জ্বালানি সংকট : বৈশ্বিক বাস্তবতা বনাম আমাদের মনস্তত্ত্ব

সম্প্রতি এক সাংবাদিক ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, জ্বালানির অপর্যাপ্ততার বিষয়টিকে সংকটের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। তিনি ঢাকা ও ঠাকুরগাঁওয়ে যাদের দেখেছেন তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বাড়িতে ৫ লিটার করে হলেও তেল মজুত রেখেছেন। সেই হিসেবে বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৫০ লাখ মোটরসাইকেল চালক যদি প্রত্যেকে গড়ে মাত্র ৫ লিটার করে তেল মজুত করে তাহলে একদিনেই প্রায় আড়াই কোটি লিটার তেল মার্কেট থেকে উধাও হয়ে যাবে। এরপর যখন লাখ লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহনের মালিকরা তাদের ট্যাঙ্কি পূর্ণ করে রাখার পাশাপাশি কন্টেইনারে তেল জমা করতে শুরু করেন, তখন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, তা সামলানো যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই দুরূহ হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা যখন ঘরের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও। এর ফলে তৈরি হয়ে এক ধরনের উদ্বেগ। আর সে উদ্বেগ কাটাতেই নাগরিকরা নানা পন্থা বেছে নেই যেমনটা আমরা বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেখতে পাচ্ছি। এখন আমরা যে জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নে

জ্বালানি সংকট : বৈশ্বিক বাস্তবতা বনাম আমাদের মনস্তত্ত্ব

সম্প্রতি এক সাংবাদিক ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, জ্বালানির অপর্যাপ্ততার বিষয়টিকে সংকটের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। তিনি ঢাকা ও ঠাকুরগাঁওয়ে যাদের দেখেছেন তাদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি বাড়িতে ৫ লিটার করে হলেও তেল মজুত রেখেছেন। সেই হিসেবে বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৫০ লাখ মোটরসাইকেল চালক যদি প্রত্যেকে গড়ে মাত্র ৫ লিটার করে তেল মজুত করে তাহলে একদিনেই প্রায় আড়াই কোটি লিটার তেল মার্কেট থেকে উধাও হয়ে যাবে। এরপর যখন লাখ লাখ ব্যক্তিগত গাড়ি এবং অন্যান্য যানবাহনের মালিকরা তাদের ট্যাঙ্কি পূর্ণ করে রাখার পাশাপাশি কন্টেইনারে তেল জমা করতে শুরু করেন, তখন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, তা সামলানো যেকোনো রাষ্ট্রের জন্যই দুরূহ হবে।

বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা যখন ঘরের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনেও। এর ফলে তৈরি হয়ে এক ধরনের উদ্বেগ। আর সে উদ্বেগ কাটাতেই নাগরিকরা নানা পন্থা বেছে নেই যেমনটা আমরা বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেখতে পাচ্ছি। এখন আমরা যে জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার এক অনিবার্য ফল। 

বাংলাদেশ যখন এই বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে ওঠার জন্য তার প্রশাসনিক ও কৌশলগত সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে, তখন অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মনস্তাত্ত্বিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা সত্ত্বেও সামাজিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক বা ‘প্যানিক’ অনেক ক্ষেত্রে সংকটের প্রকৃত রূপকে আড়াল করে দিচ্ছে।

পাম্পগুলোতে আজ যে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে, তার নির্মোহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে তেলের প্রকৃত সংকটের চেয়েও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘প্যানিক বায়িং’ বা অতিরিক্ত মজুত করার নেতিবাচক মানসিকতা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামে কর্পোরেশনের (বিপিসি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুচরা পর্যায়ে এই চাহিদার উল্লম্ফন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে গেছে। দেশে যানবাহনের সংখ্যা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হঠাৎ করে এই হারে বাড়েনি। বরং এই বাড়তি চাহিদার মূল কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংগ্রহের প্রবণতা। এছাড়া অসাধু ব্যবসায়ী চক্র তো রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে লক্ষ লক্ষ টন জ্বালানির অবৈধ মজুতের অভিযোগ ইতোমধ্যে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। গত দুই মাসে প্রায় ৫ লক্ষ টনের মতো মজুতকৃত জ্বালানি উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। বেশি দামে কালোবাজারে জ্বালানি তেল বিক্রির খবর বেরিয়েছে। ১২০ টাকার অকটেন অনলাইনে ৩০০-৪০০ টাকায় কেনাবেচারও খবর পাওয়া যাচ্ছে। 

সুতরাং জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দুই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এক, অনেকে ভয় ও আতঙ্ক থেকে নিজেদের চাহিদা মেটানোর জন্য তেল মজুত করছে, আরেক দল অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় তেল মজুত করছে। ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম চাহিদা তৈরি হচ্ছে। পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এবছর জ্বালানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। ঠিক এ কারণেই পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও যে রেশনিং পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, তা মূলত এই অনাকাঙ্ক্ষিত মজুত প্রবণতা রুখতে। 

বাংলাদেশের তেল মূলত আমদানিনির্ভর এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে এই তেল আমদানি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভারত যদি রাশিয়া থেকে সস্তায় ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল কিনতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারছে না? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের কারিগরি সীমাবদ্ধতার মধ্যে। বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় রিফাইনারি ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের হালকা মানের ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণের জন্য ডিজাইন করা। রাশিয়ার তেল তুলনামূলকভাবে বেশি ঘন বা ভারী (Heavy Crude), যা বর্তমান অবকাঠামোয় রিফাইন করা প্রায় অসম্ভব। এই কারিগরি জটিলতা নিরসনে নতুন রিফাইনারি ইউনিট স্থাপন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তবে সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই; রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতে রিফাইন করে বাংলাদেশে আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও প্রস্তাবনা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সরকার সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্ভাবনী পথে হাঁটছে।

এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমসাময়িক যে সমালোচনা হচ্ছে, সেখানেও প্রকৃত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটটি অনুধাবন করা জরুরি। বাংলাদেশ এলপিজির জন্য প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর একটি দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারিত হয় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি ‘সৌদি আরামকো’র নির্ধারিত ‘কনট্রাক্ট প্রাইস’ বা সিপি অনুযায়ী। প্রতি মাসে আরামকো সারা বিশ্বের জন্য এলপিজির কাঁচামালের দাম ঘোষণা করে। যখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক কারণে বা উৎপাদন হ্রাসের ফলে আরামকো দাম বাড়িয়ে দেয়, তখন আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে সেই দাম নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। এখানে সরকারের সরাসরি কোনো হাত নেই; কারণ বিশ্ববাজারের কেনা দামের ওপর ভিত্তি করেই স্থানীয় দাম বিইআরসি-র মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশে অকটেন, ডিজেল ও পেট্রোলের যে দাম বেড়েছে তা ২০২২ সালের আগস্টের দামের কাছাকাছি। ২০২২ সালে ডিজেলের দাম ছিল ১১৪ টাকা যা এখন ১১৫ টাকা, পেট্রোলের দাম ছিল ১৩৫ টাকা যা বর্তমানে ১৩০ টাকা এবং অকটেনের দাম ছিল ১৩৫ টাকা যা এখন ১৪০ টাকা হয়েছে। এরপরও প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের চেয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম।  

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো আজ যেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সরবরাহ চেইন বজায় রেখেছে। ইতোমধ্যে সুখবর আসতে শুরু করেছে যে, সরকারি তৎপরতায় জ্বালানি তেলের বড় বড় জাহাজ বন্দরে ভিড়তে শুরু করেছে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২০ দিনে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেল নিয়ে ১২ টি জাহাজ এসেছে। ভারত থেকে এ মাসে চারটি চালানের মাধ্যমে মোট ২৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে ২০ হাজার টন ডিজেল ভারত থেকে এসে পৌঁছেছে। সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তাছাড়া নতুন আসা জাহাজগুলোর তেল খালাস শুরু হওয়ায় দেশের জ্বালানি মজুত এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে তা দিয়ে আগামী এক থেকে দেড় মাস দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। গত কয়েকদিন ধরে তেলের ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির সরবরাহ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফুয়েল পাস প্রণয়নের মাধ্যমে বাইকারদের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতার লাগাম টানার চেষ্টা চলছে। তাছাড়া সরবরাহ চেইন বজায় থাকায় মানুষের মধ্যে মজুত করার সেই প্রবল আতঙ্ক ধীরে ধীরে কমে আসছে।  

যেকোনো সংকটে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া গুজব বা অপপ্রচার পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করে। তেলের দাম যৌক্তিকভাবে সমন্বয় না করলে বা সাময়িক রেশনিং না করলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি যে ভয়াবহ চাপে পড়ত, তা সামলানো দীর্ঘমেয়াদে কঠিন হতো। সরকার অত্যন্ত সাহসের সাথে এই অপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে কেবল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য। তাই নাগরিক হিসেবে এই সময়ে গুজবে কান না দিয়ে বাস্তবতাকে গ্রহণ করা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়া জরুরি। সর্বোপরি, যেকোনো সংকটে দলমত-নির্বিশেষে সব মানুষের একতাবদ্ধ হওয়াও জরুরি, কারণ সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি রাষ্ট্রকে কঠিন সময় পার করে আলোর দিকে নিয়ে যেতে।

লেখক

প্রধান প্রতিবেদক, বাসস।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow