ঝাপসা স্মৃতিতে ভর করে ৫৮ বছর পর পরিবার খুঁজে পেলেন দুলাল
পাঁচ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিল একটি শিশু। তারপর কেটে গেছে ৫৮ বছর। শৈশবের স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে, বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে পৃথিবী। তবু মুছে যায়নি নদীর পাড়, একটি বাজার আর জন্মভিটার অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি। সেই স্মৃতির পথ ধরেই অবশেষে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে খুঁজে পেলেন দুলাল চৌধুরী। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে সম্প্রতি এ ঘটনা ঘটে। যাওয়া এ পুনর্মিলনের ঘটনা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ১৯৬৯ সালের দিকে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে নিখোঁজ হয়ে যান দুলাল। এরপর নারায়ণগঞ্জ হয়ে তিনি পৌঁছান চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। সেখানে একটি পালক পরিবারে বড় হলেও নিজের আসল পরিচয় নিয়ে সবসময় শূন্যতায় ভুগতেন তিনি। বছরের পর বছর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ালেও কোনো সূত্র মিলছিল না। অবশেষে সেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তার ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব। একটি পারিবারিক আড্ডায় বাবার মুখে শোনা কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি একটি নদী, লঞ্চঘাট, কালিপুর বাজার এবং কয়েকটি নাম হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের প্রথম সূত্র। এরপর শুরু হয় প্রযুক্তিনির্ভর এক অনুসন্ধান অভিযান। গুগল ম্যাপ
পাঁচ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিল একটি শিশু। তারপর কেটে গেছে ৫৮ বছর। শৈশবের স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে, বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে পৃথিবী। তবু মুছে যায়নি নদীর পাড়, একটি বাজার আর জন্মভিটার অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি। সেই স্মৃতির পথ ধরেই অবশেষে নিজের হারিয়ে যাওয়া পরিবারকে খুঁজে পেলেন দুলাল চৌধুরী।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে সম্প্রতি এ ঘটনা ঘটে। যাওয়া এ পুনর্মিলনের ঘটনা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ১৯৬৯ সালের দিকে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে নিখোঁজ হয়ে যান দুলাল। এরপর নারায়ণগঞ্জ হয়ে তিনি পৌঁছান চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। সেখানে একটি পালক পরিবারে বড় হলেও নিজের আসল পরিচয় নিয়ে সবসময় শূন্যতায় ভুগতেন তিনি।
বছরের পর বছর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ালেও কোনো সূত্র মিলছিল না। অবশেষে সেই অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তার ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব।
একটি পারিবারিক আড্ডায় বাবার মুখে শোনা কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি একটি নদী, লঞ্চঘাট, কালিপুর বাজার এবং কয়েকটি নাম হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের প্রথম সূত্র। এরপর শুরু হয় প্রযুক্তিনির্ভর এক অনুসন্ধান অভিযান। গুগল ম্যাপ ঘেঁটে, স্থানীয় ইতিহাস পর্যালোচনা করে এবং পুরনো ভৌগোলিক তথ্য বিশ্লেষণ করে আকিব সম্ভাব্য এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেন মেঘনা নদীর তীরবর্তী চাঁদপুরের কালিপুর অঞ্চলকে। এরপর স্থানীয় সাংবাদিক ও গবেষকদের সহযোগিতায় যোগাযোগ করা হয় কালিপুর চৌধুরী বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে।
সন্দেহ যখন আশায় রূপ নিতে শুরু করেছে, তখন দুলাল চৌধুরী নিজেই আসেন কালিপুরে। বাড়ির পুরোনো পরিবেশ দেখে যেন একে একে জেগে উঠতে থাকে হারিয়ে যাওয়া শৈশব। তিনি চিনতে পারেন কিছু স্থানের অবস্থান। স্থানীয় প্রবীণরাও স্মরণ করেন বহু বছর আগের সেই সময়কে। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে একটি পুরনো গেট, খালপথ, আমগাছ এবং ‘লবণ তোলা ঘাট’ নামে পরিচিত একটি স্থানের কথা যা দুলালের স্মৃতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এরপর আসে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নিশ্চিত হয় বহুদিনের অপেক্ষার অবসান। জীবিত ভাই মুকুল চৌধুরীর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি কেউই। ৫৮ বছরের বিচ্ছেদ যেন এক মুহূর্তেই গলে যায় অশ্রু, আলিঙ্গন আর আনন্দের উচ্ছ্বাসে।
দীর্ঘদিন পর নিজের জন্মপরিচয় ফিরে পাওয়া দুলাল চৌধুরী এখন পুনরায় যুক্ত হয়েছেন তার রক্তের সম্পর্কের মানুষদের সঙ্গে। স্ত্রী, সন্তান এবং নতুন করে ফিরে পাওয়া আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে শুরু হয়েছে জীবনের নতুন অধ্যায়।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একজন নিখোঁজ মানুষের ফিরে আসার গল্প নয়। এটি স্মৃতির শক্তি, প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং রক্তের সম্পর্কের অদৃশ্য বন্ধনের এক বিরল উদাহরণ। প্রায় ৫৮ বছর পর কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে ফিরে এসে দুলাল চৌধুরী যেন প্রমাণ করলেন সময় মানুষকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শেকড়ের টান কখনো হারিয়ে যায় না।
সবশেষে আসে রক্তের টান ও অকাট্য শারীরিক প্রমাণ। দেলোয়ার হোসেনের মুখের গড়ন, শারীরিক অবয়ব, হাড়ের কাঠামো এবং সবচেয়ে বড় কথা হারিয়ে যাওয়ার সময় পায়ে থাকা একটি নির্দিষ্ট দাগ বা খুঁত এবং গায়ের রঙ, সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে মিলে যায় হারানো শিশু দুলালের সঙ্গে।
মেজো ভাই মুকুল চৌধুরী জানান, ষাট বছর পর যখন দুই ভাই মুখোমুখি হলাম, তখন কালিপুর চৌধুরী বাড়িতে এক আবেগঘন, অশ্রুসিক্ত দৃশ্যের অবতারণা হয়। আমার ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ি। রক্তের টানের কাছে দীর্ঘ ৫৮ বছরের দূরত্ব মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। চৌধুরী পরিবার অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমার ভাইকে আপন করে নেয়। বর্তমানে দেলোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী ছাড়াও পরিবারে চার কন্যা এবং একমাত্র পুত্র ইমাম হোসাইন আকিব রয়েছেন।
এই পুরো অভাবনীয় প্রাপ্তি ও পুনর্মিলনকে একটি অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করেন ইমাম হোসেন আকিব। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, কুরবানির নাম দেওয়ার একটি সাধারণ ঘটনা থেকে শুরু করে বাবার এই সামান্য স্মৃতিগুলো জোড়া দিয়ে ষাট বছর পর পুরো পরিবার খুঁজে পাওয়া আল্লাহর অশেষ রহমত ও অলৌকিক ইশারা ছাড়া আর কিছুই না। আল্লাহর দয়া না থাকলে এত বছর পর এভাবে শেকড় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল।
শরীফুল ইসলাম/কেএইচকে/জেআইএম
What's Your Reaction?