ঢাবির ছাত্রী হলে ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রবেশের জন্য প্রচলিত নিয়মকে ‘সান্ধ্য আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবিতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’। সোমবার (১০ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সংহতি সমাবেশ থেকে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়। সমাবেশে বিভিন্ন ছাত্র, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং শিক্ষকরা সংহতি জানান। সমাবেশে অবরোধবাসিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অবস্থান কর্মসূচিসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিন দফা দাবি অবরোধবাসিনীর তিন দাবির মধ্যে রয়েছে- ছাত্রী হলে বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা যাতায়াতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে নারী শিক্ষার্থীদের যে কোনো হলে প্রবেশ ও অনুমতি সাপেক্ষে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া এবং ছাত্রীদের মা, বোন ও নারী স্বজনদের হলে প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করা। সমাবেশে প্ল্যাটফর্মটির এক প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের দাবি কোনো অনুগ্রহ বা দয়া নয়, এটা ন্যায্য দ

ঢাবির ছাত্রী হলে ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলগুলোতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রবেশের জন্য প্রচলিত নিয়মকে ‘সান্ধ্য আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তা বাতিলের দাবিতে প্রশাসনকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’।

সোমবার (১০ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সংহতি সমাবেশ থেকে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়। সমাবেশে বিভিন্ন ছাত্র, নারী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং শিক্ষকরা সংহতি জানান।

সমাবেশে অবরোধবাসিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অবস্থান কর্মসূচিসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

তিন দফা দাবি

অবরোধবাসিনীর তিন দাবির মধ্যে রয়েছে- ছাত্রী হলে বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা যাতায়াতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে নারী শিক্ষার্থীদের যে কোনো হলে প্রবেশ ও অনুমতি সাপেক্ষে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া এবং ছাত্রীদের মা, বোন ও নারী স্বজনদের হলে প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করা।

সমাবেশে প্ল্যাটফর্মটির এক প্রতিনিধি বলেন, ‘আমাদের দাবি কোনো অনুগ্রহ বা দয়া নয়, এটা ন্যায্য দাবি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীরা তাদের চলাচল, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকারের জন্য দাঁড়িয়েছে- এই দায় আসলে কার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের না কি রাষ্ট্রের?’

অবরোধবাসিনীর পক্ষে বক্তব্য দেন ইশরাত জাহান ইমু। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নারীদের হলগুলোতে রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে ফেলে।

তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালে বঙ্গমাতা হলে এক ছাত্রী অসুস্থ অবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে হলের ভেতরেই মারা যান।’ এ ধরনের ঘটনা থেকে সান্ধ্য আইন বাতিলের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

ইশরাত আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সাংবাদিকতা ও একাডেমিক কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণও এই বিধিনিষেধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে তারা ১৬ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে, বাকি ৮ ঘণ্টা ছাত্রীদের হলের ভেতরেই থাকতে হবে। অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টাই নিরাপত্তার বিধান আছে। এই বৈষম্য এবং ছাত্রীদের চরিত্র হননসহ প্রশাসনিক হয়রানি চরম লিঙ্গ বৈষম্য।’

‘নিরাপত্তা নয়, নারীকে ঘরবন্দি রাখার ব্যবস্থা’

সমাবেশে বিপ্লবী নারী মুক্তির পক্ষে বক্তব্য দেন তাসনিয়া নেবুলা। তিনি সান্ধ্য আইনকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিধি হিসেবে না দেখে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘রাত ১০টায় হল গেট বন্ধ করে দেওয়ার এই প্রথা কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নয়। এই ব্যবস্থা একজন নারীকে ঘরবন্দি করে রাখার সামন্তীয়, ঔপনিবেশিক এবং ধর্মীয় মৌলবাদী চেতনার এক জীবন্ত নমুনা।’

তাসনিয়ার মতে, শিক্ষার্থীদের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রের উচিত কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

‘২৫-৩০ বছর আগে আন্দোলন করেও বৈষম্য দূর হয়নি’

নারীপক্ষের সদস্য শিবীন হক বলেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে তারাও ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। তখন সন্ধ্যা ৬টার বিধিনিষেধ পরিবর্তন করে রাত ১০টা পর্যন্ত করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা আন্দোলন করে একটু সময় বাড়াতে পেরেছিলাম, কিন্তু বৈষম্যটা দূর করতে পারিনি। আজ যারা দাঁড়িয়েছে, তারা সোজাসাপ্টাভাবে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বলছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই।’

আলোকচিত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ২০২৬ সালেও নারীদের চলাচলের ওপর এমন বিধিনিষেধ থাকা হতাশাজনক।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন নারী হয়ে ভাবতেই পারি না, শুধু নারী হওয়ার কারণে, শুধু লিঙ্গের কারণে আমাকে বৈষম্যে রাখা হবে ২০২৬ সালেও।’

তিনি মনে করেন, নারী শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে আরও শিক্ষার্থী যুক্ত হলে তা বড় পরিসরের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

‘বৈষম্যমূলক ও নিপীড়নমূলক আইন’

সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সংহতি জানান।

তিনি বলেন, ‘২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পরে আগস্টে আমাদের একটা নতুন স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল। তো সেই বাংলাদেশেও এখনো এই ধরনের বৈষম্যমূলক এবং বন্দিত্বমূলক একটা আইন রয়ে গেছে, এটা আমাদের জন্য শিক্ষক হিসেবে খুবই লজ্জার বিষয়।’

নারীদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ক্যাম্পাসের বাইরে কোনো নারী রাত ১১টা, ১২টা বা ১টার পর বাসায় ফিরতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কেন ফিরতে পারবেন না।

অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বলেন, ‘তার মানে কি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা আমাদের ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম রাত ১০টার পরে? আমার কাছে মনে হয়, এটা এক ধরনের নিপীড়নমূলক ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা।’

তিনি অবিলম্বে সান্ধ্য আইন বাতিলের দাবি জানান।

সমাবেশে নারী মুক্তি সংগঠন, রেড ফেমিনিস্ট ব্লগ, নারীপক্ষ, নারী অঙ্গন, বিপ্লবী নারী মুক্তি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সোসাইটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন সংগঠন সংহতি জানায়।

অবরোধবাসিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে অবস্থান কর্মসূচিসহ পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

একিউএফ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow