ডাকসেবায় গতি আনতে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালুর চিন্তা
তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ডাকসেবা খাত এখন অনেকটাই পিছিয়ে। তবে দেশে ডাকসেবা খাতকে আধুনিক ও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় মূলত সরকারের লাইসেন্সধারী এজেন্টদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে ডাক বিভাগের বিভিন্ন সেবা। এ লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প চালুর প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনাধীন। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ডাক বিভাগের সব ধরনের সেবা, গ্রাম পর্যায়ে তাদের লোকবল ও অফিস চালু থাকবে। বাড়তি হিসেবে লাইসেন্সধারী এজেন্টদের মাধ্যমে ডাক বিভাগের সব সেবা মিলবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে। ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালু আছে। বাংলাদেশও এ মডেল ব্যবহার করে লাভবান হতে পারে। এতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ডাক বিভাগের সেবা হবে আরও বিস্তৃত, দ্রুত এবং জনবান্ধব। বর্তমানে দেশে ডাক বিভাগের অধীন ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর রয়েছে। কারও হয়তো সন্ধ্যার পর একটি ডকুমেন্ট বা পার্স
তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ডাকসেবা খাত এখন অনেকটাই পিছিয়ে। তবে দেশে ডাকসেবা খাতকে আধুনিক ও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় মূলত সরকারের লাইসেন্সধারী এজেন্টদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে ডাক বিভাগের বিভিন্ন সেবা।
এ লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প চালুর প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনাধীন। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ডাক বিভাগের সব ধরনের সেবা, গ্রাম পর্যায়ে তাদের লোকবল ও অফিস চালু থাকবে। বাড়তি হিসেবে লাইসেন্সধারী এজেন্টদের মাধ্যমে ডাক বিভাগের সব সেবা মিলবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালু আছে। বাংলাদেশও এ মডেল ব্যবহার করে লাভবান হতে পারে। এতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ডাক বিভাগের সেবা হবে আরও বিস্তৃত, দ্রুত এবং জনবান্ধব। বর্তমানে দেশে ডাক বিভাগের অধীন ৯ হাজার ৮৮৬টি ডাকঘর রয়েছে।
কারও হয়তো সন্ধ্যার পর একটি ডকুমেন্ট বা পার্সেল পাঠাতে হবে। তিনি তো ডাকঘর ব্যবহার করতে পারবেন না। এ ধরনের গ্রাহকদের যদি আমরা সেবা দিতে চাই তাহলে নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করলে হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের পরেও আমাদের পার্সেল, ডকুমেন্ট সংগ্রহ ও পরিবহন করতে হবে।— ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম
গত ২৮ এপ্রিল ডাক বিভাগের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল পোস্ট অফিস’ পাইলট ভিত্তিতে চালুর প্রশাসনিক অনুমোদনের লক্ষ্যে আলোচনা সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি। সভায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল পোস্ট অফিস পাইলট ভিত্তিতে চালুর সম্ভাব্য কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি প্রাজ্ঞজনদের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনা এবং আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উপস্থাপনের জন্য ডাক বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস বলতে পুরো ডাকঘর বা ডাক বিভাগ বেসরকারিকরণ বোঝায় না। বরং এটি একটি অংশীদারত্বভিত্তিক ব্যবস্থা, যেখানে ডাক বিভাগের নির্দিষ্ট কিছু সেবা পরিচালিত হয় বেসরকারি উদ্যোক্তা বা এজেন্টের মাধ্যমে।
আরও পড়ুন
জনবল ছাড়াই চলবে স্মার্ট পোস্টবক্স, ডাকসেবা মিলবে ২৪ ঘণ্টা
সুপ্রিম কোর্টে ডাকঘর সেবা চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত
এবার বনশ্রী-গুলিস্তান-মোহাম্মদপুরে নাগরিক সেবা কেন্দ্র চালু
এই ব্যবস্থায় উদ্যোক্তারা লাইসেন্স বা চুক্তির ভিত্তিতে ডাক বিভাগের অনুমোদিত সেবা দিয়ে থাকেন। যেমন— ডাকটিকিট বিক্রি, রেজিস্ট্রি বা স্পিড পোস্ট গ্রহণ, পার্সেল বুকিং, বিল পরিশোধ, ট্র্যাকিং সহায়তা এবং সীমিত আর্থিক সেবা। তবে ডাক পরিবহন, ডেলিভারি নেটওয়ার্ক, বাছাই কেন্দ্র এবং মূল অবকাঠামো পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে থাকে বলে জানিয়েছেন ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা।
যে প্রেক্ষাপটে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের চিন্তা
ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালু করার বিষয়ে আমরা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। আধুনিক ডাক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটি আছে। আমরা কীভাবে করতে পারি সেটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে রূপরেখাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আমরা কীভাবে সেবা নিশ্চিত করতে পারি, সে চিন্তা থেকেই এ উদ্যোগ। কেউ হয়তো আগে থেকেই ব্যবসা করছে, কোনো দোকান বা স্থাপনা আছে; তারা সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে নির্দিষ্ট হারে ফি নিয়ে, নির্দিষ্ট বিধি-বিধান মেনে, যাতে মানুষের কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ না থাকে— এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমরা এটি করবো।’
ডাকবিভাগে এখন আর আগের মতো চিঠি আসে না। ছবি- জাগো নিউজ
সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে সেবা পরিচালনা করতে হয়। ঢাকায় আমাদের ৫/৭টির মতো ডাকঘর রয়েছে যারা নৈশকালীন সেবা দিয়ে থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত সেটাও আবার নয়। কারও হয়তো সন্ধ্যার পর একটি ডকুমেন্ট বা পার্সেল পাঠাতে হবে। তিনি তো ডাকঘর ব্যবহার করতে পারবেন না। এ ধরনের গ্রাহকদের যদি আমরা সেবা দিতে চাই তাহলে নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করলে হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের পরেও আমাদের পার্সেল, ডকুমেন্ট সংগ্রহ ও পরিবহন করতে হবে।’
কাজী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘কুরিয়ার তো গভীর রাত পর্যন্ত সেবা দেয়। এছাড়া শুক্র ও শনিবারও আমাদের বন্ধ। এ ব্যবস্থায় আমরা ছুটির দিনগুলোতেও সেবা দিতে পারবো। ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিসের কনসেপ্টটি এসব প্রেক্ষাপটেই আমরা বিবেচনা করছি।’
এখন ব্যক্তিগত চিঠিপত্র কমে গেলেও ডাক বিভাগের পার্সেল নিয়ে ব্যাপক কাজ করছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘বিদেশ থেকে প্রচুর পার্সেল আসে এবং বিদেশে প্রচুর পার্সেল পাঠানো হচ্ছে। আমাদের আয়ও বেড়ে গেছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলটি পার্সেল কেন্দ্রিকই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আমরা পরীক্ষামূলক মোটরসাইকেল পরিবহনেরও চিন্তা করছি। একটি মোটরসাইকেল রাজশাহী থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে। বোঝার চেষ্টা করছি, এক্ষেত্রে কী চ্যালেঞ্জ, আমরা এটা পারবো কী না। আমরা এক্সপ্লোর করার চেষ্টা করছি।’
আরও পড়ুন
প্রযুক্তির জয়ে হার মানছে টাইপরাইটার
প্রিয়জনের হলুদ খাম এখন অতীত, যা আসে আইনি-তালাক নোটিশ
প্রেমের চিঠি এখন অতীত, যা আসে আইনি-তালাক নোটিশ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্মসচিব (ডাক) সাইদা আফরোজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পোস্ট অফিস চালু করা নিয়ে সভা হয়েছে। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এ বিষয়ে ডাক অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলতে পারে।’
কীভাবে কাজ করে এই মডেল
ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সাধারণত দুটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট হিসেবে উদ্যোক্তা নিজের দোকান, কাউন্টার বা ব্যবসায়িক কেন্দ্র থেকে ডাকসেবা দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত, পোস্টাল এজেন্ট মডেল, যেখানে ছোট দোকান বা স্থানীয় ব্যক্তি বিশেষ করে গ্রামীণ বা দুর্গম এলাকায় ডাকসেবা দেন।
গ্রাহক যখন কোনো চিঠি বা পার্সেল পাঠান, তখন তা স্থানীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটে গ্রহণ করা হয়। এরপর সেটি ডিজিটাল সিস্টেম বা নির্ধারিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ডাক ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। পরবর্তী ধাপে সরকারি ব্যবস্থায় তা বাছাই ও পরিবহন হয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল সাধারণত দুটি স্তরে কাজ করে। প্রথমত, ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেট হিসেবে উদ্যোক্তা নিজের দোকান, কাউন্টার বা ব্যবসায়িক কেন্দ্র থেকে ডাকসেবা দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত, পোস্টাল এজেন্ট মডেল, যেখানে ছোট দোকান বা স্থানীয় ব্যক্তি বিশেষ করে গ্রামীণ বা দুর্গম এলাকায় ডাকসেবা দেন।
এই পুরো ব্যবস্থায় স্থানীয় উদ্যোক্তা শুধু গ্রহণ ও প্রাথমিক সেবা দেন, তবে মূল ডেলিভারি কাঠামো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি বা অংশীদারত্বভিত্তিক ডাকসেবা মডেল সফলভাবে চালু রয়েছে। ভারতে ‘ইন্ডিয়া পোস্ট’ ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটের মাধ্যমে গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ করেছে; যেখানে উদ্যোক্তারা কাউন্টার পরিচালনা করলেও পরিবহন ও লজিস্টিকস সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাকিস্তানে ‘পাকিস্তান পোস্ট’ সীমিত আকারে এ ধরনের মডেল চালু করে বেসরকারি আউটলেটের মাধ্যমে পার্সেল গ্রহণ, বিল পরিশোধ ও কিছু আর্থিক সেবা দিচ্ছে।
ইউনাইটেড স্টেটস পোস্টাল সার্ভিস ‘কন্ট্রাক্ট পোস্টাল ইউনিট’ মডেলের মাধ্যমে বেসরকারি অংশীদারদের দিয়ে খুচরা সেবা দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডেও এ ধরনের রিটেইল বা ফ্র্যাঞ্চাইজি আউটলেটভিত্তিক ডাকসেবা সফলভাবে চালু রয়েছে।
সুবিধার সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জও
বাংলাদেশে এই মডেল চালু হলে ডাকসেবায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, সেবার ভৌগোলিক সম্প্রসারণ দ্রুত হবে। সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। নতুন ডাকঘর নির্মাণ, জনবল নিয়োগ এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজন কমে যাবে। কারণ বিদ্যমান বেসরকারি ব্যবসা কাঠামো ব্যবহার করা যাবে। সেবা গ্রহণ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। গ্রাহকদের আর দূরবর্তী পোস্ট অফিসে যেতে হবে না, স্থানীয় দোকান বা এজেন্ট থেকেই সেবা পাওয়া যাবে।
তবে এই মডেল বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সেবার মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বেসরকারি অংশীদার থাকায় আর্থিক লেনদেন ও গ্রাহক সেবার স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি হবে। সফল বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর সিস্টেম এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরএমএম/কেএসআর
What's Your Reaction?