জাকাত আদায়ের ২৭ উপকারিতা

জাকাতের অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। নিচে কোরআন-হাদিসের আলোকে কয়েকটি  উপকারিতা উল্লেখ করা হলো। ১. জাকাত আদায় করা মুমিনের শিআর বা নিদর্শন মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রব-এর ওপরই নির্ভর করে, যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিজক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে; তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের রবের কাছে তাদেরই জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদাসমূহ, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।’ (সুরা আনফাল : ২-৪) ২. জাকাত জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তোমাদেরকে লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। তাতে প্রবেশ করবে সে-ই, যে নিতান্ত হতভাগ্য, যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকিকে, যে স্বীয় সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য।’(সুরা লাইল : ১৪-১৮) ৩. জাকাত আদায় করা তাকওয়ার পরিচায়ক মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, গ্রহণ করবে তা, যা তাদের রব তাদেরকে দেবেন; নিশ্চয় ইতোপূর্বে তারা ছিল সৎকর্মশীল, তারা রাতের

জাকাত আদায়ের ২৭ উপকারিতা

জাকাতের অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। নিচে কোরআন-হাদিসের আলোকে কয়েকটি  উপকারিতা উল্লেখ করা হলো।

১. জাকাত আদায় করা মুমিনের শিআর বা নিদর্শন

মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রব-এর ওপরই নির্ভর করে, যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিজক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে; তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের রবের কাছে তাদেরই জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদাসমূহ, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।’ (সুরা আনফাল : ২-৪)

২. জাকাত জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম

মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তোমাদেরকে লেলিহান আগুন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছি। তাতে প্রবেশ করবে সে-ই, যে নিতান্ত হতভাগ্য, যে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। আর তা থেকে দূরে রাখা হবে পরম মুত্তাকিকে, যে স্বীয় সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির জন্য।’(সুরা লাইল : ১৪-১৮)

৩. জাকাত আদায় করা তাকওয়ার পরিচায়ক

মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুত্তাকিরা থাকবে জান্নাতসমূহে ও ঝর্ণাধারায়, গ্রহণ করবে তা, যা তাদের রব তাদেরকে দেবেন; নিশ্চয় ইতোপূর্বে তারা ছিল সৎকর্মশীল, তারা রাতের সামান্য অংশই অতিবাহিত করত নিদ্রায়, আর রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর তাদের ধন-সম্পদে রয়েছে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতের হক।’(সুরা জারিয়াত : ১৫-১৯) 

৪. জাকাত আদায় করলে বহুগুণ সওয়াব অর্জন হয়

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে জাকাত তোমরা দাও (তা-ই বৃদ্ধি পায়), সুতরাং তারাই সমৃদ্ধশালী।’ (সুরা রূম : ৩৯)  

৫. জাকাতের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায়

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ কোনো কুফুরকারী, পাপীকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা বাক্বারা : ২৭৬)

৬. জান্নাতে যাওয়ার আমলসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো জাকাত দেওয়া

হাদিসে এসেছে, হজরত আবু দারদা (রাজি.)-এর সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে পাঁচটি কাজ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কাজগুলো হলো, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু ও রুকু-সিজদা সহকারে নির্ধারিত সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, রমাজান মাসের সিয়াম পালন করবে, পথখরচের সামর্থ্য থাকলে হজ করবে এবং সন্তুষ্টচিত্তে জাকাত আদায় করবে।’(আবু দাউদ : ৪২৯)

৭. সিদ্দিক ও শহীদের মর্যাদায় উপনীত হওয়া

সিদ্দিক ও শহীদের মর্যাদায় উপনীত হওয়ার একটি মাধ্যম হলো জাকাত আদায় করা। হজরত আমর ইবনু মুররাহ আল-জুহানী (রাজি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি কুজাআহ গোত্র থেকে এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বললেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল। আমি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করি, রমজান মাসে রোজা রাখি, রমজানের রাতে নফল ও সুন্নাহ পড়ি এবং জাকাত আদায় করি।’ এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে, সে হবে সত্যবাদীদের (صِدِّيقِين) এবং শহীদদের (شُهَدَاء) অন্তর্ভুক্ত। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৩৪৩৮)

৮. জাকাত সম্পদের পবিত্রতা অর্জনের উপায়

হাদিস শরিফে হজরত খালিদ ইবনু আসলাম (রাহি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা হজরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রাজি.)-এর সাথে বের হলাম। এক মরুবাসী তাঁকে বলল, আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘যারা সোনা-রুপা জমা করে রাখে আর আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না’- এই আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করুন। হজরত ইবনু উমর (রাজি.) বললেন, যে ব্যক্তি সম্পদ জমা করে রাখে আর এর জাকাত আদায় করে না, তার জন্য রয়েছে শাস্তি। এ তো ছিল জাকাতের বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগের কথা। এরপর যখন জাকাতের বিধান অবতীর্ণ হলো, তখন মহান আল্লাহ জাকাতকে ধন-সম্পদের পবিত্রতা অর্জনের উপায় বানিয়ে দিলেন। (সুরা তওবা : ৩৪, বোখারি : ১৪০৪)  

৯. জাকাত ও সাদাকা মহান রবের অসন্তুষ্টি ও অপমৃত্যু রোধ করে

হজরত আনাস ইবনু মালিক (রাজি.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দান-খাইরাত আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টি দূর করে এবং অপমানজনক মৃত্যু রোধ করে। (তিরমিজি : ৬৬৪)

এছাড়াও জাকাতের ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক অনেক উপকারিতা রয়েছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

ধর্মীয় উপকারিতা

১. মহান আল্লাহর বিধান পালন করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

২. জাকাত বান্দাকে তার রবের নৈকট্যতা লাভে সহায়তা করে।

৩. জাকাত আদায় করলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার অর্জিত হয়।

৪. জাকাতের মাধ্যমে পাপ মুছে ফেলা হয়।

৫. সম্পদে বরকত হয় এবং সম্পদ বৃদ্ধি পায়। 

নৈতিক উপকারিতা

১. জাকাত মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তৈরি করে, যারা তাদের অসহায় ভাই-বোনদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখায়।

২. কৃপণতার মতো চরম নিন্দিত ও অসৎ গুণ জাকাতের মাধ্যমে দূরীভূত হয়।

৩. একজন মুসলিম যেহেতু জানে যে, তার আয়ের একটি অংশ অন্যদের সাহায্যে চলে যাচ্ছে, এতে তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা এবং ভালো কাজ করার প্রতি এক ধরনের আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। এটি তার আত্মপরিচয় শক্তিশালী করে।

সামাজিক উপকারিতা

১. ধনীর সম্পদ থেকে কিছু অংশ (জাকাত) গরিবদের দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস হয়। জাকাত সমাজে একটি ন্যায্য বিতরণ নিশ্চিত করে, যেখানে সবাই তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারে।

২. জাকাতের মাধ্যমে গরিবদের সহায়তা দেওয়া হয়, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। এতে তারা দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারে এবং নৈতিকভাবে সমাজে মর্যাদা লাভ করতে পারে।

৩. জাকাত সমাজে একতা, সহযোগিতা এবং ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং সকল শ্রেণীর মানুষকে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।

৪. জাকাত মুসলিম সম্প্রদায়ের শক্তি বৃদ্ধি করে।

৫. জাকাত দরিদ্রদের মধ্য থেকে শত্রুতা ও বিদ্বেষ দূর করে। কারণ যখন দরিদ্ররা দেখতে পায় যে, ধনী ব্যক্তিরা তাদের জন্য কিছু দেন, তখন তারা শত্রুতা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে প্রীতি ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠা করে।

৬. গরিবের প্রয়োজন পূর্ণ হয়।

৭. জাকাতের দ্বারা সমাজে সম্পদের প্রসার ঘটে।

৮. ক্রমান্বয়ে পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন হয়।

৯. জাকাতের মাধ্যমে সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতা শেষ হয়ে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

১০. গরিব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়।

লেখক : মুফতি আবদুর রহমান হোসাইনী

সিনিয়র মুফতি ও মুশরিফ, ফতওয়া বিভাগ, জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুস সালাম ঢাকা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow