তামাকমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে এখনই কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
প্রতিবছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো তামাকের ভয়াবহ ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করা। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস সামনে এলেই আমরা তামাকের ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করি। পরিসংখ্যান তুলে ধরি, সচেতনতার কথা বলি, নানা কর্মসূচি পালন করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে তামাকের বিস্তার এখনো উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একদিকে মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের উর্বর কৃষিজমি ও পরিবেশও ধ্বংস হচ্ছে তামাক চাষের কারণে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য তামাক এখন বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তামাক আসক্তির কারণে পৃথিবীব্যাপী প্রতি ৪ সেকেন্ডে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বছরে তামাক ব্যবহারের কারণে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৭০ লাখ, যার বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩.৭৮ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর পাশাপাশি লা
প্রতিবছর ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো তামাকের ভয়াবহ ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করা। বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস সামনে এলেই আমরা তামাকের ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করি। পরিসংখ্যান তুলে ধরি, সচেতনতার কথা বলি, নানা কর্মসূচি পালন করি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে তামাকের বিস্তার এখনো উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একদিকে মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের উর্বর কৃষিজমি ও পরিবেশও ধ্বংস হচ্ছে তামাক চাষের কারণে। জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য তামাক এখন বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তামাক আসক্তির কারণে পৃথিবীব্যাপী প্রতি ৪ সেকেন্ডে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বছরে তামাক ব্যবহারের কারণে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৭০ লাখ, যার বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে ঘটে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩.৭৮ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। তামাক ব্যবহারের কারণে দেশে বছরে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এর পাশাপাশি লাখো মানুষ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ই-সিগারেট ব্যবহার করছে, আর বাংলাদেশেও এর বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আমাদের দেশের তরুণদের বিশাল একটি অংশ ই-সিগারেট ও ভ্যাপিংয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ই-সিগারেট ও ভ্যা পিংকে অনেকেই আধুনিকতা বা কম ক্ষতিকর বিকল্প হিসেবে মনে করলেও বাস্তবে এটি ক্যানসার, ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগ, দাঁত ও মাড়ির ক্ষয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। নিকোটিনের আসক্তি কিশোরদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করে এবং ভবিষ্যতে মাদকাসক্তির ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আকর্ষণীয় প্যাকেট, বিভিন্ন সুগন্ধি ফ্লেভার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং তথাকথিত আধুনিক লাইফস্টাইলের মাধ্যমে তরুণদের লক্ষ্য করেই ই-সিগারেটের বাজার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৮ শতাংশ তরুণ। এই তরুণ প্রজন্মকে ই-সিগারেট, ভ্যাপিং, তামাক ও নিকোটিন আসক্তি থেকে রক্ষা করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি অসুস্থ প্রজন্ম কখনোই একটি সুস্থ ও উৎপাদনশীল জাতি গড়ে তুলতে পারে না।
বাংলাদেশে ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ, কিডনি জটিলতা এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফুসফুসের ক্যানসার, মুখগহ্বরের ক্যানসার, গলার ক্যানসার এবং খাদ্যনালির ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। শুধু তাই নয়, তামাক হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন তামাক সেবনের ফলে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), হাঁপানি এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে।
তামাকের ক্ষতি কেবল ব্যবহারকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সদস্য, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা পরোক্ষ ধূমপানের মাধ্যমে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েন। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এটি গর্ভের শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে, জন্মগত ত্রুটি ও অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ায়। শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, হাঁপানি, কানের সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়ার অন্যতম কারণ পারিবারিক ধূমপান।
বাংলাদেশে তামাকের ক্ষতি শুধু ভোক্তার স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তামাক চাষও পরিবেশ ও কৃষির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। বিশেষ করে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে তামাক চাষ বিস্তার লাভ করেছে। এছাড়াও কুষ্টিয়া, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও তামাক চাষ বাড়ছে। বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো কৃষকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে খাদ্যশস্যের জমিকে ধীরে ধীরে তামাক চাষের আওতায় নিয়ে আসছে।
পার্বত্য অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষের বিস্তার এখন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তামাক চাষের ফলে বন উজাড়, পাহাড়ের মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়া এবং পানিদূষণের মতো ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতি দেখা দিচ্ছে। তামাক শুকানোর জন্য বিপুল পরিমাণ কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করছে। ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এসব এলাকায় এখনই তামাক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিকোটিন আসক্তি, রোগব্যাধি ও পরিবেশগত ক্ষতির ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হবে।
তামাক নিয়ন্ত্রণে এখন শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন। তামাকপণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ, প্রকাশ্যে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে তামাক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একইসঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলসহ তামাক চাষপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিকল্প কৃষি ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কৃষকরা লাভজনক খাদ্যশস্য চাষে ফিরে আসতে পারেন।
রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধের যে আইন আছে, সেই আইন আরো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে তরুণদের লক্ষ্য করে ইতিবাচক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্কুল-কলেজে প্রচারণা, তামাকবিরোধী ক্যাম্পেইন, কাউন্সেলিং এবং তামাক ছাড়তে আগ্রহীদের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত না করলে তামাক নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসবে না।
তামাকের বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু স্বাস্থ্য রক্ষার আন্দোলন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার সংগ্রাম। একটি সুস্থ, সচেতন ও উৎপাদনশীল বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই তামাক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর ভয়াবহ মূল্য দিতে হবে।
লেখক : জনস্বাস্থ্য ও ক্যানসার প্রতিরোধ গবেষক, সভাপতি : ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি বাংলাদেশ।
What's Your Reaction?