জমাট বরফে রক্তধারা, ৫০ লাখ বছরের গোপন রহস্য
বরফে মোড়া এক নির্জন মহাদেশ। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা নিস্তব্ধতা এত ঘন যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়। অথচ সেই বরফরাজ্যের বুক চিরে কোথাও যেন রক্ত ঝরছে! দূর থেকে দেখলে মনে হবে বরফের দেয়ালে কেউ লাল রং ঢেলে দিয়েছে। প্রকৃতির এই রহস্যময় দৃশ্যই হলো ব্লাড ফলস পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর জলপ্রপাত, যা অবস্থিত ম্যাকমুরডো ড্রাই ভ্যালিজ অঞ্চলে, টেলর হিমবাহর প্রান্তে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক টমাস গ্রিফিথ টেলর প্রথম এই অদ্ভুত লাল জলপ্রপাত লক্ষ্য করেন। তার নামানুসারেই হিমবাহটির নাম রাখা হয় টেলর গ্লেসিয়ার। সে সময় অভিযাত্রীরা ভেবেছিলেন, লাল রঙের জন্য দায়ী কোনো শৈবাল। বরফের মাঝে শৈবালের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল না, তাই অনুমানটিও অযৌক্তিক মনে হয়নি। কিন্তু পরবর্তী এক শতাব্দীর গবেষণা জানাল ভিন্ন গল্প এ রঙের উৎস জীব নয়, বরং রসায়ন। ব্লাড ফলসের লাল রঙের রহস্য লুকিয়ে আছে হিমবাহের প্রায় ৪০০ মিটার নিচে। প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে এই উপত্যকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। পরে হিমবাহ অগ্রসর হয়ে সেই জলাধারকে বরফের নিচে বন্দি করে ফেলে। সূর্যালোক ও অক্সিজেন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন
বরফে মোড়া এক নির্জন মহাদেশ। চারদিকে শুধু সাদা আর সাদা নিস্তব্ধতা এত ঘন যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যায়। অথচ সেই বরফরাজ্যের বুক চিরে কোথাও যেন রক্ত ঝরছে! দূর থেকে দেখলে মনে হবে বরফের দেয়ালে কেউ লাল রং ঢেলে দিয়েছে। প্রকৃতির এই রহস্যময় দৃশ্যই হলো ব্লাড ফলস পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর জলপ্রপাত, যা অবস্থিত ম্যাকমুরডো ড্রাই ভ্যালিজ অঞ্চলে, টেলর হিমবাহর প্রান্তে।
১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক টমাস গ্রিফিথ টেলর প্রথম এই অদ্ভুত লাল জলপ্রপাত লক্ষ্য করেন। তার নামানুসারেই হিমবাহটির নাম রাখা হয় টেলর গ্লেসিয়ার। সে সময় অভিযাত্রীরা ভেবেছিলেন, লাল রঙের জন্য দায়ী কোনো শৈবাল। বরফের মাঝে শৈবালের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিল না, তাই অনুমানটিও অযৌক্তিক মনে হয়নি। কিন্তু পরবর্তী এক শতাব্দীর গবেষণা জানাল ভিন্ন গল্প এ রঙের উৎস জীব নয়, বরং রসায়ন।
ব্লাড ফলসের লাল রঙের রহস্য লুকিয়ে আছে হিমবাহের প্রায় ৪০০ মিটার নিচে। প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে এই উপত্যকায় লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে। পরে হিমবাহ অগ্রসর হয়ে সেই জলাধারকে বরফের নিচে বন্দি করে ফেলে। সূর্যালোক ও অক্সিজেন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই উপ-হিমবাহ হ্রদে জমা থাকে লোহা-সমৃদ্ধ, অত্যন্ত লবণাক্ত (সমুদ্রের পানির চেয়েও বেশি) পানি।
এই অতিলবণাক্ততা পানিকে জমাট বাঁধা থেকে রক্ষা করে, এমনকি তাপমাত্রা-১৯° সেলসিয়াসে নেমে গেলেও। যখন এই লবণাক্ত তরল সরু ফাটল বেয়ে বাইরে আসে, তখন বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে লৌহঘটিত আয়ন দ্রুত জারিত হয়ে ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয় যা মূলত মরিচার মতো লালচে রঙের। ফলে সাদা বরফের ওপর রক্তের মতো লাল জলধারা গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
২০১৭ সালে আধুনিক প্রোব ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা নির্গমনস্থলের প্রায় ৯০ মিটার দূরে বরফ ভেদ করে নমুনা সংগ্রহ করেন। তাতে নিশ্চিত হয়, এই জলাধারে রয়েছে অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে টিকে থাকা বিশেষ ধরনের অণুজীব। তারা লোহা ও সালফারভিত্তিক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে যা সূর্যালোক ছাড়াই জীবনের সম্ভাবনা দেখায়।
এই আবিষ্কার শুধু পৃথিবীর জন্য নয়, মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ ইউরোপা কিংবা শনি গ্রহের উপগ্রহ এনসেলাডাসের বরফস্তরের নিচেও অনুরূপ লবণাক্ত জলাধার থাকতে পারে। ব্লাড ফলস তাই ভিনগ্রহে জীবনের সম্ভাব্য মডেল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ব্লাড ফলস সারা বছর সমানভাবে প্রবাহিত হয় না। উষ্ণ মাসগুলোতে হিমবাহের নিচের হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ বৃদ্ধি পায়, ফলে লাল জলধারার প্রবাহও বেড়ে যায়। শীতকালে প্রবাহ তুলনামূলক কমে আসে, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে বরফের নিচের জলাধার এখনো সক্রিয়।
ম্যাকমুরডো ড্রাই ভ্যালি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক ও শীতল মরুভূমিগুলোর একটি। এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম, আর তীব্র ঠান্ডা ও বাতাস পরিবেশকে আরও কঠোর করে তোলে। সাধারণ পর্যটকের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব মূলত গবেষকরা হেলিকপ্টারে করে যান। ফলে ব্লাড ফলসের রহস্যময় আবেদন এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
অ্যান্টার্কটিকার বরফস্তর দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহ গলনের হার বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করছেন, ভবিষ্যতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ব্লাড ফলসের প্রবাহ কি বাড়বে, নাকি বরফের গঠন বদলে গিয়ে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের রূপ পরিবর্তিত হবে। একই সঙ্গে আশঙ্কা আছে, বরফ গলে গেলে উপ-হিমবাহের প্রাচীন জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্লাড ফলস আমাদের শেখায় প্রকৃতির সবচেয়ে কঠোর, নিষ্ঠুর পরিবেশেও জীবন ও রসায়নের বিস্ময় লুকিয়ে থাকতে পারে। বরফ, লোহা, লবণ আর সময় এই চার উপাদানের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য দৃশ্য, যা একই সঙ্গে ভীতিকর, রহস্যময় এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অমূল্য।
অ্যান্টার্কটিকার নিস্তব্ধ সাদা মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে এই লাল জলধারা যেন বলে পৃথিবী এখনো পুরোপুরি আবিষ্কৃত হয়নি। বরফের নিচে, অন্ধকারের গভীরে, সময়ের স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে অজস্র গল্প যা জানার অপেক্ষায় মানবসভ্যতা।
সূত্র: দ্য সানডে গার্ডিয়ান, ডেইলি মেইল
আরও পড়ুন
দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
ফেব্রুয়ারি মাস কেন ২৮ দিনে হয় জানেন?
কেএসকে
What's Your Reaction?