বিয়ের প্রায় দশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও সন্তান না হওয়ায় মধুবালা অনুশোচনায় দগ্ধ হচ্ছিল। তার অনুশোচনার আগুন গোবিন্দকেও পোড়াচ্ছিল। আশপাশের ডাক্তার-কবিরাজ গুলিয়ে খাওয়ার পরও যখন তাদের আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছিল তখন কে যেন তাদের সামনে আশার ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে দিল। তার পরামর্শে তারা একদিন তাদের থানা থেকে তিন মাইল দূরে এক গ্রাম্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে মনস্থির করল।
ডাক্তারবাবুর বাড়ির সামনে বাঁশের খুঁটিতে একটা সাইনবোর্ড ঝুলছিল। পথচারীদের দৃষ্টি যাতে সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে, সেজন্যে সবুজ রঙের উপর লাল রঙে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিলঃ ডাক্তার ফতেউল্লাহ, গ্রাম্য ডাক্তার। এখানে সর্বরোগের চিকিৎসা সুলভ মূল্যে করা হয়।
সাইনবোর্ড দেখে ডাক্তারের চেম্বার খুঁজে পেতে হয়রান হতে হলো না তাদের। ডাক্তার তখন চেম্বারেই ছিলেন। মঙ্গোলিয়ানদের মতো গায়ের রং এবং তার নাকও চ্যাপ্টা। চুন, জর্দা ও সুপারি দিয়ে ঘনঘন পান খেতে পছন্দ করেন; ফলে তার ঠোঁট টকটকে লাল। তার চোখ দুটোও অদ্ভুত; ইচ্ছে করলে মাছির মতো ঘোরাতে পারেন। উইন্ডসর চেয়ারে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে পর্ন ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। তাদের দেখে তিনি ম্যাগাজিনটা টেবিলের নিচে রাখলেন; তারপর তাদেরকে বসতে বলে দেরাজ থেকে সাজানো পানের খিলি বের করে মুখে পুরলেন। পান চিবোতে চিবোতে সব শুনে বলে উঠলেন, 'আপনারা ঠিক জায়গায় এসেছেন; তবে সময়মতো এসেছেন কিনা পরে বলতে পারব।'
‘এখানে তেমন রুগি দেখছি না,’ গোবিন্দ তার জুলপি চুলকাতে চুলকাতে বললো।
নিজেকে জাহির করার কৌশল তার চমৎকার। গড়গড় করে বললেন, ’আমি একজন গ্রাম্য ডাক্তার; তবে সফল। আমার সাফল্য কানায় কানায়। এ পর্যন্ত বিভিন্নরোগের অনেক রুগি আমার সঠিক চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতে গিয়ে যারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন; তারাও আমার চিকিৎসা নিয়েছেন এবং অনেকেই এখনো নিচ্ছেন। বেশিরভাগ রুগিই আপনাদের মতো সমস্যা নিয়ে হাজির হন।’তারপর দেয়ালে টাঙ্গানো ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘আজ শনিবার। জ্যোতিষ শাস্ত্রের দিক থেকে এই দিনটি শনির প্রভাবে প্রভাবিত। এই দিনটাতে রুগি কম আসে।’
‘আপনি কি রাশিফল বিশ্বাস করেন? ’ গোবিন্দ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘যদিও আমি মুসলিম তবুও বিশ্বাস করি, ’ ডাক্তার উত্তর দিলেন।
'শনিবার দিনটা কুফা, জানলে আসতাম না, ’ গোবিন্দ বলল।
‘না না এসে ভালোই করেছেন। রুগি কম। চিকিৎসায় মনোযোগ দিয়ে করতে পারব,’ বললেন তিনি। মধুবালার চামড়া কালো কিন্তু দেখতে আকর্ষণীয়। তার পুরুষ্টু গোলগাল চেহারা লম্পট ডাক্তারের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। হয়ত তার মাথা ঘুরিয়েই গেছে। বললেন,’ ‘আমি সচরাচর রুগির গেস্ট এলাউ করি না।' এবার গোবিন্দের দিকে তাকিয়ে, 'যেহেতু এসেই পড়েছেন বারান্দায় একটা কাঠের বেঞ্চ আছে, সেখানে গিয়ে বসুন।’
তার কথায় গোবিন্দের মন খারাপ হয়ে গেল।
মধুবালা সন্তান লাভের জন্য মরিয়া; ডাক্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও স্বামীকে বাইরে যেতে বলল। সে একজন সহজ-সরল এবং আড়ষ্ট প্রকৃতির মানুষ; কূট-কৌশল তার মজ্জায় নেই। ডাক্তারের কথাটা শিষ্টাচার বহির্ভূত জেনেও আপত্তি না করে বাইরে গিয়ে বেঞ্চে চুপচাপ বসল সে।
‘আমার একটা সন্তান চাই, ডাক্তারবাবু! ’ মধুবালা করজোড়ে মিনতি করল।
‘চিন্তা করবেন না! খুব শিগগিরই আপনি সন্তানের মা হবেন,’ ডাক্তার আশ্বস্ত করলেন। ‘আমার নাম ফতেউল্লাহ। সকল রোগের চিকিৎসা করি। তবে ডাক্তারের সামনে কোনো কিছু গোপন করা যাবে না।’
‘বলুন, কী জানতে চান আপনি? ’
‘আপনাদের দুজনের মধ্যে কার শরীরে তাগদ কম? '
‘আমার স্বামীর। তার হরমোনের সমস্যা। ’ লজ্জায় রক্তিম হলো মধুবালা।
‘ভাববেন না। খান, পান করেন এবং ফূর্তি করেন, ‘ডাক্তার বললেন। তাকে সহজ করার জন্যে, তিনি তাকে একটি চকলেট অফার করলেন,’ ধরেন। এটি থাইল্যান্ডে তৈরি... মিল্ক চকলেট... ভারি নরম এবং সুস্বাদু। এর কোম্পানির নাম কী, ঠিক জানি না। জিনজিরার তৈরিও হতে পারে।’
‘চকলেট পছন্দ করি না।’
‘দুঃখিত!'
‘আমাকে কী করতে হবে, তাই বলুন? ’
‘কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি, ’ রোগীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যে কোনো দোকান থেকে এগুলো কিনতে পারেন। এক পক্ষ ব্যবহার করে তারপর আমার সাথে দেখা করবেন। প্রকৃত চিকিৎসা তখন শুরু করব। এই পনের দিন ট্রায়াল কেস।’
দেরাজ থেকে পান বের করে মুখে পুরলেন, ‘আপনি একজন ভাগ্যবান মহিলা। ঠিক সময়ে ঠিক ডাক্তারের কাছে এসেছেন। আপনি একজন ফুটফুটে সস্তানের মা হবেন। এই সন্তান ঘ্যানরঘ্যানর করবে, হাসবে, লাফাবে এবং আপনার সাথে খেলবে।’ কথাগুলো বলে মধুবালাকে মা হওয়ার স্বপ্নে বিভোর করলেন। পরক্ষণে তার সতর্ক উচ্চারণ, ’তবে মনে রাখবেন, যখন আসবেন, একা আসবেন।’
মধুবালা বাইরে এলে ডাক্তারের সঙ্গে কী আলাপ হয়েছে তা জানতে চাইল গোবিন্দ। তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল সে। বলল, ’তেমন কিছু না। চলো বাসায় যাই। পরে শুনবে।’
‘কোনো ওষুধ? ’ জিজ্ঞেস করল গোবিন্দ।
তাকে প্রেসক্রিপশন দেখাল। গোবিন্দ মুখ কালো করল; কারণ, সে পড়তে পারে না।
ওষুধগুলো ছিল যৌন উদ্দীপক। ওই ওষুধ সেবনের পর মধুবালা শারীরিক ও মাননিকভাবে বদলে যেতে লাগল। তার যৌনক্ষুধা রাক্ষুসীর পর্যায়ে পোঁছল। তার ঠোঁটে মিষ্টি হাসির আড়ালে কামোদ্দীপনার লুকোচুরি। ঠিক পনের দিন পরে, মধুবালা তার স্বামীকে না জানিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে হাজির হলো।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল বসন্তের; নুইয়ে পড়া দুপুর ছিল শান্ত ও রোদ্রকরোজ্জ্বল।
‘জানি, পনের দিন পর আপনাকে আসতেই হবে, ’ ডাক্তার বললেন।
‘আমি মা হতে পারব তো? ’ মধুবালা সংশয়ের চোখে তাকাল।
টেবিলে ছিল punch bowl । খুশিতে গুনগুন করতে করতে এর সাথে ভায়াগ্রা মিশিয়ে গ্লাসে ঢাললেন। মধুবালার হাতে গ্লাস তুলে দিয়ে লঘুচিত্তে বললেন, ‘একগ্লাসই যথেষ্ট। আপনি মা হবেন, খুশি না?’
ভায়াগ্রা কী জিনিস তাও জানত না সে। ওষুধ ভেবে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর নেশার চোখে বলল, 'এই বুকটা কেবল খাঁ খাঁ করে ডাক্তার সাব। কেউ যেন বলতে না পারে আমি বাঁজা।’
‘ভয় ত্যাগ করতে হবে। তবেই কেউ বলতে পারবে না আপনি বাঁজা,’ ডাক্তার সাহস জোগালেন।
‘সন্তানের জন্যে যা বলবেন তাই করব! যদি শুতে বলেন শোব বসতে বলেন বসব। ’ মধুবালা ভয়ঙ্কর ক্রেজি।
ডাক্তার হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘বয়স আমার ষাটের কাছাকাছি। আমার বয়সী যারা তারা লম্বা দাড়ি রেখে নামাজ পড়েন আর কবরের মাটি দেখেন। আমার ডায়াবেটিস আছে, প্রেসার আছে, হার্টে তিনটে রিং পরানো, প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের অপারেশনও করিয়েছি। তারা মনে করেন আমি বাতিল হয়ে গেছি। তাই তারা নামাজ পড়তে বলেন। টিটকারিও মারেন---ষোড়শীরা সামনে ন্যাংটা হয়ে দাঁড়ালেও আমারটা নাকি ---হে হে হে! কিন্তু আমি ভিন্ন ধাতুর। নারীদেহ প্রচণ্ড ফিল করি।’
মধুবালার শরীরে হঠাৎ কামনার ঝড় উঠল। ডাক্তারকে তার মনে হলো কামরূপ কন্দর্প। কামগন্ধ বিহঙ্গ শিস ফুটালো তার রক্তে। দলিত-মথিত হওয়ার উদগ্র বাসনা তাড়িত করল তাকে। তার দুউরুর মাঝখানে যে রক্তিম গিরিখাত সেখানে উষ্ণ প্রসবণের স্রোতধারা । সে নিজে থেকেই আলিঙ্গন করল ডাক্তারকে।
এরকম সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন ডাক্তার। তাকে কোলে তুলে নিলেন; শুইয়ে দিলেন বিছানায়। তারপর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
প্রায় দশ মাস দশ দিন পর মধুবালা একটি ফুটফুটে ছেলের জন্ম দিল। গোবিন্দ ছাড়া সকলেই খুশি। তার অবিশ্বাসের আঙুল ডাক্তারের দিকে; যিনি ছিলেন উজ্জ্বল ফর্সা চামড়ার। কিন্তু সে নিজে নিগারের মতো কালো এবং তার স্ত্রীও। তাদের ছেলে ফর্সা চামড়ার হতে পারে না। তাদের মতো কুচকুচে কালো কিংবা একটু উজ্জ্বল হবে, এটাই স্বাভাবিক। মায়ের কাছে ছেলে সবসময়ই ছেলে। সে সাদা হোক, কালো বা বাদামি হোক, প্রতিবন্ধী হোক! সে বৈষম্য করে না এবং কখনই তার ছেলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় না।
মাতৃত্বের সম্মানে, গোবিন্দ তার স্ত্রীকে কষ্ট দিতে চায়নি। সে-কারণে সে একেবারে নীরব এবং এ বিষয়ে সন্দেহমূলক একটি শব্দও তার মুখ ফসকে বেরোয়নি। ছেলেকে কোলে-কাঁখে নিয়ে সেও ঘুরত এবং বাবার স্নেহ থেকে তাকে এতটুকু বঞ্চিতও করেনি।
ছেলের বয়স পাঁচ বছর পার হলে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। কিন্তু প্রথম থেকেই সে ডাব্বা মার্কা ছাত্র হিসেবে পরিচিত হতে থাকল। যখন বারো বছর, তখন সে তার স্কুলকে গুডবাই জানিয়ে দিল এবং বিভিন্ন ধরণের সামাজিক অপরাধের সাথে জড়াতে থাকল নিজেকে।
গোবিন্দ ছিল দুধওয়ালা। প্রতিদিন সে দুধের ভাণ্ড নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে দুধ সরবরাহ করত। অপরাধের জগৎ থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে একদিন তাকে ডেকে সুন্দরভাবে বলল, ‘আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। আগের মতো দম নিতে পারি না। এখন থেকে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত হও।’
‘আমার বয়স মাত্র বারো, ’ ছেলে উত্তর দিল।
’কিন্তু উপায় কী? না খেয়ে মরতে চাও?’ বাবা বলল।
অবশেষে মা তাকে রাজি করালো।
প্রথম দিন বাবার সাথে গিয়ে বাড়িগুলো চিনে নিল সে; তারপর থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঝঞ্ঝাট ছাড়াই দুধ সরবরাহ করতে লাগল। সৌদি প্রবাসী এক ভদ্রলোকের বাড়িতে দুধ দিতে গিয়ে হঠাৎ তার মেয়ের সাথে দেখা। প্রতিদিনের মতো বুয়া দুধ নিতে এল না। তখন সে বাড়িতে ছিল না। ডোরবেল চাপলে বাড়িওয়ালার উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরী মেয়ে নিজেই নেমে এল। তার ধারণা ছিল তাদের অতি পরিচিত মুখ তাদের কাকা দুধ দিতে এসেছে। তার ছেলেকে দেখে বেশ অবাক হলো সে।
প্রথম দর্শনেই সুন্দর গড়নের ছেলেটি তার মন কেড়ে নিল। দুধ নিয়ে দরজা বন্ধ করতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ জিজ্ঞেস করল সে, ’এই ছেলে তোমার নাম কী? ’
‘মেঘ, ’ ছেলেটি উত্তর দিল।
‘সুন্দর নাম তো! ’ মুচকি হাসি দিয়ে দরজা বন্ধ করল সে।
পরের দিন মেঘ দুধ দিতে গেলে বুয়ার পরিবর্তে মেয়েটি এসে দরজা খুলে দাঁড়াল। লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘বুয়া গ্রামের বাড়িতে গেছে। তাই ---’
‘তাতে কী! মাস শেষে আমাদের হিসাবের টাকা পেলেই চলবে, ’ মেঘ তার দুধের পাত্রে দুধ ঢালতে ঢালতে বলল।
দুধ ঢেলে মেঘ তার ভাণ্ড মাথায় তুলে ফিরে যাচ্ছিল, মেয়েটি পেছন থেকে ডাকল, ‘এই শোনো।’ মেঘ কর্ণপাত না করলে সে অপমান বোধ করল। পায়ের কাছে খোলামকুচি পড়ে ছিল, তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল তার দিকে। মেঘ ঘুরে দাঁড়ালে বলল সে, ’আমার নাম শুনবে না?’
’নাম শুনে কাম কী? ’এই কথাটা বলেই মেঘ সেখান থেকে চলে গেল।
মেয়েটির মনের মধ্যে কী চক্কর চলছিল সে-ই জানে! পরের দিন যে-সময়টায় মেঘ দুধ দিতে আসে তার আগে থেকেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল সে। মেঘ যখন দুধ দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল, পেছন থেকে বলল সে, ’নাম শুনবে না? আমার নাম ফাতিমা।’
কয়েক মাস পর চন্দ্রকলার অদৃশ্যকালে মেঘকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় গেল ছেলেটি? বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার বলিরেখা। কে তাকে গায়েব করল? পুলিশের দ্বারস্থ হলো তারা; কিন্তু পুলিশ কোনো clue পাচ্ছিল না। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানা ঘেরাও করে আল্টিমেটাম দিল। অবশেষে টনক নড়ল দারোগা বাবুর।
তিনি শরীরের মেদ ঝরাতে টেনিস খেলছিলেন; সেখানেই তার মাথায় আইডিয়া এল। আচ্ছা, বাবা-মা কালো এবং উন্নত নাসিকার হওয়া সত্তে¡ও ছেলে কেন মঙ্গোলিয়ানদের মতো? জিনতত্ত্ব বিষয়টাকে সায় দেয় না। এই কারণটাই আগে উদঘাটন করা আবশ্যক বলে মনে করলেন তিনি।
পোশাক পাল্টিয়ে গোবিন্দের বাড়িতে গেলেন তাদের সঙ্গে কথা বলতে। তাকে দেখে মধুবালা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ’আমার ছেলের খোঁজ পেয়েছেন, দারোগা বাবু? ’
’এখনো পাইনি, হয়ত পাব, ’ বললেন তিনি, ’তার আগে কিছু শোনার আছে। গোবিন্দ বাড়িতে আছেন? ’
‘না, নেই। ’
’কোথায় গেছেন? ’
’জানি না। ছেলের ব্যাপারে তার মাথাব্যথা কম।’
’কম কেন? উনি ছেলের বাবা না? ’
দারিদ্রের ছাপ সর্বত্র। ঘরের মধ্যে একটিমাত্র হাতলবিহীন চেয়ার। সেখানেই পায়ের উপর পা তুলে বসলেন তিনি। হাঁটুতে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে মধুবালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। সব দোষ স্বামীর কাঁধে চাপাতে মধুবালা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না। তার নিরেট সন্দেহ তার গোবেচারি স্বামীই তার ছেলেকে খুন করে তার মরদেহ কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। সন্দেহের কারণ দারোগা বাবুকে ব্যাখ্যা করল সে।
স্ত্রী যখন বাদি, তখন বিবাদির যুক্তিতর্ক ধোপে টেকে না। বেচারি গোবিন্দকে কারাগারে যেতে হলো।
কারাগারে পাঠানোর পর ঘটনাক্রমে মেঘের মরদেহ ম্যানহোলে পাওয়া গেল এবং তার মরদেহ পোস্টমর্টেমের জন্যে মর্গে পাঠানো হলো। ভিসেরাল রিপোর্টে দেখা গেল বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। তদন্ত ও ভিসেরাল রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ গোবিন্দের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করে আদালতে হস্তান্তর করে।
সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে এবং অনেক চুলচেরা বিশ্লেষণের পরে, আদালত এই রায় ঘোষণা করে: আপনি, গোবিন্দ একমাত্র সন্দেহভাজন। যেহেতু এই মামলার বাদী আপনার স্ত্রী, এবং নিঃসন্দেহে এটি প্রমাণিত যে আপনি আপনার ছেলেকে হত্যা করেছেন। তাই আদালত আপনাকে দোষী সাব্যস্ত করছে। আপনি, গোবিন্দ সবসময় বিশ্বাস করতেন যে আপনার ছেলে আপনার ঔরসজাত নয়। স্বামী-স্ত্রী কালো; তাই তাদের ছেলে ফর্সা হতে পারে না। প্রথম থেকেই আপনি আপনার ছেলের বিরুদ্ধে ঘৃণা পোষণ করতেন এবং তার ফর্সা ত্বক আপনার ঘুমহীন রাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্রমশ আপনার চিত্তবৈকল্য ঘটে এবং আপনি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ওঠেন। আপনার স্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে, আপনি প্রায় সন্দেহ করতেন যে আপনার ছেলের বাবা অন্য কেউ। মাঝে মাঝে এই নিয়ে স্ত্রীর সাথে বিবাদে জড়াতেন।
আমার নির্মোহ পর্যবেক্ষণ, কালো এবং সাদা ঈশ্বরের উপহার; তার উপর কারো হাত নেই। কালো এবং সাদা হয়ে জন্মগ্রহণ করার তাৎপর্য একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। হেট ক্রাইম এমনই একটি অপরাধ, যেটা পক্ষপাতিত্ব থেকে জন্মায়; এর লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হলে সামাজিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে। বিদ্বেষ থেকে যে ঘৃণা তা বিষধর সাপের মতো ভয়ঙ্কর। সমাজ ও মানবজাতিকে রক্ষা করতে এবং স্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে, আপনাকে ফাঁসি দেওয়া উচিত। কিন্তু একদিকে আপনি বাবা, অন্যদিকে খুনিও। দুটোর মধ্যে ‘বাবা’ অধিকতর মাধুর্যসম্পন্ন। সব বিবেচনায় ফাঁসির পরিবর্তে আপনাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। [সংক্ষিপ্ত]
রায় শুনে গোবিন্দ নির্বিকার। পুলিশ সদস্যরা তাকে প্রিজনভ্যানে তোলার জন্যে আদালতের বাইরে নিয়ে যাচ্ছিল; করিডোরে তার স্ত্রীর সাথে মুখোমুখি দেখা। ‘আমিই আমার ছেলেকে খুন করেছি, তুমি ঠিকই বলেছ।’ তার চোখে-মুখে নিষ্পাপ হাসি। এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে চরম সত্যটা।
মধুবালা হয়ত সেই আভাসই পাচ্ছিল। দারোগা বাবুর সাথে দেখা করে কাঁদতে কাঁদতে বলল সে, ‘আমার স্বামী খুনি নয়। আমি তাকে খুন করতে দেখিনি।'
‘তাহলে কে খুন করেছে?’ দারোগা বাবু তার টুপি খুললেন।
'আমি জানি না,' পুলিশকে বিভ্রান্ত করল সে।
তিন দিন পর, দারোগা বাবু, এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন। মেঘ তাকে হাতজোড় করে বলছিল, ‘বাবা আমাকে খুন করেনি। বিশ্বাস করুন, আমার বাবা আমার খুনি নয়। আমার খুনি ফাতিমার বাবা।’ ঘুম ভেঙে গেলে তড়াশ করে উঠে বসলেন তিনি। তিনি ঘামছিলেন। পানির তেষ্টাও পেল। বিছানা থেকে নেমে লাইট জ্বালিয়ে গ্লাসে পানি ঢাললেন। ঢকঢক করে পানি পান করলেন।
ভোরবেলা তিনি ফাতিমার বাবার খোঁজখবর নিলেন এবং তার সম্পর্কে জানতে পারলেন। ব্যবসার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে থাকেন তিনি। মেঘ মিসিং হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। এবার সন্দেহের তিরটা তার দিকে তীব্রবেগে ছুটে গেল। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তাকে গ্রেফতার করে অবশেষে থানায় আনা হলো।
প্রথমে তিনি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি আরও দাবি করেন এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার পরিবার মোটেই জড়িত নয়।
দারোগা বাবু তাকে ক্রমাগত জেরা করার ফলে অবশেষে থলের বেড়াল বেরিয়ে এলো।
তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেনঃ আমি মোঃ হযরত আলি স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদান করছি। ফাতিমা আমার মেয়ে। প্রথম যখন আমার স্ত্রীর কাছ থেকে খবরটি শুনি, তখন বিশ্বাস করতে পারিনি। কারণ, আমার মেয়ে পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ে, পবিত্র কোরআন পড়ে এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে। ইসলামী মূল্যবোধকে সম্মান করে। বোরকা ও হিজাব পরে । সেই মেয়ে এমন জঘন্য কাজ করতে পারে না। কয়েকবার ফোনে তাকে সতর্ক করেছি। বাচ্চা মেয়ে-- কান দেয়নি। বরং দিন দিন সে তার সম্পর্কে আরও জড়িয়ে যাচ্ছিল। আমার মিসেস শত চেষ্টা করেও ওকে থামাতে পারছিল না। দুধওয়ালার ছেলের সাথে তার সম্পর্ক মেনে নেওয়া যায় না। ভাবলাম, এই কলঙ্ক ঠেকাতে ব্যর্থ হলে পরিবারের মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে এবং আমরা আমাদের মেয়ের বিয়ে দিতে পারব না। গভীর চিন্তা-ভাবনা করে আমরা ছেলেটিকে হত্যার পবিকল্পনা করি।
ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ছেলেটিকে মোবাইলে ধরার চেষ্টা করি, কিন্তু ধরতে পারিনি। অবশেষে আমি আমার মেয়ের মাধ্যমে তাকে ডাকলাম। সে ফাঁদে পা দিল। তাকে হত্যার পরিকল্পনা আগেই করেছিলাম। খাবারের সঙ্গে বিষ মেশানো হয়। আমার মেয়ে আমাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানত না। সে নির্দোষ।
পুলিশ নতুন করে তদন্তের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করে।