স্বপ্ন ছিল অনেকের মতোই। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথটা ছিল কাটা, কান্না, অপেক্ষা আর নিরন্তর সংগ্রামে ভরা। কখনো চারপাশের মানুষের নিরুৎসাহ, কখনো শারীরিক অসুস্থতা, কখনো নিজের ভেতরের অনিশ্চয়তা।
সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেই আজ সাফল্যের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শাহনাজ পারভীন প্রিয়া। ৪৭তম বিসিএসে ফ্যামিলি প্ল্যানিং ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। তবে এই সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছে আরেকটি নাম তার স্বামী ওয়াকিফুর রহমান ইমরান।
কালবেলার সঙ্গে আলাপকালে নিজের বিসিএস যাত্রার গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শাহনাজ।
তিনি জানান, এই অর্জন শুধু তার একার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের অবিচল বিশ্বাস, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং অগণিত ত্যাগ।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার আব্দুল আউয়াল ও ফাতেমা আক্তার দম্পতির সন্তান শাহনাজ পারভীন প্রিয়া। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সবার ছোট তিনি।
ছোটোবেলা থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী এই শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় লক্ষ্মীপুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জনের পর তিনি ভর্তি হন ভৈরবের রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজে। ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পান। এরপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে থেকে পড়াশোনা শুরু করেন।
শিক্ষাজীবনের মাঝেই ২০২৩ সালের ২৬ মে পুরান ঢাকার নিমতলির শাহজাহান ভূঁইয়ার ছেলে ওয়াকিফুর রহমান ইমরানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। বিয়ের পর অনেকের কাছে যেখানে মেয়েদের স্বপ্ন থমকে যাওয়ার গল্প শোনা যায়, সেখানে শাহনাজের জীবনে বিয়ে হয়ে ওঠে নতুন শক্তির উৎস।
কালবেলাকে শাহনাজ বলেন, ‘বিসিএস আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল। বিয়ের পর ২০২৪ সাল থেকে আমার বিসিএস জার্নি শুরু। এই জার্নিতে আমি শিখেছি, কখনো হাল ছাড়া যাবে না। যখন মনে হবে সামনে আর কোনো পথ নেই, তখনও ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। অনেকেই বলেছে, আমাকে দিয়ে বিসিএস হবে না, এগুলো সময় নষ্ট ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আমি থামিনি।’
নিজের সংগ্রামের গল্প বলতে বলতে সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্বামীর প্রতি।
তিনি বলেন, ‘আমার বিসিএসের সিরিয়াস জার্নি শুরু হয় আমার স্বামীর অনুপ্রেরণায়। যখনই আমি ভেঙে পড়েছি, তিনি বলেছেন তুমি পারবে প্রিয়া। যখন মনে হয়েছে আর সম্ভব না, তখন তিনি আমাকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখতে বলেছেন।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে স্মৃতির পাতায় ফিরে যান তিনি। কালবেলাকে বলেন, ‘বিসিএসের এই দীর্ঘ যাত্রায় কত রাত আমরা কান্না করে কাটিয়েছি, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। প্রিলিমিনারির আগের সময়টায় তার সহযোগিতা কখনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’
সংগ্রামের সেই পথ আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন কক্সিডাইনিয়ার তীব্র ব্যথায় প্রায় দেড় মাস শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু সেসময়ও পাশে ছিলেন তার জীবনসঙ্গী।
শাহনাজ বলেন, ‘আমি যখন বিছানা থেকে উঠতেই পারতাম না, তখন তার ভালোবাসা আর যত্নে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান স্ত্রী মনে হয়েছে। আমার কষ্টে তার চোখে পানি দেখেছি। তখন মনে হয়েছে, আল্লাহর কাছে এর চেয়ে বড় নিয়ামত আর নেই।’
দীর্ঘ সময় পড়াশোনার পর ক্লান্ত শরীর আর অবসন্ন মনকে নতুন করে উজ্জীবিত করতেন ইমরান।
শাহনাজ জানান, ‘৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পড়াশোনা শেষে সে-ই ছিল আমার রিফ্রেশমেন্ট। পরের দিন নতুন করে শুরু করার শক্তি পেতাম তাঁর কাছ থেকেই।’
ফল প্রকাশের প্রতিটি মুহূর্তও ছিল উদ্বেগ আর প্রার্থনায় ভরা। কালবেলাকে তিনি বলেন, ৪৭তম বিসিএসের প্রতিটি রেজাল্টের আগে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আল্লাহকে বলতাম, হে মাবুদ, আমাদের না-বলা সংগ্রামগুলো তো তুমি জানো। আমার জন্য না হোক, ওর জন্য আমাকে দিয়ে দাও।
স্ত্রীর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ওয়াকিফুর রহমান ইমরানও। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর প্রতিটি মোনাজাতে আমার স্ত্রীর সফলতার জন্য দোয়া করেছি। আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া ছিল, তিনি যেন আমার স্ত্রীর পরিশ্রমের মূল্য দেন এবং ওকে একজন ক্যাডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আজ আমি অনেক খুশি।’
শাহনাজ পারভীন প্রিয়ার বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গল্প শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি বিশ্বাসের গল্প, ধৈর্যের গল্প, দাম্পত্য ভালোবাসার গল্প। এটি এমন এক স্বপ্নযাত্রার গল্প, যেখানে একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়াই করেছেন, আর আরেকজন মানুষ নীরবে তার পাশে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নকে নিজের স্বপ্নে পরিণত করেছেন। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে আজ লেখা হয়েছে সাফল্যের নাম বিসিএস ক্যাডার শাহনাজ পারভীন প্রিয়া।