখেন। পাশাপাশি অনেক মাদ্রাসায় খাবারের ব্যবস্থাও থাকে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় একটি সুবিধা। 

তৃতীয়ত, বাবা-মা ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানসিকতার জায়গা থেকে সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠান। তাদের কাছে এটি কেবল শিক্ষার বিষয় নয়, বরং এক ধরনের আত্মিক দায়বদ্ধতা ও তৃপ্তির বিষয়। অনেকেই মনে করেন, সন্তানকে আলেম হিসেবে গড়ে তোলা নৈতিক দায়িত্ব পালন করার একটি পথ। পাশাপাশি, কিছু ক্ষেত্রে নিজের পাপ মোচনের উপায় হিসেবেও সন্তানের এই পথকে দেখার মানসিকতার প্রবণতা দেখা যায়—যার ফলে মাদ্রাসাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো এখনো সেই অর্থে আকর্ষণ তৈরি করতে পারেনি। আমরা এখনো একটি কার্যকর মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু করতে পারিনি, যা শিশুদের স্কুলমুখী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। ফলে বাস্তবতা হচ্ছে—অভিভাবকরা শুধু শিক্ষা নয়, সন্তানের নিরাপত্তা, দেখভাল, খাদ্য এবং নিজেদের বিশ্বাস—সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর এই জায়গাগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে থাকায় তারা ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।

এই ঘটনার আলোকে আমাদের করণীয়গুলো স্পষ্ট এবং জরুরি। 

প্রথমত, সব ধরনের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যেন জবাবদিহিতার বাইরে না থাকে—এটি রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিশু নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ, গোপনীয় ও সহজলভ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভুক্তভোগী বা প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয় ও সামাজিক চাপ ছাড়াই কথা বলতে পারে।

তৃতীয়ত, ধর্ষণ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ—এটি কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশ, আপস-মীমাংসা বা সামাজিক চাপে ধামাচাপা দেওয়ার বিষয় নয়। ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ করতে হবে এবং ধর্ষকের সঙ্গে ভিকটিমের বিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ও বেআইনি প্রথা সম্পূর্ণরূপে রোধ করতে হবে।

চতুর্থত, আইনের প্রয়োগে কোনো সামাজিক, ধর্মীয় বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজকে ভুক্তভোগী এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা ও সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে শিশুদের জন্য বয়স-উপযোগী যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ঝুঁকির লক্ষণ চিনতে পারে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা চাইতে পারে।

ষষ্ঠত, দরিদ্র পরিবারের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত বিকল্প শিক্ষা ও যত্নব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সন্তান পাঠাতে না হয়।

সপ্তমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে—ভিকটিমের পরিচয় রক্ষা করে অপরাধীর পরিচয় প্রকাশ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের স্বীকার করতে হবে—এই সমস্যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর সমস্যা। আমরা যদি এখনো অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে স্বীকৃতি না দিই, এসকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দল, মত কিংবা ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে আরও অনেক শিশুর শৈশব একইভাবে থেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। কে জানে—উদাসীনতার এই ধারাবাহিকতা একদিন হয়তো আমাদের নিজেদের সন্তানদেরও বাংলাদেশেই এপ্সটেইন এর অংশ হয়ে যেতে পারে। 

মোনছেফা তৃপ্তি 
পরিবেশ ও নারী অধিকারকর্মী 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow