ঢাকার সড়কের ‘বিষফোড়া’ ব্যাটারিচালিত রিকশা
রাত ৮টার কিছু বেশি। বাড্ডার প্রগতি সরণি সড়ক দিয়ে ঢাকার বাইরের একটি পরিবহনের সঙ্গে রীতিমতো রেস করছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। আসনে দুই নারী। রেষারেষির মধ্যে পরিবহনের সামান্য ধাক্কায় মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে গেলো রিকশা। যাত্রীরা যেন উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়লেন সড়কে। আশপাশের লোকজন ধরে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। প্রতিদিন অফিস শেষে এই সড়কে ফুটপাত ধরে হাঁটা আশিকুর রহমানের সামনে ঘটে এ দুর্ঘটনা। এর দুদিন পরে ঠিক একই জায়গায় আরেকটি সড়কের অর্ধেক দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পিষে দেয় বাস। এ ঘটনার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন আশিক সাহেবের কাছে আতঙ্ক। জাগো নিউজের কাছে ঘটনার বর্ণনা করে দীর্ঘ পথ হাঁটলেও আর রিকশা চড়বেন না বলে জানান তিনি। রফিকুল ইসলাম পল্টন থেকে রাত ১০টার পর অটোরিকশায় ফিরছিলেন কুড়িলের বাসায়। নতুনবাজার এসে পেছন থেকে প্রচণ্ড ধাক্কায় পড়ে যান ছিঁটকে। পরে নিজেকে আবিষ্কার করেন বাসার নিচে। সেদিন কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তা তিনি জানেন না। মনেও করতে পারেন না কিছু। কে পৌঁছে দিয়েছিল তাও জানেন না। চেতনা হলে দেখেন মুখ ফুলে গেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা-থেঁতলে গেছে। অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মা
রাত ৮টার কিছু বেশি। বাড্ডার প্রগতি সরণি সড়ক দিয়ে ঢাকার বাইরের একটি পরিবহনের সঙ্গে রীতিমতো রেস করছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। আসনে দুই নারী। রেষারেষির মধ্যে পরিবহনের সামান্য ধাক্কায় মুহূর্তে দুমড়ে-মুচড়ে গেলো রিকশা। যাত্রীরা যেন উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়লেন সড়কে। আশপাশের লোকজন ধরে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে।
প্রতিদিন অফিস শেষে এই সড়কে ফুটপাত ধরে হাঁটা আশিকুর রহমানের সামনে ঘটে এ দুর্ঘটনা। এর দুদিন পরে ঠিক একই জায়গায় আরেকটি সড়কের অর্ধেক দখল করে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পিষে দেয় বাস। এ ঘটনার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন আশিক সাহেবের কাছে আতঙ্ক। জাগো নিউজের কাছে ঘটনার বর্ণনা করে দীর্ঘ পথ হাঁটলেও আর রিকশা চড়বেন না বলে জানান তিনি।
রফিকুল ইসলাম পল্টন থেকে রাত ১০টার পর অটোরিকশায় ফিরছিলেন কুড়িলের বাসায়। নতুনবাজার এসে পেছন থেকে প্রচণ্ড ধাক্কায় পড়ে যান ছিঁটকে। পরে নিজেকে আবিষ্কার করেন বাসার নিচে। সেদিন কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তা তিনি জানেন না। মনেও করতে পারেন না কিছু। কে পৌঁছে দিয়েছিল তাও জানেন না। চেতনা হলে দেখেন মুখ ফুলে গেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা-থেঁতলে গেছে।
অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মানে না। এছাড়া অটোরিকশাগুলো রাস্তার যে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার চেষ্টা করে, যা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট বাড়ে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।-ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান
রফিকুল-আশিকুরের মতো এমন গল্প এখন রাজধানীর আনাচে-কানাচে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ব্যাটারিচালিত রিকশা। সরকার পতনের পর সড়কে আবির্ভূত হয় বিভিন্ন রূপে। হয়ে ওঠে আরও লাগামছাড়া। রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি সব যেন দখলে চলে গেছে ক্রমে ঢাকার ‘বিষফোড়া’ হয়ে ওঠা এ বাহনের।
কেন বিষফোড়া বলা হচ্ছে? এর অসংখ্য যুক্তি আছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। নগরের পাড়া-মহল্লায় যেসব গলিপথ যানজটমুক্ত ছিল, সেগুলোতেও এখন প্রধান সড়কের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির। উল্টোপথে চলা, প্রধান সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা, অন্য যান্ত্রিক বাহনকে তোয়াক্কা না করা, কখনো উড়াল সড়কেও উঠে যাচ্ছে এসব রিকশা। আর দুর্ঘটনা তো নিয়মিত ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি ঢাকার যানজট মহামারির রূপ নিয়েছে। দেখেও যেন কেউ দেখার নেই। অভিভাবকহীন একটি নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে মোটরচালিত যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে এমন অনিরাপদ বাহন চলতে দেওয়া হয় না। এছাড়া ছোট যানবাহনের আধিক্যে ঢাকার সড়কের ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীলতা কমছে, আর বিশৃঙ্খলা এত বেড়েছে যে পুরো শহর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েক লাখ চালকের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে দখল হচ্ছে ফুটপাতও।
তবে চালকরা বলছেন, গরিবের যানবাহন হিসেবে খ্যাত অটোরিকশায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলে তাদের পেটে লাথি মারা হবে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার অটোরিকশা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে। ঈদের পর এ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যাবে।-ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ
আওয়ামী লীগ সরকার কয়েকবার জোরেশোরে চেষ্টা করেও প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা তুলতে পারেনি। গত দেড় বছরে প্যাডেলচালিত রিকশা শহরে নেই বললেই চলে। নানারকম সাজসজ্জা, চাকা, ডিজাইনে পরিবর্তন এনে সড়ক এখন দখলে অটোরিকশার।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও চালকদের আন্দোলনের মুখে সফল হয়নি। গুলশানের মতো এলাকায়ও দাপটের সঙ্গে প্রধান সড়কে চলছে রিকশা। সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্যও সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি
‘আরবান মবিলিটি স্টাডি: রিকশা ইন ট্রানজিশন’ নামে একটি গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকায় চলাচল করা বেশিরভাগ রিকশার নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই পেশায় যারা আসছেন, তারা তুলনামূলক তরুণ।
গবেষণায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেন ১৮ শতাংশ যাত্রী।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে শহরে যানজট বেশি হচ্ছে। ৩৪ শতাংশ যানজটের জন্য প্যাডেল রিকশাকে দায়ী করছেন। আর ৪ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, সব রিকশাই যানজটের জন্য দায়ী।
এক বছরে নিহত ১৩৭৬ জন
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, অটোভ্যান, লেগুনা, মিশুকসহ বিভিন্ন তিন চাকার যানের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৬ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি নছিমন, করিমন, ভটভটি, আলমসাধু, মাহিন্দ্রা ও টমটমের দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও ৪৮৯ জন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় মারা যান মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা করিম রাচি। গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে নোয়াখালীতে ট্রাকের সঙ্গে একটি অটোরিকশার সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হন। একইভাবে ১২ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে অটোরিকশার ধাক্কায় প্রাণ হারায় সাত বছরের শিশু আয়েশা। সড়ক-মহাসড়কে বেপরোয়া চলাচলের কারণে এমন দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একটি সূত্রের তথ্যমতে, সারা দেশে স্থানীয়ভাবে তৈরি ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশাসহ তিন চাকার অবৈধ যানের সংখ্যা ৫০-৬০ লাখ। এর মধ্যে রাজধানীতেই চলছে ২০ লাখের বেশি। অবৈধ ও নিবন্ধনহীন এই যান কয়েক বছরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অবৈধ এসব যান নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই।
আলোর মুখ দেখেনি অটোরিকশার জন্য নীতিমালা তৈরির কাজ
সড়ক পরিবহনসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগে রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ও অলিগলিতে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রধান প্রধান সড়কেও উঠে আসে। সর্বত্র চলাচলের সুবিধায় সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে। জাতীয় মহাসড়কের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সরাসরি লেনেও বিনা বাধায় চলছে এসব যান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় এসব যান এখন নিয়ন্ত্রণহীন।
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য গত প্রায় দুই বছর ধরে একটি নীতিমালা তৈরির কথা বলা হলেও মন্ত্রণালয় তা এখনো কার্যকর করতে পারেনি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুনভাবে অটোরিকশা নামা বন্ধ করার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।-ড. মো. হাদিউজ্জামান
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সফল হয়নি। এগুলোর লাইসেন্স দেওয়ার ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কোন সংস্থার থাকবে, তা নিয়েও সৃষ্টি হয়েছিল জটিলতা। সড়ক পরিবহন আইনে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষমতা বিআরটিএর থাকলেও ব্যাটারির রিকশা ও অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আগ্রহ দেখায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। গত বছর স্থানীয় সরকার বিভাগ ব্যাটারির রিকশা, অটোরিকশার জন্য নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করলেও তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যাত্রী চাহিদার তুলনায় গণপরিবহন কম থাকার সুযোগে ঢাকাসহ সারা দেশে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা-অটোরিকশা। এসব যানের অধিকাংশের নকশা ও কারিগরি মান যথাযথ নয়। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকায় এগুলো কার্যকরভাবে তদারকি কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় সরকার
ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার বিষয়ে সম্প্রতি সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, যানজট নিয়ন্ত্রণে ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারির রিকশা, অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা জরুরি। নিয়মের তোয়াক্কা না করে এভাবে যান চলাচল গ্রহণযোগ্য নয়। তবে অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করা হবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে- সে বিষয়ে সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
বেশি লাভের আশায় অটোতে ঝুঁকছেন সবাই
প্রায় ৩০ বছর ধরে রিকশা বানানোর পেশায় যুক্ত আহসান হাবিব। এই ব্যবসায় লাগা পরিবর্তনের ঢেউ সম্পর্কে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে প্যাডেল রিকশা তৈরি করি না। কারণ এখন এটা থেকে লাভ আসে না। আজকাল মানুষের সব সময়ই তাড়া থাকে। তারা প্যাডেল রিকশার চেয়ে অটোরিকশাই বেশি পছন্দ করে। অটোরিকশা চালাতে শারীরিক পরিশ্রম হয় না, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যায় এবং চালকরা ভাড়াও কম রাখতে পারেন। এতে তারা সারা দিনে তুলনামূলক কম ভাড়ায় প্যাডেল রিকশার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী পরিবহন করতে পারেন।’
অটোরিকশাচালক ওয়াহিদ ইসলাম জানান, মাসে আমরা প্রায় ৩০ হাজার টাকা বা তারচেয়েও বেশি আয় করতে পারি। কষ্ট কম হয়। প্যাডেল রিকশায় মাসে মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়। এছাড়া মাঝেমধ্যেই শারীরিক পরিশ্রমের কারণে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে অনেকদিন তাদের কোনো আয়ই হয় না। তাই এখন সবাই অটোরিকশায় ঝুঁকেছেন।
চালকের পর্যাপ্ত ধারণা নেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানীর যানবাহন ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব যানবাহন নিয়ম না মেনে চলাচল করায় প্রধান সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক চালকের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। পাশাপাশি এসব যান নিবন্ধিত নয়। কোনো নির্দিষ্ট ডাটাবেজ না থাকায় আইন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বছিলা, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, মুগদা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ওয়ার্কশপে দেশীয় কারিগররা এসব যান বানাচ্ছেন। গত দুই বছরে চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনও বেড়েছে। রাজধানীতে কমে গেছে প্যাডেল রিকশা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাফিক বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, আমরা সব সময় অটোরিকশার বিরুদ্ধে। লাইসেন্স নেই, দক্ষতা নেই, দুর্ঘটনার ঝুঁকি তো থাকবেই। তবে সরকার যদি নীতিমালা দেয়, তাহলে নির্দিষ্ট রুট ও নিয়ম-কানুনের মধ্যে রেখে এই রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
নিবন্ধন না থাকায় চালকরা অপরাধেও জড়াচ্ছেন
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মানে না। এছাড়া অটোরিকশাগুলো রাস্তার যে কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার চেষ্টা করে, যা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট বাড়ে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।’
তিনি বলেন, ‘নিবন্ধন না থাকায় এসব অটোরিকশার চালকদের পরিচয় শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিজ এলাকায় অপরাধ করে গাঢাকা দিতে কেউ কেউ ঢাকায় এসে রিকশাচালকের পরিচয়ে জীবনযাপন শুরু করেন।’
ঈদের পর নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ
ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ রাখা বা প্রধান সড়কে চলাচল সীমিত করার বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এ খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত থাকায় চালকদের আন্দোলনের পর সরকার তাদের চলাচলের অনুমতি দেয়।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচিত সরকার অটোরিকশা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে। ঈদের পর এ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যাবে।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘অটোরিকশার লাগামহীন বিস্তারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরী অচিরেই অচল হয়ে পড়তে পারে। সহজলভ্যতা, লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকতা না থাকা এবং উচ্চ আয়ের সুযোগ থাকায় বিভিন্ন খাতের শ্রমিকরা অটোচালনায় ঝুঁকছেন, যা ক্ষুদ্র-কুটির শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত অটো চলাচলে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বাড়ছে, সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা বিশ্বমানের নীতিমালা অনুসরণ করে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং চলমান বিশৃঙ্খলা থেকে দ্রুত উত্তরণ নিশ্চিত করা।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের জন্য গত প্রায় দুই বছর ধরে একটি নীতিমালা তৈরির কথা বলা হলেও মন্ত্রণালয় তা এখনো কার্যকর করতে পারেনি। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নতুনভাবে অটোরিকশা নামা বন্ধ করার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘অটোরিকশা কেনা বা চালানোর জন্য কোনো নিবন্ধন, রুট পারমিট বা লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। ফলে এটি কালো টাকা বিনিয়োগের একটি নিরাপদ ও বড় খাত হিসেবে পরিণত হয়েছে। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কেনার টাকায় প্রায় ৩০টি অটোরিকশা কেনা সম্ভব এবং এতে আয়ের পরিমাণও অনেক বেশি। ফলে এখানে একটি মহাজন প্রথা তৈরি হয়েছে। সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা পঙ্গপালের মতো বা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে, যা পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। এই বৃদ্ধি এখন জ্যামিতিক হারে হচ্ছে।’
অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান আরও বলেন, ‘যারা সরকারকে নিয়মিত ট্যাক্স দিয়ে সড়কে গাড়ি চালায়, অটোরিকশার বিশৃঙ্খলার কারণে তাদের চলাচল এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এই অটোরিকশাগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ও তীব্র যানজটের জন্য অনেকাংশেই দায়ী। সামগ্রিকভাবে, অটোরিকশা এখন আর কেবল সাধারণ মানুষের জীবিকার বাহন নয়, বরং কোনো কাগজপত্র না লাগার সুযোগে এটি অনিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগ এবং সড়ক অব্যবস্থাপনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
টিটি/এএসএ
What's Your Reaction?