ঢাকায় বায়ুদূষণ কমছে না, দায়ী নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা

দেশের নগর পরিবেশ, বিশেষ করে ঢাকার বায়ুদূষণ ও নির্মাণজনিত ধুলা নিয়ে জনভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পরিবেশ পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন, নির্মাণ নীতিমালার প্রয়োগ, টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা এবং নগর পরিকল্পনার ঘাটতিসহ নগর পরিবেশের নানাবিধ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রায়হান আহমেদ। জাগো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আদিল মুহাম্মদ খান নগর শাসনের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, ব্যবসায়ী মহলের প্রভাব এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতাকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছর ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি। জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি, বিশেষ করে নগর পরিবেশের মান—আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? ড. আদিল মুহাম্মদ খান: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের নগর পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যম

ঢাকায় বায়ুদূষণ কমছে না, দায়ী নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা

দেশের নগর পরিবেশ, বিশেষ করে ঢাকার বায়ুদূষণ ও নির্মাণজনিত ধুলা নিয়ে জনভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে পরিবেশ পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন, নির্মাণ নীতিমালার প্রয়োগ, টাস্কফোর্সের কার্যকারিতা এবং নগর পরিকল্পনার ঘাটতিসহ নগর পরিবেশের নানাবিধ বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রায়হান আহমেদ

জাগো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আদিল মুহাম্মদ খান নগর শাসনের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, ব্যবসায়ী মহলের প্রভাব এবং আইন প্রয়োগের শিথিলতাকে দূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছর ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি।

জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি, বিশেষ করে নগর পরিবেশের মান—আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নগর শাসনের দুর্বলতা দায়ী

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের নগর পরিবেশ নিয়ে তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি। সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। তবে কিছু আইনি সংস্কারে তারা সফলতা এনেছে। জাতীয় নগর নীতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, ইমারত নির্মাণ নীতিমালা সংস্কার করা হয়েছে। ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নগরে আরও উঁচু ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আপস করেছে বলেও মনে হয়। প্রশ্ন হলো, সরকার কার পরামর্শে ড্যাপ সংশোধনের পথে হাঁটলো?

আরও পড়ুন
ধুলিকণায় বিষাক্ত খুলনার বাতাস
পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলো
ছুটির দিনে বায়ুদূষণে শীর্ষে ঢাকা
কাঠ পোড়ানোর দূষণে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে সাড়ে ৮ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু

জাগো নিউজ: ঢাকার নির্মাণ এলাকা থেকে ধুলা ও নির্মাণসামগ্রীর কারণে অনেক বেশি বায়ুদূষণ হচ্ছে। নির্মাণ বিধিমালা করেও কেন এখনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি?

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব ও নগর শাসনের দুর্বলতা অনেক বেশি দায়ী। আইন প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্র যেভাবে কাজ করার কথা, সেভাবে করছে না। ইমারত নির্মাণ ও সড়ক খনন নীতিমালায় অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে—কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে পরিচালনা করতে হবে। কিন্তু প্রশাসনিক মনিটরিং না থাকায় দূষণ কমছে না। নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করছে না; রাজউক ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। বাস্তবে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান যথাযথ তদারকি করে না, ফলে স্থানীয় জনগণ দূষণ থেকে মুক্তি পায় না। অন্যদিকে ঠিকাদাররা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দূষণ ঘটিয়েই যাচ্ছে। আইনের যথাযথ তদারকি হলে দূষণ অন্তত কিছুটা কমানো সম্ভব।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নগর শাসনের দুর্বলতা দায়ী

জাগো নিউজ: নির্মাণকাজজনিত দূষণ কমাতে সরকার, সিটি করপোরেশন এবং ডেভেলপারদের জন্য কী ধরনের বাধ্যতামূলক নীতিমালা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নির্মাণকাজজনিত দূষণ কমাতে সিটি করপোরেশন, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হবে। নির্মাণ বিধিমালা ও জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মানতে বাধ্য করতে হবে। কেউ আইন না মানলে তাকে কালোতালিকাভুক্ত করা এবং জরিমানা করতে হবে। সিটি করপোরেশন যদি এলাকাভিত্তিক মনিটরিং জোরদার করে, তাহলে দিনের পর দিন কেউ দূষণ ঘটাতে পারবে না। রাজউক ও স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। কেউ বারবার দূষণ ঘটালে তার নির্মাণকাজ স্থগিত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকরা এ ধরনের ঘটনা দেখলে প্রশাসনকে অভিযোগ জানানোর সুযোগ পাবে। সিটি করপোরেশন এলাকাভিত্তিক নির্মাণ সাইটে সেন্সর স্থাপন করতে পারে, যাতে প্রতিদিন কোনো এলাকায় দূষণের মাত্রা রিয়েল টাইমে দেখা যায়। নির্ধারিত মানদণ্ড অতিক্রম করলে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

আরও পড়ুন
গাইবান্ধায় বসতবাড়ির আশপাশ ও কৃষিজমির অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের নির্দেশ
ভারতে বায়ুদূষণ এখন অর্থনীতির বড় বাধা
১০৮ ইটভাটার ৭০টিই অবৈধ, ধোঁয়া-ছাইয়ে বিপন্ন জনজীবন
সিসা দূষণ নির্মূলে জাতীয় কৌশলপত্র করা হচ্ছে

জাগো নিউজ: অন্তর্বর্তী সরকারের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে গঠিত টাস্কফোর্স বা বিশেষ অভিযানের কার্যকারিতা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: টাস্কফোর্স মূলত কয়েকটি সভা করেছে, কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তারা ‘নো ব্রিকফিল্ড জোন’ ঘোষণা ও বর্জ্য পোড়ানো বন্ধের উদ্যোগ নিলেও দৃশ্যমান ফল দেখাতে পারেনি। ঢাকার মতো শহরে বাস্তবায়ন ছিল দুর্বল এবং জনসম্পৃক্ততার অভাবে সুফল মেলেনি। ব্যবসায়িক মহলের সঙ্গে আপসের কারণেও উদ্যোগগুলো কার্যকর হয়নি। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক পদক্ষেপ লোক দেখানো উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

দূষণ নিয়ন্ত্রণে বড় উৎসগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ব্যবসায়ীদের কাছে নতি স্বীকার করা হয়েছে। দূষণকারী কার্যক্রমের ওপর ফি আরোপের মতো বিধান এখনো দৃশ্যমানভাবে কার্যকর হয়নি।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নগর শাসনের দুর্বলতা দায়ী

জাগো নিউজ: নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং খোলা মাটি ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে করণীয় কী?

ড. আদিল মুহাম্মদ খান: নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় নেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং পানি ছিটানো নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া দূষণের অন্যতম সূত্র ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করতে হবে। মানসম্মত গণপরিবহন চালু করা যেতে পারে। ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস ও ট্রাক নিষিদ্ধ করতে হবে। দূষণকারী যানবাহন ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে ‘পলিউটার ট্যাক্স’ দিতে বাধ্য করতে হবে।

ঢাকায় অনেক খোলা মাটির মাঠ রয়েছে যেখানে কোনো সবুজ নেই—এসব স্থান থেকে ধুলাবালি উড়ে। তাই রাস্তার পাশে খোলা জায়গা রাখা যাবে না; ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা কার্যকর করতে হবে। ছোট যান নিরুৎসাহিত করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উন্নত দেশের মতো যানজট নিরসনে কনজেশন প্রাইসিং চালু করা যেতে পারে। সাইকেল লেন ও ফুটপাতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। নির্দিষ্ট জলাশয় সংরক্ষণ ও সবুজায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন
ভাঙা ফুটপাত, গর্ত আর ধুলায় নাজেহাল পথচারীরা
দিল্লিতে বায়ুদূষণের প্রতিবাদে রাস্তায় নামলেন বাবা-মায়েরা
রাজধানীতে শব্দদূষণ করায় ৬ যানবাহনকে জরিমানা
বায়ুদূষণ রোধে ৯ নির্দেশনা ৩ সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন চান হাইকোর্ট

জাগো নিউজ: উন্নয়ন কার্যক্রম ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনতে শহর পরিকল্পনায় কী ধরনের সংস্কার জরুরি?

ড.আদিল মুহাম্মদ খান: উন্নয়ন কার্যক্রম ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনতে হলে আমাদের দর্শনগত পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা যে বিধ্বংসী নগরায়নের ধারা চালু করেছি, সেখান থেকে ফিরে আসতে হবে। নির্মাণসংক্রান্ত সব আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি শহরের একটি বহনক্ষমতা থাকে, কিন্তু ঢাকায় তার সক্ষমতার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন হয়েছে। এখন যদি উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় এবং ঢাকাকে আরও বিস্তৃত ও উঁচু করা হয়, জনসংখ্যা বাড়ানো হয়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এজন্য আরবান গ্রোথ বাউন্ডারি নির্ধারণ করতে হবে, গ্রিন বেল্ট তৈরি করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে উন্নত বিশ্বের মতো পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) ও পরিকল্পনা অনুমোদন ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে ঢাকায় পরিবেশ বিধ্বংসী উন্নয়ন কার্যক্রমের অনুমোদন পাওয়া কঠিন হবে।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নগর শাসনের দুর্বলতা দায়ী

জাগো নিউজ: ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে আগামী পাঁচ বছরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ড.আদিল মুহাম্মদ খান: ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে সরকারকে নির্মাণজনিত ধুলা ও রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু করতে হবে এবং খোলা ট্রাকে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে। যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বন্ধে ফিটনেসবিহীন গাড়ি সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার সর্বত্র নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও সবুজায়ন বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানা ধীরে ধীরে ঢাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে এবং আইন প্রয়োগে কোনো শিথিলতা দেখানো যাবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, শহরের জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব নয়।

আরএএস/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow