জীবিতদের থেকে মৃতদের প্রাপ্য অধিকার

মৃত ব্যক্তির পরিবারের চার দায়িত্ব কাফন-দাফনের ব্যবস্থা: মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীরা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। পুরুষ হলে তিনটি কাপড়—ইজার-লেফাফা-কুরতা। মহিলা হলে পাঁচটি। পুরুষের তিনটির সঙ্গে আরও দুটি কাপড় সেরবন্দ ও সিনাবন্দের ব্যবস্থা করবে। কবর খনন করবে। নিজে না পারলে যারা খবর খুঁড়তে পারদর্শী, তাদের মাধ্যমে কবর খনন করাবে। জানাজার ব্যবস্থা করাবে। হাদিসে আছে, আর যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরাবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে জান্নাতের সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের বস্ত্র পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি তার জন্য কবর খুঁড়ে তাকে দাফন করবে, আল্লাহ তার জন্য এমন এক গৃহের সওয়াব জারি করে দেবেন, যা সে কেয়ামত পর্যন্ত বাস করার জন্য দান করে থাকে। (রিয়াদুস সালেহিন : ১২৯২) ঋণ পরিশোধ: ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ মানুষের হক। যতক্ষণ মানুষ মাফ করবে না, ততক্ষণ আল্লাহও মাফ করবেন না। মৃত ব্যক্তির নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। হাদিসে আছে, যার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তার কসম। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়, আবার জীবন লাভ করে; আবার শহীদ হয় এবং আবার জীবিত হয়, পরে আবার শহীদ হয়, আ

জীবিতদের থেকে মৃতদের প্রাপ্য অধিকার

মৃত ব্যক্তির পরিবারের চার দায়িত্ব

কাফন-দাফনের ব্যবস্থা: মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীরা মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। পুরুষ হলে তিনটি কাপড়—ইজার-লেফাফা-কুরতা। মহিলা হলে পাঁচটি। পুরুষের তিনটির সঙ্গে আরও দুটি কাপড় সেরবন্দ ও সিনাবন্দের ব্যবস্থা করবে। কবর খনন করবে। নিজে না পারলে যারা খবর খুঁড়তে পারদর্শী, তাদের মাধ্যমে কবর খনন করাবে। জানাজার ব্যবস্থা করাবে। হাদিসে আছে, আর যে ব্যক্তি মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরাবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে জান্নাতের সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের বস্ত্র পরিধান করাবেন। যে ব্যক্তি তার জন্য কবর খুঁড়ে তাকে দাফন করবে, আল্লাহ তার জন্য এমন এক গৃহের সওয়াব জারি করে দেবেন, যা সে কেয়ামত পর্যন্ত বাস করার জন্য দান করে থাকে। (রিয়াদুস সালেহিন : ১২৯২)

ঋণ পরিশোধ: ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ মানুষের হক। যতক্ষণ মানুষ মাফ করবে না, ততক্ষণ আল্লাহও মাফ করবেন না। মৃত ব্যক্তির নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। হাদিসে আছে, যার নিয়ন্ত্রণে আমার প্রাণ তার কসম। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়, আবার জীবন লাভ করে; আবার শহীদ হয় এবং আবার জীবিত হয়, পরে আবার শহীদ হয়, আর তার ওপর ঋণ থাকে, তবে তার পক্ষ থেকে সে ঋণ আদায় না হওয়া পর্যন্ত সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (নাসায়ি : ৪৬৮৪)। ধরুন, মৃত ব্যক্তিটি আপনার বাবা। আপনার বাবা আপনাকে কত কষ্টে লালন-পালন করেছিলেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অন্যের কাজ করে আপনাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। আপনাকে সমাজে মর্যাদাশালী গড়ে তুলেছেন। আজ তিনি শায়িত। তার নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। আপনি একজন সন্তান হয়ে কি চান না আপনার বাবা জান্নাতে যাক? যদি চান তা হলে সবার আগে আপনার বাবার ঋণ পরিশোধ করুন। কেননা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত মৃত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

অসিয়ত বাস্তবায়ন করা: মৃত ব্যক্তির বৈধ অসিয়ত পূরণ করা। যেমন কেউ অসিয়ত করল, আমি মারা যাওয়ার পর আমার এই টাকাগুলো দিয়ে একটা মাদ্রাসা করে দেবে। অথবা কেউ বলল, এ টাকাগুলো দিয়ে ১০ জন মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের খাবার খাওয়াবে, তা হলে তার সম্পদের তিন ভাগের একভাগ দিয়ে তার অসিয়ত পূরণ করতে হবে। তবে যদি কেউ অবৈধপথে টাকা খরচের অসিয়ত করে যায়, যেমন কেউ বলল, আমার মৃত্যুর পর এই টাকা দিয়ে অমুক জায়গায় গানের আসর হবে বা অন্য কোনো হারাম কাজ হবে, তা হলে তা পূরণ করা জরুরি নয়; বরং তা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

মিরাস বণ্টন করা: এ তিনটি কাজ করার পর যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে তা ওয়ারিশের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন করে দিতে হবে। বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শে যার যতটুকু প্রাপ্য ভাগ করে নেওয়া চাই। পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা মনে করি মানুষ মরে যাওয়ার পর চার দিন, চল্লিশা ও বছর শেষে একটা মেজবান দিলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ। অথচ এসব কিছু কুসংস্কার বৈ কিছু নয়।

মৃত্যুতে সাধারণ মানুষের কর্তব্য

মৃতের প্রতি সদাচরণ: মুমিন ব্যক্তির লাশ সামনে রেখে অযথা কথাবার্তা বলা ও গল্প করা নিষেধ। বরং দাফন করার আগ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির মাগফেরাতের জন্য দোয়া করা এবং কোরআন তেলাওয়াত করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা কোনো রোগীর কাছে অথবা মৃত ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হবে, উত্তম কথা বলবে। কেননা, তোমরা যা বলো, তার ওপর ফেরেশতাগণ আমিন বলেন।’ (মুসলিম : ২১৬৮)। আরও বলেন, ‘তোমাদের মৃত ব্যক্তিদের কাছে সুরা ইয়াসিন পড়বে।’ (আবু দাউদ : ৩১২৩)

মৃতকে গোসল দানকারীর গোনাহ মাফ: মুমিন ব্যক্তি মারা গেলে তাকে গোসল দেওয়া ফরজে কেফায়া। কেউ গোসল দান করলে অন্য লোকেরা এ দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পায়। মৃতকে গোসল দেওয়া অনেক বড় সওয়াবের কাজ। যে ব্যক্তি কোনো মৃত মুসলমানকে গোসল দান করবে, আল্লাহতায়ালা তার গোনাহ ক্ষমা করবেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মৃত মুসলমানকে গোসল দেয় অতঃপর তার কোনো দোষ জেনে তা গোপন করে, আল্লাহতায়ালা তাকে চল্লিশবার ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি মৃতকে কাফন পরায় মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের মোটা ও মসৃণ রেশমের পোশাক পরাবেন।’ (তাবারানি, লাওয়াকিহুল আনওয়ার : ২৪৪)

মরদেহের সঙ্গে কবরে: মৃতকে গোসল দিয়ে এবং কাফন পরিধান করে খাটিয়ায় রেখে চারজন লোক খাটিয়া বহন করে জানাজার মাঠে নিয়ে যাবে। তবে মৃত ব্যক্তির খাটিয়া নেওয়ার সময় কিছু আদবের প্রতি লক্ষ রাখতে হয়—মুসল্লিরা খাটের পেছনে পেছনে চলা, আগে না চলা, লাশ বহনকারী খাট রাখার আগে মুসল্লিরা না বসা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা লাশ দেখবে, দাঁড়িয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি তার অনুসরণ করবে, সে যেন তা রাখার আগে না বসে।’ (বুখারি : ১৩২২; মুসলিম : ২২৬৫)

জানাজার নামাজের ফজিলত

মুমিন ব্যক্তির লাশকে জানাজার নামাজের মাধ্যমে চির বিদায় জানানো হয়। এতে মৃতের আত্মার মাগফেরাত কামনা করা হয়। জানাজায় মুসল্লিদের উপস্থিতি যত বেশি দেখা দেবে—ততটা মৃতের সুপারিশ ও মাগফেরাত কামনার সংখ্যাও বেশি হবে। এটা মৃত ব্যক্তি জান্নাত লাভের সাক্ষী বহন করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে কোনো মৃত ব্যক্তির ওপর একশ লোক জানাজার নামাজ পড়ে এবং প্রত্যেকেই যদি ওই ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করে—তবে ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালা সুপারিশ কবুল করেন।’ (মুসলিম : ২২৪১)

মুসলিম কোনো ব্যক্তি মারা গেলে ওই এলাকার অন্যান্য মুসলিম পুরুষের কর্তব্য হলো মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ আদায় করা। জানাজার নামাজ পড়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা। তার পরকালীন মুক্তি কামনা করা। অন্যের জানাজায় উপস্থিত হলে নিজের মৃত্যুর কথাও স্মরণ হয়। স্মরণ হয় পরকালের কথা। এতে করে পরবর্তী সময়ে অন্যায় ও অপরাধের মাত্রা কমে আসে। বেশি বেশি ভালো কাজ করার ইচ্ছা জাগে। তাই আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা অপরিচিতও যদি কেউ মারা যায়, সুযোগ থাকলে তার জানাজায় স্বতঃস্ফূর্ত মনে উপস্থিত হওয়া চাই।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow