তরুণদের রক্তদান যেসব কারণে ভীষণ জরুরি
দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা, জরুরি অস্ত্রোপচার, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার, প্রসবজনিত রক্তক্ষরণসহ নানান কারণে গড়ে প্রায় ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। দেশের জনসংখ্যা বিপুল। সেই তুলনায় এই চাহিদা নগণ্য। তবে বাস্তবে এই নগন্য চাহিদা পূরণে এখনও নিয়মিত স্বেচ্ছারক্তদাতার ঘাটতি আছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দান করতেন, তাহলে জাতীয় রক্তচাহিদা শতভাগ পূরণ করা সম্ভব। তরুণদের রক্তাদান ভীষণ জরুরিসাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সুস্থ যে কোনো ব্যক্তি রক্ত দিতে পারেন। বাস্তবে ৩০ বছর বয়সের পর ধীরে ধীরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়, যা অনেককে রক্তদানে শারীরিকভাবে অনুপযোগী করে তোলে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী বয়সে তরুণরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি সুস্থ, কর্মক্ষম ও রক্তদানের উপযুক্ত থাকে। ফলে নিরাপদ রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে তরুণদের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি জরুরি। তারুণ্যে রক্তদানের শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা রক্তদানের আগে রক্তচাপ, নাড়ির গতি, শরীরের তাপমাত্রা এবং হিমোগ্লোবিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ফলে
দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা, জরুরি অস্ত্রোপচার, থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার, প্রসবজনিত রক্তক্ষরণসহ নানান কারণে গড়ে প্রায় ১০ লাখ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। দেশের জনসংখ্যা বিপুল। সেই তুলনায় এই চাহিদা নগণ্য। তবে বাস্তবে এই নগন্য চাহিদা পূরণে এখনও নিয়মিত স্বেচ্ছারক্তদাতার ঘাটতি আছে। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দান করতেন, তাহলে জাতীয় রক্তচাহিদা শতভাগ পূরণ করা সম্ভব।
তরুণদের রক্তাদান ভীষণ জরুরি
সাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী সুস্থ যে কোনো ব্যক্তি রক্ত দিতে পারেন। বাস্তবে ৩০ বছর বয়সের পর ধীরে ধীরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়, যা অনেককে রক্তদানে শারীরিকভাবে অনুপযোগী করে তোলে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থী বয়সে তরুণরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি সুস্থ, কর্মক্ষম ও রক্তদানের উপযুক্ত থাকে। ফলে নিরাপদ রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে তরুণদের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তারুণ্যে রক্তদানের শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা
রক্তদানের আগে রক্তচাপ, নাড়ির গতি, শরীরের তাপমাত্রা এবং হিমোগ্লোবিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ফলে একজন রক্তদাতা রক্তদানের মাধ্যমে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কেও নিয়মিত ধারণা লাভ করেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ বয়স থেকে নিয়মিত রক্তদান ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। একজন নিবেদিত রক্তদাতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তরুণদের মাদক ও অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে অনুপ্রাণিত করে। এছাড়াও রক্তদানের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হলো আত্মতৃপ্তি, যা তরুণদের জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলে, হতাশা দূর করে এবং মানসিক প্রশান্তি সৃষ্টি করে।
তারুণ্যের শক্তিকে মহিমান্বিত করে
তারুণ্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো অন্যের জন্য কিছু করার ক্ষমতা। অথচ বর্তমান সমাজে তারুণ্যকে প্রায়ই শুধু ক্যারিয়ার, চাকরি ও ব্যক্তিগত সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার বিখ্যাত ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতায় লিখেছেন, ‘এ বয়স জানে রক্তদানের পুণ্য’। আসলে রক্তদান এমন একটি মানবিক কাজ, যা একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
আধুনিক ব্লাড ব্যাংকে এক ব্যাগ রক্ত থেকে বিভিন্ন রক্ত-উপাদান পৃথক করে একাধিক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, প্লাটিলেট কনসেনট্রেট, ফ্রেশ প্লাজমা, ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা, প্লাটিলেট রিচ প্লাজমা, প্লাটিলেট পুওর প্লাজমা, প্রোটিন সলিউশন, রেড সেল কনসেনট্রেট এবং ক্রায়ো-প্রিসিপিটেট। ফলে একব্যাগ রক্ত থেকে একাধিক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ছাত্রাবস্থা থেকে কেউ যদি নিয়মিত রক্ত দেন, তাহলে এক জীবনে হাজারো মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রাখা যায়। তাই তারুণ্যকে মহিমান্বিত করতে আঠারো বছর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের রক্তদানে সক্রিয় হওয়া উচিত।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রক্তদানের গুরুত্ব
জীবন রক্ষার গুরুত্ব সব ধর্ম ও নৈতিক দর্শনেই বিশেষভাবে স্বীকৃত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল’ (সূরা মায়েদা: ৩২)। অর্থাৎ একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষার সমতুল্য। বাইবেলেও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সৎকাজ করতে জানে, অথচ তা করে না, তার জন্য তা পাপ’ (যাকোব ৪:১৭)। ঋগবেদেও নিঃস্বার্থ দানের মহিমা বর্ণিত হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এমন দান আশীর্বাদ, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ বয়ে আনে।’ তাই ধর্মের শিক্ষায় উজ্জীবিত হয়ে আমরা তরুণ বয়স থেকেই নিয়মিত রক্তদান শুরু করতে পারি।
মানবিক মহাসমাজ গড়তে
রক্তদান এমন একটি কাজ, যেখানে কোনো আর্থিক লাভ নেই, আছে একজন মানুষের বিপদের সময়ে তার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ। এই নিঃস্বার্থ মানসিকতাই একজন তরুণকে প্রকৃত অর্থে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। একজন শিক্ষার্থী যখন রক্ত দেন, তখন তিনি শুধু একজন রক্তদাতা নন, তিনি মানবিকতার একজন দূতও। তার এই উদ্যোগ বন্ধু, সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদেরও উদ্বুদ্ধ করতে পারে। এভাবেই একজন রক্তদাতা সমাজে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলেন।
রক্তদানে ভয় কীসের
রক্তদানে আমরা অনেকেই সুচের ভয় পাই। কিন্তু রক্তগ্রহীতার স্বজনদের হাহাকার, মুমূর্ষু রোগীর বাঁচার আকুতি এবং একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো পুণ্যময় কাজের তুলনায় এই সামান্য ব্যথা কিছুই নয়। অনেকে আবার রক্তশূন্যতার ভয় পান। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেছে, রক্তদানের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তরসের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়। আর বছরে তিনবার রক্ত দিলে দেহের লোহিত কণিকা নবায়নে সহায়তা করে এবং রক্তদাতার সার্বিক সুস্থতা ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে।
স্বেচ্ছা রক্তদানে তরুণদের করণীয়
রক্তদানকে তরুণদের সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
■ বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার মতে, নিরপদ ও পর্যাপ্ত রক্ত যোগানের ভিত্তি হলো নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা। তাই ১৯তম জন্মদিনে প্রথম সুযোগেই রক্তদান নিশ্চিত করা এবং আজীবন নিয়মিত রক্তদানের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া।
■ প্রতি চার মাস অন্তর রক্তদানকে অভ্যাসে রূপান্তর করা এবং অন্যদেরও রক্তদানে উৎসাহিত করা।
■ জন্মদিন, বিশেষ দিন বা উপলক্ষে রক্তদানকে সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা।
■ ‘রক্তদাতা পরিচয়’ একটি সামাজিক মর্যাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ধূমপান না করা, মাদকমুক্ত থাকা, সুস্থ জীবনযাপন করা এবং নিয়মিত রক্তদান, এসবকে তরুণদের ইতিবাচক পরিচয়ের অংশ বানানো।
■ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বেচ্ছা রক্তদাতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের রক্তদাতাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করা।
■ কোয়ান্টাম ব্লাড ল্যাব, রেড ক্রিসেন্ট, সন্ধানীসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো।
■ নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদান বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা। রক্তদান সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা সুচভীতি, দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভয় বা রক্তশূন্যতার মতো প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করা।
দেশের রক্তসংকট দূর করার সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে দেশের তরুণদের মধ্যেই। তারুণ্য শুধু স্বপ্ন দেখার সময় নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও সময়। তাই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত রক্তদানের অঙ্গীকার হোক নতুন প্রজন্মের সামাজিক শপথ। কারণ একটি ব্যাগ রক্ত শুধু একজন রোগীকেই বাঁচায় না, বাঁচিয়ে রাখে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।
লেখক:
অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর,
বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (বাইউস্ট)
আরএমডি
What's Your Reaction?