তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির বলেছেন, অতীতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থানও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে অনেক সময় বিষয়টি জটিল হয়ে উঠেছিল। তবে বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে একই রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব থাকায় তিস্তা সমস্যার সমাধান আগের তুলনায় সহজ হওয়ার কথা। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে সিলেট সদর উপজেলার একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে কালবেলাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সম্ভাব্য বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে হুমায়ূন কবির সরাসরি কোনো দেশ বা সময়সীমার কথা উল্লেখ না করে বলেন, 'সঠিক সময়ে আপনারা দেখবেন তিনি কোন দেশে যান।'
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'জিয়াউর রহমান ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা। তার রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণ, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নয়নকেন্দ্রিক। তার দেশপ্রেম ও উন্নয়ন দর্শন আজও জাতির জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।'
সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক মানের নতুন ট্রেনের বিষয়ে হুমায়ূন কবির জানান, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের একটি নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই ট্রেনটির পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু হবে। প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর এটি যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক রেলব্যবস্থা ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি সিলেট রেলওয়ে স্টেশনকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন রূপে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথাও জানান তিনি।
সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়ে হুমায়ূন কবির বলেন, শুধু সড়কপথের ওপর নির্ভর করে কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সড়ক, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত করে একটি কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, চার লেন মহাসড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগলেও বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারের মূল দর্শন হচ্ছে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
তিনি বলেন, 'ওয়াশিংটন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দিল্লি, বেইজিং, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গেও সুসম্পর্ক সমানভাবে প্রয়োজন।'
হুমায়ূন কবিরের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘ, ওআইসি, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাত চাই না। আমরা সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং যৌথ উন্নয়নে বিশ্বাস করি। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।'
আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে হুমায়ূন কবির বলেন, একটি জাতির উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, দেশপ্রেম এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার।
তিনি বলেন, 'আমাদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে হবে। পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে।'
তার মতে, সাহসী, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
সিলেট থেকে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর বিষয়ে কাজ চলছে বলেও জানান হুমায়ূন কবির। এতে প্রবাসী ও সাধারণ যাত্রীরা আরও সহজে এবং কম সময়ে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি জানান, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উন্নয়নে বর্তমানে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রীসেবা এবং পরিচালন ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যাপক কাজ চলছে।
প্রবাসীদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি উল্লেখ করে হুমায়ূন কবির বলেন, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের হয়রানিমূলক আচরণ মেনে নেওয়া হবে না।
ইমিগ্রেশন, ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক সেবা গ্রহণে প্রবাসীরা যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রবাসীবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেন।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে হুমায়ূন কবির বলেন, সমাজের উন্নয়ন ও কল্যাণে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মকে সিনিয়রদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহযোগিতা এবং ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমেই একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
সাংবাদিক সমাজকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে সাংবাদিকরা সমাজকে আলোকিত করেন। প্রবীণ সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা, সততা এবং পেশাগত দক্ষতা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।
মতবিনিময় সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীসহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।