দাবি নিষ্পত্তিতে গতি আনতে না পারলে বিমা খাতে আস্থা ফিরবে না

জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা থাকলেও নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিমা খাত এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহকের আস্থার সংকট, সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবার অভাবের কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিমা খাতের অবদান এখনো খুবই সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির আকার যত বাড়ছে, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় দেশের বিমা খাত আধুনিকায়নের গতি এখনো ধীর। ফলে ব্যক্তি, ব্যবসা ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার বড় একটি অংশ অনাবিষ্কৃত থেকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং উদ্ভাবনী বীমা পণ্য চালুর মাধ্যমে খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, পলিসি ইস্যু থেকে শুরু কর

দাবি নিষ্পত্তিতে গতি আনতে না পারলে বিমা খাতে আস্থা ফিরবে না

জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা থাকলেও নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিমা খাত এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহকের আস্থার সংকট, সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবার অভাবের কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিমা খাতের অবদান এখনো খুবই সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির আকার যত বাড়ছে, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বিমার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় দেশের বিমা খাত আধুনিকায়নের গতি এখনো ধীর। ফলে ব্যক্তি, ব্যবসা ও বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার বড় একটি অংশ অনাবিষ্কৃত থেকে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিমা খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং উদ্ভাবনী বীমা পণ্য চালুর মাধ্যমে খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, পলিসি ইস্যু থেকে শুরু করে আন্ডাররাইটিং, এনডোর্সমেন্ট ও ক্লেইম স্যাটেলমেন্ট পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগও জরুরি।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, দেশের বিমা খাতকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই করতে প্রচলিত পরিপালন-ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থায় উত্তরণ এখন অত্যন্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিমা খাতের সার্বিক উন্নয়নে দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে আইডিআরএ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে।

আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর প্রস্তুতির পাশাপাশি বিমা প্রতিষ্ঠানের মূলধন সক্ষমতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনে বিমাকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে বীমা খাতকে শুধু একটি আর্থিক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটিকে জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন,  আন্তর্জাতিকভাবে বিমা খাতের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে দ্রুত ও স্বচ্ছ ক্লেইম নিষ্পত্তির ওপর। বাংলাদেশেও যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খাতটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সাকিফ শামীম বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ সরাসরি জনগণের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়। একটি কার্যকর ইউনিভার্সাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করা গেলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ বীমার আওতায় আসবে, ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তার মতে, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতাল, বিমা কোম্পানি, ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এবং ইনসুরটেক স্টার্টআপগুলোর মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ অবকাঠামো তৈরি করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি হবে। শুধু স্বাস্থ্যবীমা নয়, কৃষিবিমা, জলবায়ু ঝুঁকি বিমা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বিমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবিলায় আধুনিক বিমা পণ্য চালু করা সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যেহেতু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, তাই এই খাতে বিশেষায়িত বিমা পণ্য অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিমা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা ও উদ্ভাবনী পণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বিমা বাজার পুরোপুরি নির্ভর করবে স্বয়ংক্রিয় গ্রাহকসেবা এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সমাধানের ওপর। তাই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে ডিজিটালাইজড আন্ডাররাইটিং, অটোমেটেড ক্লেইম প্রসেসিং এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, গ্রাহকসেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পলিসি গ্রহণ, নবায়ন, প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং দাবি নিষ্পত্তি করা গেলে গ্রাহকের সময় ও ব্যয় দুটিই কমবে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিমা পণ্য, সাইবার ইন্স্যুরেন্স, সাপ্লাই চেইন প্রোটেকশন এবং নতুন ঝুঁকিভিত্তিক বীমা সেবা চালুর মাধ্যমে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতারণা কমানো এবং সেবার মান উন্নয়ন করা সম্ভব।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow