ডিকেন্সের পদচারণায় ঘেঁষা ইতিহাস...

চার্লস ডিকেন্সকে কে না চেনে? তার নাম শুনলেই গ্রেট এক্সপেক্টেশন আর অলিভার টুইস্টের কথা মাথায় চেপে বসে। উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এই ইংরেজ ঔপন্যাসিক যিনি আজও বিশ্বসাহিত্যকে শাসন করে চলেছেন। তার লেখালেখির প্রভাব এখনো যে কোনো ব্যক্তি জীবনকে আলোড়িত করে। ডেভিড কপাফিল্ড, আ ক্রিস্টমাস ক্যারোল, ব্লিক হাউজ, হার্ড টাইম এবং লিটল ডরিটের মতো বহু কালজয়ী উপন্যাস যা পাঠককে মনে করিয়ে দেয় সে সময়কার সামাজিক রীতিনীতি, আচরণ শাসন ব্যবস্থা, দারিদ্র্যের কষাঘাত পেরিয়ে আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের বহু ঘটনা। তার লেখার মধ্যে বাস্তবতার নিরীক্ষণ তাকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। ডিকেন্সের ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সাবলীল যা সমস্ত জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে পাঠকের ভাবনাকে জীবন্ত করে তোলে।   চার্লস ডিকেন্সকে এসেক্সের বিভিন্ন জায়গায় থিতু হতে দেখা যায়। কখনো ব্রডস্টেয়ার, ফোক্সটোন, চেমসফোর্ড আবার কখনো সাউদেন্ড-অন-সিতে তিনি লেখালেখির জীবন পার করেছেন। এসেক্সের চক, হাইয়াম এবং গ্যাড্‌জ হিল প্লেসে জীবনের বহু সময় কাটিয়েছেন; লিখেছেন বিখ্যাত সব উপন্যাস। কেন্টের সীমান্ত জুড়ে এসব জায়গা অবস্থিত। ডিকেন্স ১৮৫৬ সালের দিকে গ্যাড্‌জ হিল প্লেসটি কেনেন আর আমৃত্য

ডিকেন্সের পদচারণায় ঘেঁষা ইতিহাস...

চার্লস ডিকেন্সকে কে না চেনে? তার নাম শুনলেই গ্রেট এক্সপেক্টেশন আর অলিভার টুইস্টের কথা মাথায় চেপে বসে। উনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এই ইংরেজ ঔপন্যাসিক যিনি আজও বিশ্বসাহিত্যকে শাসন করে চলেছেন। তার লেখালেখির প্রভাব এখনো যে কোনো ব্যক্তি জীবনকে আলোড়িত করে। ডেভিড কপাফিল্ড, আ ক্রিস্টমাস ক্যারোল, ব্লিক হাউজ, হার্ড টাইম এবং লিটল ডরিটের মতো বহু কালজয়ী উপন্যাস যা পাঠককে মনে করিয়ে দেয় সে সময়কার সামাজিক রীতিনীতি, আচরণ শাসন ব্যবস্থা, দারিদ্র্যের কষাঘাত পেরিয়ে আত্মমর্যাদার লড়াইয়ের বহু ঘটনা। তার লেখার মধ্যে বাস্তবতার নিরীক্ষণ তাকে এক অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়। ডিকেন্সের ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত সাবলীল যা সমস্ত জটিলতাকে পাশ কাটিয়ে পাঠকের ভাবনাকে জীবন্ত করে তোলে।  


চার্লস ডিকেন্সকে এসেক্সের বিভিন্ন জায়গায় থিতু হতে দেখা যায়। কখনো ব্রডস্টেয়ার, ফোক্সটোন, চেমসফোর্ড আবার কখনো সাউদেন্ড-অন-সিতে তিনি লেখালেখির জীবন পার করেছেন। এসেক্সের চক, হাইয়াম এবং গ্যাড্‌জ হিল প্লেসে জীবনের বহু সময় কাটিয়েছেন; লিখেছেন বিখ্যাত সব উপন্যাস। কেন্টের সীমান্ত জুড়ে এসব জায়গা অবস্থিত। ডিকেন্স ১৮৫৬ সালের দিকে গ্যাড্‌জ হিল প্লেসটি কেনেন আর আমৃত্যু এখানেই থেকে জান। আর যেসব কালজয়ী লেখা তিনি এই জায়গায় বসে লিখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছে আ টেল অফ টু সিটিস, গ্রেট এক্সপেক্টেশনস এবং আওয়ার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড। এসেক্সর প্রান্ত ঘেঁষে অবস্থিত চিগওয়েল যেখানে বসে লেখেন দ্য মেইপোল ইনের কথা যার চিত্র ব্রানবি রুজ উপন্যাসে দেখা যায়। দ্য মেইপোল ইন হচ্ছে একটি পাব যেখানে সামজিক চাঞ্চল্য এবং রহস্যে ঘেরা নাটকীয় প্রেক্ষাপট দৃশ্যগোচর হতো ডিকেন্সের।

 


সেই দৈনন্দিন জীবনের হিসাব কষে ডিকেন্স সাজালেন ব্রানবি রুজের মতো উপন্যাসের চরিত্রগুলো। আমেরিকান ঔপন্যাসিক চার্লস বুকাওস্কির কথা মনে পড়ে যায় যিনি পাবকে ঘিরে বহু লেখার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। বিশ শতকের এই প্রভাবশালী লেখক যিনি যুক্তরাষ্ট্রের মানব জীবনের দারিদ্র্যতা, হতাশা এবং বঞ্চনার কথা সুচারুভাবে উপস্থাপন করেছেন তার লেখায়। আর ডিকেন্স সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের কথা বলতে গিয়ে তাদের জীবনযাত্রার চিত্র এঁকেছেন; তাদের জন্য সমাজ সংস্করণের কথা বলেছেন, নৈতিকতার কথা বলেছেন। কারণ ডিকেন্সের শৈশব কেটেছে বহু প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। হয়তো এই দুঃসহ, অভাব অনটন, ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে বেড়ে না উঠলে তিনি কখনো চার্লস ডিকেন্স হয়ে উঠতে পারতেন না।     

 

১৮৫৫ সালে ডিকেন্স ফোক্সটনের অ্যালবিয়ন ভিলা নামের একটি বাড়িতে থাকতেন। তখন এই অ্যালবিয়ন ভিলার রঙ ছিল নীলচে-সাদা রঙের আর এখন পুরোটাই সাদা রঙের। এই বড় বিল্ডিংয়ের নিচতলার জানলার পাশে নীলাভ নেমপ্লেট, তার মধ্যে লেখা আছে The Dickens Fellowship/ Charles Dickens / Lived here in 1985 writing part of ‘Little Dorrit’ in this house আর নিচে লেখা আছে নাম্বার তিন। বাড়ির সামনে অংশে তাকালে এখনও লতাগুল্মের ঝোপ চোখে পড়ে। 


বাড়ির সামনে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর দিগন্তময় সাদা-ধূসর মেঘ। ইংলিশ চ্যানেলের এই সৈকত থেকে অ্যালবিয়ন ভিলাটি কয়েকশ ফুট উপরে। আশে পাশে তাকালে বোঝা যায় পাহাড়ী ভূমি, জংলি গাছপালা, ছোটছোট ঝোপঝাড় ও বন্যফুলে ঢাকা উঁচুনিচু ঢাল। এখনো লতাগুল্মে ঘেরা রয়েছে তার বাড়ির সামনের দিকটা। ঝোপঝাড়ের পাশ দিয়ে অর্থাৎ তার বাড়ির সম্মুখ ভাগের একটু ঢালু জায়গা বরাবর জলরাশির কাছে পৌঁছোবার একটা রাস্তা নেমে গেছে। রাস্তাটি আপাতত বন্ধ করে রাখা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য পাহাড়ি ঢালের গায়ে সিঁড়ি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেই বড় আবাসিক ভিক্টোরিয়া হাউজ চোখে পড়ে আর তার অদূরেই সৈকত। পাথরের আস্তরণ হচ্ছে এই সৈকতের বিশেষত্ব। শীতের প্রারম্ভে পর্যটকদের আনাগোনা না থাকাতে এই বনরাশি আরো চুপচাপ হয়ে যায়। পাখির কলরব যেন স্পট হয়ে শীত বিকেলের জলজ আহবানকে আরো বিমোহিত করে। আজ থেকে প্রায় ১৪০ বছর আগে এই বাসস্থানের ডান পাশ এবং সামনের দিকটা বনভূমিতে আঁটসাঁট ছিল তাতে কোনো সন্ধেহ নেই। তখন এতো আধুনিকায়ন হয়ে ওঠার সুযোগ ছিল না কিন্তু পর্যটনের জায়গা হিসেবে কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। ধারণা করা যায় তখনকার ফোক্সটোনের এই জায়গাটা ছিল সমুদ্রতীরবর্তী আধুনিক হোটেল বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে না ওঠা গ্রাম্য ছোট্ট শহর। ছিল কিছু সরাইখানা, ইতিহাসের পাতায় তাঁদের মধ্যে দ্য প্যাভিলিয়ন হোটেল এবং দ্য রয়্যাল প্যাভিলিয়ন হোটেলের হদিস পাওয়া যায়।

 


আজ যেখানে আবাসিক হোটেল, নামী রেস্তোরা, ক্যাফে আর মাছ শিকারের জন্য ফিসিং পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে সেখানে শুধু মাত্র উঁচু ক্লিফ, ছায়াঘেরা বনতল আর পাথর নুড়ির পাশে জেগে ছিল সরু রাস্তা। এই রাস্তা দিয়েই ডিকেন্স হাঁটার জন্য বেরিয়ে পড়তেন। জনশ্রুতি আছে দ্য লিস নামের সরু পথ ধরে মাইলের পর মাইল হাঁটতে বেরুতেন ডিকেন্স। ডিকেন্স বলতেন এই রাস্তাটি হলো আমার থিংকিং গড। তাহলে বোঝায় যায় ভ্রমণের মধ্য দিয়েই তিনি চিন্তার গভীরে হারিয়ে যেতেন এবং উপন্যাসের চরিত্র, কাহিনি, প্রেক্ষপটের ছবি আঁকতেন। এই দ্য লিস হলো ফোক্সটোন হার্বার থেকে শুরু হয়ে সেটা পশ্চিম দিকে স্যান্ডগেইট পর্যন্ত বিস্তৃত জনসাধারণের বৈকালিক ভ্রমণের নিত্য হাঁটাপথ। হয়তো এই দ্য লিসকে কেন্দ্রে করে ‘দ্য লিস ক্লিফস হল’ নামে একটি ঐতিহাসিক কনসার্ট হল তৈরি হয়েছে তাও সেটা ১৯২৭ সালের দিকে। 

 


এই বাড়িতে বসে ডিকেন্স লিটল ডরিট উপন্যাসটি লিখেছিলেন। যেখান থেকে দূরে তাকালে উঁচু হোয়াইট ক্লিফ এবং নিচে ইংলিশ চ্যানেল বা সমুদ্রপথ দেখা যায় অপর প্রান্তে রয়েছে ফ্রান্সের সীমানা। উৎকৃষ্ট লেখার জন্য পরিবেশ এবং আবহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর সেই পারিপার্শ্বিক উপাদানের উপস্থিতিতে একটি লেখা বহুগুণে তা উৎকৃষ্ট হয়ে উঠতে পারে।  


কোনো কোনো বাড়ি পৃথিবীর পাতায় এমন ভাবে জ্বলজ্বল ক’রে জীবন্ত হয়ে থাকে যে বাড়ির শেষ চিহ্নটি মুছে গেলেও তা স্বমহিমায় অম্লান থাকে কারণ ঐ বাড়ি থেকে সৃষ্টি হওয়া সৃষ্টি-কর্মটি সাধারণ কিছু নয়। ভিলা ডিওদাতি বাড়িটির কথা মনে আছে যেখান থেকে পৃথিবীর প্রথম সায়েন্স ফিকশান লেখার সূত্রপাত ঘটে, শুধু তাই নয় ইউরোপীয় রোমান্টিক যুগের এক স্মরণীয় অধ্যায়ও বটে। জেনেভার হ্রদের পাশে অবস্থিত ছোট পাহাড়ি অঞ্চল, নাম কলোনি, গ্রামের হ্রদ ঘেঁষে অবস্থিত এই ভিলা ডিওদাতি। ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের আমন্ত্রণে পার্সি বিসি শেলি এবং তাঁর সহধর্মিনি মেরি শেলি অতিথি হিসেবে আগমন করেন এই বাড়িতে। এই অতিথি শালায় আরো একজন উপস্থিত ছিলেন তিনি হলেন বায়রনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জন পলিডরি। সেদিন ঝড় ঝঞ্জার রাতে গল্প লেখার প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে প্রথম সায়েন্স ফিকশন অর্থাৎ ফ্রাংকেস্টাইন লেখার সূত্রপাত হয়। ফ্রান্সকেস্টাইন হয়ে ওঠে উপন্যাস হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাসে এক জ্বলজ্বল নক্ষত্র যা আজও পাঠক মহলে সমাদৃত। সাহিতের প্রতিটি সৃষ্টি কর্মের পেছনে এক অন্যরকম গল্প জড়িয়ে থাকে যা পরবর্তীকালে গবেষণায় উঠে আসলে পাঠকের কাছে রোমাঞ্চকর মনে হয়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাস লেখার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ইতিহাস। ১৯৬৫ সালের কোনো এক সকালে মেক্সিকো সিটি থেকে আকাপুল্কো যাওয়ার পথে মাথার মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে যায়; নিঃসঙ্গতার একশ বছর লেখার রসদ জুটে যায় তার মস্তিষ্কের গহ্বরে। সে যাত্রা থামিয়ে তিনি দেড় বছর সেচ্ছায় নির্বাসন নিয়ে নেন। আর এই স্বেচ্ছা নির্বাসনের সব ব্যয় ভার বহন করেন স্ত্রী মার্সেদেস। 

১৯৬৫ সালের এক সকালে, মেক্সিকো সিটি থেকে আকাপুলকো যাওয়ার পথে হঠাৎ যেন বিদ্যুতের মতো তার মাথায় আসে উপন্যাসটির পূর্ণাঙ্গ রূপ— এবং সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্টে তার স্বেচ্ছা-নির্বাসন, যা টানা দেড় বছর স্থায়ী হয়।


তার স্ত্রী মার্সেদেস ঘরের সব কিছু বিক্রি করে দিয়েছিলেন, যেন মার্কেস নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখতে পারেন সেই ‘মাকোন্দো’ নামের কাল্পনিক শহরের গল্প — যা পরে বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্ত প্রতীক হয়ে ওঠে।

ফেরা যাক আবার ডিকেন্সের এই বাড়ি প্রসঙ্গ। 
ডিকেন্স, লিটল ডরিটের জন্য বিখ্যাত নন কিন্তু গ্রেট এক্সপেক্টেশন আর অলিভার টুইস্টের নাম শোনেনি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া দুস্কর। আর এই গ্রেট এস্পেক্টেশন কোথায় বসে লেখা হয়েছিল? শুধু গ্রেট এক্সপেক্টেশ, না, আওয়ার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড এই দুটো উপন্যাস ডিকেন্স লিখেছিলেন কেন্টের হাইয়্যামে বসে। 


সেই একই কেন্টের ডন হাউসে বসে চার্লস ডারউইন লেখেন অন দ্য অরিজিন অফ স্পেসিস। ডন হাইজ এখন পৃথিবীর ইতিহাস। এমন বহু বাড়ি ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে যা আজও পাঠকের মনে গভীর দাগ কেটে যায়। কোনো ফিকশন না নন ফিকশন যদি ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে নেয় তবে সেসব লেখার পেছনে যত অনুষঙ্গ থাকে তাও একদিন ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে। ডিকেন্সও তেমন একজন ইতিহাস আর তার বিচরণের প্রত্যেকটা জায়গা ঐতিহাসিক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow