জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর তাগিদ
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের সামসন এইচ চৌধুরী হলে ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। এ সেমিনারের আয়োজন করে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের পাশাপাশি পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুন জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক একক সমাধান নেই: অধ্যাপক ম. তামিম তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’ ইকবাল হাসান মাহমুদ
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং জ্বালানি অবকাঠামোর উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ী নেতারা। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের সামসন এইচ চৌধুরী হলে ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। এ সেমিনারের আয়োজন করে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, সরকার রুফটপ সোলারে আগ্রাসীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এ খাতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণের পাশাপাশি পাঁচ বছরের কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। আমি মনে করি, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।’
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ঢাকা থেকে শুরু করে সারাদেশে ক্লাস্টারভিত্তিক ও অপেক্স মডেলে রুফটপ সোলার স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে। সরকার এতে সরাসরি বিনিয়োগ করবে না; বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাই কাজ করবেন।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার কয়লা দিয়ে আরও বিদ্যুৎকেন্দ্র করার চিন্তা করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এ বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে।
ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল বিক্রি করে।
একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে— এমন অভিযোগ নাকচ করে মন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। একটি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য আমরা এটা করছি না। যাতে সবাই ব্যবসা করতে পারে, সেজন্যই একটি নীতি তৈরি করছি।’
ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকার আশাবাদী জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেছেন। এরপর আমরা অনলাইনে পেট্রোনাসের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমাদের একটি টিম সেখানে গিয়েছিল এবং গতকাল ফিরে এসেছে। আমরা খুবই আশাবাদী, পেট্রোনাসের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে ভোলার গ্যাসে কিছু করতে পারবো।’
শিল্পের গ্যাসসংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গ্যাসের চাপ না থাকলে শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও ক্যাশ ফ্লোতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। এতে ব্যাংকে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। ‘আমি চাই না, আমাদের জন্য কোনো ব্যবসায়ীর নাম ব্যাংকের লাল খাতায় উঠুক,’ বলেন তিনি।
এলএনজি সংকট নিয়ে তিনি বলেন, একটি ঘটনায় এলএনজি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হওয়ায় সারাদেশে সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্পকারখানা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। শিল্পের বর্তমান সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দরপত্র প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সেখানে বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশে অফশোর অনুসন্ধানে অংশ নেওয়ার জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানাব।’
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে শিল্পে এলপিজি ব্যবহারের প্রস্তাবের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রস্তাবটি যদি কার্যকর হয় এবং শিল্পের জন্য সহায়ক হয়, তাহলে আমরা কোনো সময় নষ্ট করব না। প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়ে দেব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে ইন্ডাস্ট্রি ফার্স্ট। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি না হলে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কোনো লাভ নেই।'
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সত্য আমরা অস্বীকার করছি না। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই যারা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, এ সমস্যার তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকারকে এগোতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো নেওয়া উদ্যোগগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা।’
বিদ্যুৎ সংকটের কারণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারলে বর্তমান সংকট হতো না। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়েও গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ প্রতি বছর দেশীয় কূপগুলোর উৎপাদন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করে কমছে।’
এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘টাকা থাকলেও রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। নতুন একটি এফএসআরইউ কার্যকর করতে ৩০ থেকে ৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তবে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো, সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দুই বছরের কম সময়ে এটি কার্যকর করা।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ নিয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়িতে ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। টার্মিনালের জন্য জমিও চিহ্নিত করা হয়েছে।’
এলপিজি বাজার প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এলপিজির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। বিইআরসি দাম নির্ধারণ করলেও ভোক্তারা সব সময় নির্ধারিত দামে এলপিজি পান না। তাই সরকার এলপিজি খাতে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। সরকার বাল্ক এলপিজি আমদানি করে বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল কাজে লাগিয়ে বাজার স্থিতিশীল করতে চায়।’
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আগামী সাড়ে চার বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ রুফটপ সোলার এবং বাকি অংশ ল্যান্ডবেজড প্রকল্প থেকে আসতে পারে।’
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দিন শেষে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতেই হবে। আমরা অফশোর বিডিং রাউন্ড চালু করেছি, যা নভেম্বরে শেষ হবে। আমরা আশাবাদী, এটি সফল হবে এবং বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। একই সঙ্গে অনশোর বিডিং রাউন্ড নিয়েও কাজ চলছে।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
তিনি বলেন, অতীতে যেসব ভুলের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, সেগুলো এখন বাস্তব সমস্যায় পরিণত হয়েছে। নতুন সরকারের সামনে আর ভুল করার সুযোগ নেই। তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় এফএসআরইউ ও এলএনজি আমদানি করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাধান নয়। কারণ জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ডলার সংকটও বড় সমস্যা। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে জ্বালানি সংকট সমাধান কঠিন হবে।
তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ক্রমেই কমছে। তাই দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান বাড়িয়ে উৎপাদন অন্তত ২ হাজার এমএমসিএফডির কাছাকাছি ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ধীরে ধীরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ ও সাশ্রয়ী গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ বাড়াতে হবে।
অধ্যাপক ইজাজ বলেন, ২০৩০ সালে দেশে গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি হতে পারে। এ চাহিদা পূরণে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ প্রয়োজন হবে। তবে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করাই বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
প্যানেল আলোচনায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক কোনো একক সমাধান নেই। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। তাই গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি আমদানি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং দ্রুত ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বাপেক্স-নির্ভর গ্যাস অনুসন্ধান নীতি পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে কাজে লাগাতে হবে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের সম্ভাবনাময় স্তরগুলো উন্নত প্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ছাতক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে ‘বিপ্লবী পরিবর্তন’ আনতে হবে। তা না হলে ব্যর্থতার দায় বর্তমান সরকারকেও নিতে হবে।
তিনি বলেন, এ খাতের অন্যতম বড় সমস্যা যৌক্তিক প্রাইসিং না করা। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে না পেরে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আমদানি করা জ্বালানির দাম দেশীয় উৎপাদনের চেয়েও কম পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেঞ্চমার্ক মূল্য ও বিনিয়োগের শর্ত স্পষ্ট করা জরুরি।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, জ্বালানি চাহিদা পূরণে কোনো একটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তেল-গ্যাস ও এলএনজিসহ সব ধরনের উৎসকে কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, জরুরি চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাতারবাড়ীতে বড় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে মাতারবাড়িকে আঞ্চলিক এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
জ্বালানি খাতে নতুন নীতি প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে আজম জে চৌধুরী বলেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও একতরফা সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতকে নিরুৎসাহিত করে। জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখলে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সব উৎসের সমন্বয়ে প্রতিযোগিতামূলক গড় জ্বালানি ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাপেক্সকে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধানে যুক্ত করে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়েই প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। এতে শিল্পকারখানা সচল রাখা এবং বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এ সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে তৃতীয় এফএসআরইউ বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ল্যান্ডবেজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ জরুরি।
তিনি বলেন, দেশে প্রমাণিত গ্যাসের মজুত সীমিত। তাই শিল্প ও বিনিয়োগের স্বার্থে দেশীয় কয়লার মজুত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এফইআরবির চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন এফইআরবির নির্বাহী পরিচালক সেরাজুল ইসলাম সিরাজ। সঞ্চালনায় ছিলেন ইকবাল আহসান ও শাকিলা জেরিন। এসময় সেমিনারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এনএস/এমএএইচ/
What's Your Reaction?
