ঝরে পড়াদের নিয়ে ভাবতে হবে

আমার এক সিনিয়র বন্ধু একটি কলেজের অধ্যক্ষ। পেশাগত জীবনে বেশ সফল। নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে খুবই কঠোর মনের মানুষ তিনি। তাঁর সাবেক কর্মস্থল কলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তির শর্ত আরোপ করেছিলেন—কোনো বিবাহিত ছাত্র-ছাত্রী তাঁর প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। শুধু তা-ই নয়, কলেজে পড়ার সময় কারও বিয়ে হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হবে। তারপরও ছাত্রীদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যখন তাঁর নজরে আসে, তখন তিনি শর্তসাপেক্ষে বেশ কয়েকটি বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সুফলও পেয়েছিলেন। তবে শুধু বিয়ে বন্ধ করেই তিনি শিক্ষার্থীদের ধরে রেখেছিলেন, এমনটি বলাও ঠিক হবে না। কলেজের পরিবেশকে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী করে তুলেছিলেন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার মতো কাজও করেছিলেন। সবকিছুই করেছিলেন শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের আশায় এবং ঝরে পড়া বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। তাঁর কলেজে ঝরে পড়ার হার ছিল শূন্য। অন্যদিকে, নিয়মশৃঙ্খলা ও শিক্ষাদানে আন্তরিকতার কারণে কলেজটি প্রতিষ্ঠার তিন-চার বছরের মধ্যেই কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ছয়টি কলেজের মধ্যে স্থান করে নেয়। পরবর্তীকালে তা তৃতীয় থেকে পঞ্চম স্থানের

ঝরে পড়াদের নিয়ে ভাবতে হবে

আমার এক সিনিয়র বন্ধু একটি কলেজের অধ্যক্ষ। পেশাগত জীবনে বেশ সফল। নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে খুবই কঠোর মনের মানুষ তিনি। তাঁর সাবেক কর্মস্থল কলেজে শিক্ষার্থীদের ভর্তির শর্ত আরোপ করেছিলেন—কোনো বিবাহিত ছাত্র-ছাত্রী তাঁর প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাবে না। শুধু তা-ই নয়, কলেজে পড়ার সময় কারও বিয়ে হলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হবে। তারপরও ছাত্রীদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যখন তাঁর নজরে আসে, তখন তিনি শর্তসাপেক্ষে বেশ কয়েকটি বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সুফলও পেয়েছিলেন। তবে শুধু বিয়ে বন্ধ করেই তিনি শিক্ষার্থীদের ধরে রেখেছিলেন, এমনটি বলাও ঠিক হবে না। কলেজের পরিবেশকে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী করে তুলেছিলেন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার মতো কাজও করেছিলেন। সবকিছুই করেছিলেন শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের আশায় এবং ঝরে পড়া বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। তাঁর কলেজে ঝরে পড়ার হার ছিল শূন্য। অন্যদিকে, নিয়মশৃঙ্খলা ও শিক্ষাদানে আন্তরিকতার কারণে কলেজটি প্রতিষ্ঠার তিন-চার বছরের মধ্যেই কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সেরা ছয়টি কলেজের মধ্যে স্থান করে নেয়। পরবর্তীকালে তা তৃতীয় থেকে পঞ্চম স্থানের মধ্যেও অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছিল।

বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত ৪,০০৭টি কলেজের মধ্যে এটি একটি মাত্র। হয়তো এমন আরও হাতে গোনা কিছু কলেজ থাকতে পারে। বাকি অধিকাংশ কলেজেই শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক। যার চিত্র বেরিয়ে এসেছে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করার তথ্য থেকে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। তাদের সবাই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে—এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তারপরও বিভিন্ন দৈবদুর্বিপাকের কারণে হয়তো ২ থেকে ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়াটা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন ৩৬ শতাংশে পৌঁছে যায়, তখন তা অবশ্যই উদ্বেগের কারণ। শুধু পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকাই নয়, পরীক্ষার প্রথম দিন অংশ নিয়েও অনেকে দ্বিতীয় বিষয়ে আর আসেনি। এবারের গণমাধ্যম সেই উদ্বেগজনক তথ্যই দিচ্ছে।

এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার কারণ কী? শুরুর দিকেই কি বিষয়টি বোঝা যায়নি? গত দুই বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারের নজরদারি কিংবা পর্যবেক্ষণ কি অনুপস্থিত ছিল? সবচেয়ে বড় কথা, এত বড় ঘটনা চুপিসারে ঘটে গেছে—এমনও নয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার আঁচ কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়েছে, সেটা কারও অজানা ছিল না। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অধিকাংশই হয়তো অসচেতন, কিন্তু যারা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করেন, তাঁরা কি বুঝতে পারেননি শিক্ষার্থীদের ওপর সেই অস্থিরতা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে?

এইচএসসির শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে না জড়ানোই উত্তম। এই সময়টি ভবিষ্যৎ গড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। উচ্চশিক্ষার জন্য যেমন এইচএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান, তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেটি হোক পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতি। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। সাংগঠনিক কিংবা পরোক্ষভাবেও যেন এই শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক দল করুক।

মাত্র কয়েক বছর আগে করোনার আঘাতে আমাদের শিক্ষার্থীদের মাথায় বড় ধাক্কা লেগেছিল। সেই ক্ষতি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু তখনও সময় হারিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের পরও শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্টরা একইভাবে বেখেয়াল ছিল। শুধু রাজনীতিই নয়, একটি প্রজন্মের ওপর আঘাত হিসেবে আর্থসামাজিক অব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতি করেছে।

তাত্ত্বিক আলোচনা বাদ দিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে আরও বলতে চাই। কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মাধবপুর আবু জাহের ফাউন্ডেশন কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আব্দুল কাইউমের সঙ্গে নিবন্ধ লেখার সময় কথা হয়। তাঁর কলেজ থেকে দ্বিতীয় বছরের মতো এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছিল ৯২ জন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৩ জন ছিল ছাত্র, বাকিরা ছাত্রী। এই ৯২ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন এবার পরীক্ষা দিচ্ছে। অর্থাৎ তাঁর কলেজে ঝরে পড়ার হার ৪১.৩ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে মোটা দাগে দুটি কারণ হলো—ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কলেজে অনুপস্থিতি। সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ে রোধ করা সব সময় সম্ভব নয়। কিন্তু অনুপস্থিতি কমাতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সুখকর নয়।

দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের ফোন পেয়ে কোনো কোনো অভিভাবক এমনও বলেছেন, ‘পরীক্ষার আগে টাকা পেলেই তো হয়, এখন ছেলে ব্যস্ত রাজনীতির কাজে।’ শিক্ষার্থীদের ফোন করলে বিরক্ত হওয়ার কথাও কেউ কেউ জানিয়েছেন। কিছু শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা বেড়েছে এবং তাদের কাছে শিক্ষা গৌণ হয়ে পড়েছে। এখানে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও থাকতে পারে। একজন অভিভাবক যখন দেখেন, তাঁর সন্তানের রাজনীতি করাটা অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি সন্তানের শিক্ষার বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দেন না। অন্যদিকে একঘেয়ে ক্লাস করা এবং মুখস্থ করে পরীক্ষার হলে যাওয়ার তুলনায় শিক্ষার্থীও নেতা হওয়াকে সুবিধাজনক মনে করতে পারে। তার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—কী দরকার প্রতিদিন পরিশ্রম করে কলেজে যাওয়ার?

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু তা থামছে না। এবারের ঝরে পড়ার হার চোখে লাগার মতো হলেও গত কয়েক বছরের চিত্রও খুব একটা সুখকর নয়। আর ঝরে পড়া নিয়ে আলোচনা হলেও সমাধানের বিষয়টি খুব একটা আলোচনায় আসে না। দেখা যায়, অধিকাংশই অর্থনৈতিক কারণকে দায়ী করে বিষয়টিকে প্রায় অসাধ্য কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থনৈতিক কারণ অবশ্যই একটি বড় বাধা। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মানসিক পরিবর্তনও যে একটি সমাধান হতে পারে, সেদিকে তেমন একটা দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। সাধারণত করোনা কিংবা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মতো বড় ধরনের ধাক্কার পর শিক্ষার্থীদের, এমনকি প্রয়োজনে অভিভাবকদেরও কাউন্সেলিং প্রয়োজন—সেদিকেও কেউ নজর দেয়নি। আর শিক্ষার পরিবেশ ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কথাও তো আছেই।

শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করে তোলার কাজটি এককভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সামাজিক আন্দোলনের আদলে আন্তরিকতার সঙ্গে যদি সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসেন, তাহলে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষক এবং মনোযোগী শিক্ষার্থীদের ভূমিকা জরুরি। তবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষার্থীদের কর্মী হিসেবে ব্যবহার করে। এটি আমাদের এখানকার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাবতে হবে, দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণকেই প্রাধান্য দিতে হবে। না হলে আগামীতে অশিক্ষিত নেতাই তৈরি হবে, যা রাজনীতি ও দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে।

তাছাড়া এইচএসসির শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে না জড়ানোই উত্তম। এই সময়টি ভবিষ্যৎ গড়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। উচ্চশিক্ষার জন্য যেমন এইচএসসি একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান, তেমনি রাজনীতির ক্ষেত্রেও সেটি হোক পরবর্তী সময়ের প্রস্তুতি। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। সাংগঠনিক কিংবা পরোক্ষভাবেও যেন এই শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক দল করুক।

রাজনৈতিক দলগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপও বন্ধ করতে হবে। এমনও দেখা যায়, কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় খুব খারাপ করেছে, কিন্তু রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে তাকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে বলা হয়। এমন ঘটনা অনেক জায়গাতেই ঘটে। যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজ করে। এসবসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি প্রজন্মকে যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত না করে দেশ ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

এইচআর/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow