তোফায়েল আহমেদের বিদায় ও রাষ্ট্রীয় সংকীর্ণতা : শিষ্টাচারের মহীরুহের সামনে এক অবক্ষয়ের আয়না

একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাস কেবল কিছু জড় ইমারত, নথিপত্রের স্তূপ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের খতিয়ানে বেঁচে থাকে না। ইতিহাস মূলত প্রাণ পায় সেই সব মানুষের হাত ধরে, যারা নিজেদের জীবনকে একেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে রূপান্তর করেছেন। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের তেমনই এক অনন্য ও জীবন্ত বাতিঘর। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক এই কিংবদন্তি জননেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল লড়াইয়ের এই প্রধান সাক্ষী যখন চিরবিদায় নেন, তখন পুরো জাতি এক গভীর শূন্যতা অনুভব করে। কিন্তু সেই শূন্যতাকে ছাপিয়ে দেশের সচেতন মানুষকে আজ সবচেয়ে বেশি পীড়িত ও লজ্জিত করছে তার বিদায়লগ্নে রাষ্ট্রের, বিশেষ করে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের চরম উদ্যোগহীনতা, উদাসীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্লিপ্ততা। তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ দেশের সংসদীয় রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য এবং বিরল কীর্তি গড়েছেন— তিনি দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ৯ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে দশকের পর দশক

তোফায়েল আহমেদের বিদায় ও রাষ্ট্রীয় সংকীর্ণতা : শিষ্টাচারের মহীরুহের সামনে এক অবক্ষয়ের আয়না

একটি স্বাধীন দেশের ইতিহাস কেবল কিছু জড় ইমারত, নথিপত্রের স্তূপ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের খতিয়ানে বেঁচে থাকে না। ইতিহাস মূলত প্রাণ পায় সেই সব মানুষের হাত ধরে, যারা নিজেদের জীবনকে একেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ে রূপান্তর করেছেন।

তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের তেমনই এক অনন্য ও জীবন্ত বাতিঘর। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক এই কিংবদন্তি জননেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল লড়াইয়ের এই প্রধান সাক্ষী যখন চিরবিদায় নেন, তখন পুরো জাতি এক গভীর শূন্যতা অনুভব করে।

কিন্তু সেই শূন্যতাকে ছাপিয়ে দেশের সচেতন মানুষকে আজ সবচেয়ে বেশি পীড়িত ও লজ্জিত করছে তার বিদায়লগ্নে রাষ্ট্রের, বিশেষ করে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের চরম উদ্যোগহীনতা, উদাসীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্লিপ্ততা।

তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন এ দেশের সংসদীয় রাজনীতির এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য এবং বিরল কীর্তি গড়েছেন— তিনি দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ৯ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।

১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে দশকের পর দশক যিনি এই সার্বভৌম সংসদের ফ্লোরকে নিজের প্রজ্ঞা, যুক্তি ও ক্ষুরধার বক্তব্যে মুখরিত রেখেছেন, তার শেষ জানাজা জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত না হওয়াটা এক চরম ঐতিহাসিক বিচ্যুতি।

সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী যেখানে বহু সাধারণ ও কনিষ্ঠ সংসদ সদস্যের শেষ বিদায়ও সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হতে দেখা যায়, সেখানে ৯ বারের একজন বর্ষীয়ান ও প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ানের ক্ষেত্রে এই অবহেলা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়। এটি মূলত ইতিহাসের প্রতি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনীহা ও মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতারই বহিঃপ্রকাশ।

​আক্ষেপের পরিধি কেবল সংসদের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এই উদাসীনতার চাদর আরও চওড়া হয়েছে যখন দেখা গেল বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও দ্রোহের প্রতীক— কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কিংবা রাজধানীর অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও উন্মুক্ত স্থানে এই মহান নেতাকে শেষবারের মতো নাগরিক শ্রদ্ধা জানানোর কোনো ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

যে মানুষটি যৌবনের সোনালী দিনগুলো রাজপথে কাটিয়েছেন, স্বৈরাচারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি থেকেও আপসহীনভাবে মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন, তাঁর মরদেহ কেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কিংবা জাতীয় স্তরের কোনো সম্মানজনক স্থানে আপামর জনতার শেষ শ্রদ্ধার জন্য রাখা হলো না, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান নাগরিককে তাড়িত করছে।

কোনো দেশের জাতীয় বীরদের প্রতি এমন উদাসীনতা প্রদর্শন সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের তীব্র ‘মানসিক দেউলিয়াত্ব’ ও চিন্তার দৈন্যকেই নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। ক্ষমতার সাময়িক দম্ভ আর ইতিহাসের প্রতি অন্ধত্ব যখন গ্রাস করে, তখনই কেবল এমন অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

​অবশ্য বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এই জাতীয় অবহেলা ও পরমতবিদ্বেষের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলেও আমরা বারবার দেখেছি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা দলীয় সংকীর্ণতার কারণে জাতীয় স্তরের বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের তাদের প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু তোফায়েল আহমেদ নিজেই ছিলেন এই নোংরা ও কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ব্যতিক্রম। তার রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সর্বজনীন শিষ্টাচার ও পরমতসহিষ্ণুতা। তিনি সবসময় দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণ খোলস থেকে বেরিয়ে সকল দল ও মতের মানুষের কাছে নিজের এক অনন্য গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছিলেন।

চরম রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ির যুগেও তিনি যেভাবে বিরোধী শিবিরের প্রতি সৌজন্য দেখিয়েছেন, তা সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য ও দুর্লভ দর্শন। এর সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি হয়েছিল সমসাময়িক রাজনীতির এক উত্তাল সময়ে, যখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনৈতিক সফরে তোফায়েল আহমেদের নিজ জেলা ভোলায় গিয়েছিলেন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে এক দল অন্য দলকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং শত্রু মনে করে— সেখানে তোফায়েল আহমেদ কোনো সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিরোধী দলের এই শীর্ষ নেতাকে ভোলায় আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান, তার আরাম-আয়েশের খোঁজখবর নেন এবং রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এক পরম মানবিক সৌজন্য প্রদর্শন করেন।

এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, আদর্শের লড়াই রাজপথে কিংবা সংসদে নিজস্ব গতিতে চলবে, কিন্তু তা যেন পারস্পরিক মানবিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক বন্ধনকে কখনো গ্রাস না করে। রাজনীতির এই দর্শন আজ আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকদের মাঝে বড্ড অনুপস্থিত।

​তোফায়েল আহমেদের এই সর্বজনীন শিষ্টাচার ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রামাণ্য নজির আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে। ১/১১-র সেই ঝোড়ো ও অনিশ্চিত দিনগুলোতে অবরুদ্ধ রাজনীতিকে মুক্ত করতে এবং বেসামরিক ধারায় ফিরতে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার গভীর রাজনৈতিক সংলাপ ও বোঝাপড়া আজ এক ঐতিহাসিক দলিল।

শুধু তাই নয়, তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতার মাঝেও সংসদ লবি কিংবা লাউঞ্জে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রবীণ নেতার সঙ্গে তার আজীবন ব্যক্তিগত হৃদ্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রমাণ করত যে— তিনি ব্যক্তিক কুৎসা ও সংকীর্ণতার অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতেও তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মতামত ও সংশোধনীকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতেন, যা আজকের একরোখা সংসদীয় সংস্কৃতিতে রূপকথার মতো শোনায়।

​এই অনন্য সৌজন্যের পরম্পরা আমরা আরও অতীতেও দেখতে পাই। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিয়ের অনুষ্ঠানে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে তোফায়েল আহমেদ সানন্দে অংশ নিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক চরম বৈরিতার সেই যুগেও পারিবারিক ও সামাজিক সৌজন্যের যে অনন্য উচ্চতা তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজকের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক মস্ত বড় শিক্ষার বিষয়। আদর্শের জায়গায় ইস্পাতকঠিন থেকেও প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতাদের অসুস্থতায় বা রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে ব্যক্তিগত সম্পর্কের মর্যাদা দিতে তিনি কখনো কুণ্ঠিত হননি।

​গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, ‘রাজনীতি হলো সর্বোচ্চ মানবিক কল্যাণ সাধনের শিল্প।’ তোফায়েল আহমেদ তার দীর্ঘ জীবনে সেই শিল্পকেই ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। অথচ, যে মানুষটি আজীবন পরম শত্রু ও প্রতিপক্ষকেও সম্মান দিয়ে গেছেন, বিদায়বেলায় রাষ্ট্র তাকে ন্যূনতম নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানটুকু দিতে পারল না— এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের এক করুণ আয়না।

ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, কোনো সাময়িক রাষ্ট্রীয় সুযোগ, সরকারি আয়োজন কিংবা এক টুকরো চত্বরের সীমাবদ্ধতা দিয়ে তোফায়েল আহমেদের মতো কিংবদন্তিদের পরিমাপ করা যায় না। স্থান বা আনুষ্ঠানিকতার সংকীর্ণতা দিয়ে তাঁর বিশালত্বকে ম্লান করার সাধ্য কারও নেই। তিনি এ দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে থাকবেন।

তবে সরকারের এই ক্ষমাহীন উদ্যোগহীনতা এবং মানসিক দেউলিয়াত্বের খতিয়ান ইতিহাসের আঙিনায় এক চরম ধিক্কার হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে। বীরদের সম্মান দিতে না জানা জাতি যে নতুন কোনো বীরের জন্ম দিতে পারে না— রাজনীতির এই মহীরুহের বিদায়লগ্নে এই চিরন্তন সত্যটিই যেন আজ আবারও প্রমাণিত হলো।


লেখক : গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতি কর্মী

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow