জীবনের পথে সব সময় বসন্ত নামে না। কখনো জীবন অনিশ্চয়তার কালো মেঘে ঢেকে যায়, এমনকি একসময় মানুষ অনুভব করে—দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর কোনো পথ নেই। ঋণের চাপ, চাকরি হারানোর টেনশন, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, অসুস্থতা, অর্থকষ্ট কিংবা ব্যর্থতার যন্ত্রণা মানুষকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন কখনো চূড়ান্তভাবে নিরাশ হয় না। কারণ সে জানে, মানুষের সব দরজা বন্ধ হলেও আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার: ৫৩)
এ আয়াত মুমিনের হৃদয়ে আশার দীপ জ্বালায়। যে রব মৃত জমিনে বৃষ্টি নামিয়ে প্রাণ ফিরিয়ে দেন, তিনিই ভাঙা হৃদয়েও শান্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম। বিপদের অন্ধকার যত গভীরই হোক, আল্লাহর সাহায্য তত নিকটবর্তী। এমন চারটি কার্যকর আমল রয়েছে, যা সংকটময় সময়ে আল্লাহর সাহায্য লাভের বিশেষ মাধ্যম।
১. দরূদ শরিফ
দরূদ পাঠ কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি রহমত নাজিলের অন্যতম দরজা। যাদের হৃদয় অস্থিরতা ও অজানা ভয়ে ভরে থাকে, দরূদের ধারাবাহিক আমল সেই হৃদয়ে শান্তির শিশির বর্ষণ করে।
উবাই ইবন কাব (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার ওপর অনেক দরূদ পাঠ করি। আমার দোয়ার কতটুকু অংশ আপনার ওপর দরূদ পাঠের জন্য নির্ধারণ করব? তিনি (সা.) বললেন, তোমার যত ইচ্ছে। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ?’ তিনি (সা.) বললেন, তোমার যত ইচ্ছে; তবে যদি আরও বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তোমার যত ইচ্ছে; তবে যদি আরও বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, দুই-তৃতীয়াংশ? তিনি (সা.) বললেন, তোমার যত ইচ্ছে; তবে যদি আরও বাড়াও, তা তোমার জন্য উত্তম। আমি বললাম, তাহলে আমি আমার পুরো দোয়াই আপনার ওপর দরূদ পাঠে ব্যয় করব? তিনি বললেন, তাহলে তোমার সব দুশ্চিন্তা দূর করা হবে এবং তোমার গোনাহ ক্ষমা করা হবে। (তিরমিজি :২৪৫৭)
২. ইস্তিগফার
অনেক সময় আমাদের অজানা গোনাহই সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইস্তিগফার বান্দাকে তার রবের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায় এবং তার সংকট ও দুশ্চিন্তা দূর করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সবসময় ইস্তেগফার করে তথা ক্ষমা চায়, আল্লাহ তাআলা তার জন্য প্রত্যেক সংকীর্ণতা হতে বের হয়ে আসার পথ খুলে দেন এবং প্রত্যেক দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত করেন। আর তাকে এমন রিজক দান করেন, যা সে কখনো ভাবতেও পারেন। (আবু দাউদ :১৫১৮)
বিভিন্ন শব্দে ইস্তেগফার পড়া যেতে পারে। যথা: আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জানবিন ওয়া আতুবু ইলাইহি, রব্বিগফিরলি ওয়াতুব আলাইয়া ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুর রহীম, সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার।
৩. দোয়ায়ে ইউনুস
যখন আকাশ নেই, আলো নেই, আশ্রয় নেই—তখনও আল্লাহ আছেন। ইউনুস (আ.)-এর জীবন তার উজ্জ্বল প্রমাণ। দোয়ায়ে ইউনুস হলো, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
আল্লাহ বলেন, অতঃপর (এই দোয়া পাঠ করার পর) আমি তাকে দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি। (সুরা আম্বিয়া: ৮৮)
এখানে শুধু ইউনুস (আ.)-এর মুক্তির কথা নয়; বরং প্রত্যেক মুমিনের জন্য সুসংবাদ রয়েছে।
৪. ইয়া জাল-জালালি ওয়াল ইকরাম (রবের নামে প্রার্থনা)
এটি আল্লাহর এক মহান নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা ‘ইয়া জাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম’ (হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী)— এই দোয়াটির মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করো। (মুসনাদে আহমাদ: ১৭৫৯৬)
এই জিকির বান্দাকে মনে করিয়ে দেয়, যার কাছে চাচ্ছি, তিনি মহিমা ও সম্মানের অধিকারী; তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিছু নেই। মনে রাখতে হবে, কখনো কখনো দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শাস্তি নয়, এটি হতে পারে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আহ্বান; যাতে বান্দা সব কৃত্রিম ভরসা ছেড়ে কেবল তাঁর দিকেই ফিরে আসে। অতএব, বিপদে ভেঙে পড়বেন না। দরূদ, ইস্তিগফার, দোয়ায়ে ইউনুস ও ‘ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম’- এর জিকিরে আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন।
লেখক: শরিয়াহ কনসালট্যান্ট