শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপির কিছু বক্তব্য বা স্লোগান সবসময় এমনভাবে উচ্চারিত হয়, যা যেন প্রতিটি সাম্প্রতিক ইস্যুতেই সমানভাবে প্রযোজ্য। তার প্রতিটি রাজনৈতিক বার্তা ও স্লোগান যেমন সংক্ষিপ্ত, ঠিক তেমনি তা গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও শক্তিশালী।
তার দর্শনের অন্যতম প্রধান প্রতীক হলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। বক্তব্যের শেষে উচ্চারিত এই স্লোগানটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অন্যতম প্রধান স্লোগানে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।
একই সঙ্গে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ স্লোগানটি বিএনপির দলীয় স্লোগান হলেও তা দেশের নানান মতের ও বয়সের মানুষের মধ্যে এক ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে দলের নেতাকর্মীরা দেশের ও দলের প্রতি তাদের চরম অঙ্গীকার প্রকাশ করেন।
আর তার নীতি ও নেতৃত্বের প্রতি অকুণ্ঠ চিত্তে গভীর মমত্ববোধ ও সম্মান জানিয়ে বিএনপি এবং তার সমর্থকরা ব্যবহার করেন ‘শহীদ জিয়া অমর হোক’ স্লোগানটি।
শহীদ জিয়ার উন্নয়নমুখী কর্মসূচির সবচেয়ে বড় প্রতীকী স্লোগান ছিল ‘খাল কাটুন-ফসল ফলান’।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোর শার্শা উপজেলার উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত খাল খনন কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে তিনি এই স্লোগান দিয়েছিলেন, যা আজও দেশের অর্থনীতিতে অনিবার্য হয়ে আছে। ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে তিনি যে কৃষি বিপ্লব ও গণ-খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন, এটি ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ।
এই কর্মসূচির প্রায় ৫০ বছর পর, তার রক্তের ও নীতির উত্তরাধিকার, বিএনপি চেয়ারম্যান এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খননের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
শহীদ জিয়ার বৈশ্বিক ভাবনাও ছিল স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। বিশ্বের কাছে কেবল হাত পাতার নীতি পরিবর্তন করে তিনি জোরালোভাবে বলতেন, ‘সহায়তা নয়-চাই বাণিজ্য’। জনগণের ওপর তার ছিল প্রচণ্ড আস্থা। আর সেই আস্থা থেকেই তিনি উচ্চারণ করতেন, ‘জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়-তা হলে আমি সেই দলেই আছি’।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রতি তার ছিল পরিকল্পিত ভাবনা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী ও প্রবীণ পর্যন্ত সকল নাগরিককে নিয়ে তিনি যেমন পরিকল্পনা করেছিলেন, তেমনি তার বাস্তবায়নও শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী যখন পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত নিরীহ মানুষের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালায়, সেই খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ করেন। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণায় স্পষ্ট উল্লেখ ছিল— ‘নতুন রাষ্ট্রের মূলনীতিগুলো হবে প্রথমত: নিরপেক্ষতা, দ্বিতীয়ত: শান্তি, তৃতীয়ত: সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও প্রতি শত্রুতা নয়। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’
জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি তার অঙ্গীকার প্রতিফলিত হতো তার জোরালো পররাষ্ট্রনীতিতে, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন— ‘বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে-কিন্তু কোনো প্রভু নাই।’ গভীর দেশপ্রেম ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর থেকে তিনি সবসময় উচ্চারণ করতেন, ‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি অনেক ত্যাগে- অনেক রক্ত দিয়ে, কিন্তু স্বাধীনতা শুধু পতাকা বা মানচিত্রের বিষয় নয়।’
তার রাজনৈতিক দর্শনের এক বড় ভিত্তি ছিল মহান স্রষ্টার প্রতি সমর্পণ। তিনি যেভাবে ‘আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ রেখেছিলেন, তা পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধান মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয়েছে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। এই জাতীয়তাবাদের মূল কথাই হলো— বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের সমন্বিত পরিচয় হলো 'বাংলাদেশী'।
এখানে ধর্ম, ভাষা ও জাতিসত্তার পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক ভূখণ্ডকে সবচেয়ে বড় করে দেখা হয়েছে।
শহীদ জিয়ার এই সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী কথাগুলোই আজ যেন আমাদের পথ চলার প্রেরণার উৎস।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।