দেরিতে এলো সাশ্রয়ী মাংস-দুধের গাড়ি, ফিরে গেলেন অধিকাংশ ক্রেতা
সকাল ১০টা। কাকরাইল মোড়ের সোহাগ হোটেলের সামনে তখনও ১৫ থেকে ২০ জন নারী-পুরুষ। তাদের মধ্যে কেউ ঘণ্টাখানেক আগে এসেছেন। কেউ তড়িঘড়ি করে পৌঁছেছেন অল্প আগেই। সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, মাংস বিক্রির গাড়ির আসবে বলে। এখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সামনে একই পণ্যের আরেক বিক্রির স্থান। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ দুই জায়গায়ই মানুষের উপস্থিতি বেড়ে প্রায় ৩০-৪০ জন হয়ে গেলো। প্রতিদিন এ সময়ের মধ্যেই পণ্য বিক্রির গাড়ি চলে আসে। কিন্তু বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তখনও গাড়ির দেখা নেই। কিছুক্ষণ পর থেকে উপস্থিত মানুষের মধ্যে কথাবার্তা বাড়ছে। একে অপরের কাছে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সবাই জানতে চাচ্ছেন আজ গাড়ি কখন আসবে, আদৌ আসবে কি না? গাড়ির অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ, সকাল ১০টা সেখানে উপস্থিত থেকে সবার কথাবার্তায় বোঝা গেলো, বেশিরভাগ দিনই সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে সেখানে গাড়ি আসে। এরপর মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে গাড়িতে থাকা সব পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যান অনেকে। তাই ৯টার পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ক্রেতা
সকাল ১০টা। কাকরাইল মোড়ের সোহাগ হোটেলের সামনে তখনও ১৫ থেকে ২০ জন নারী-পুরুষ। তাদের মধ্যে কেউ ঘণ্টাখানেক আগে এসেছেন। কেউ তড়িঘড়ি করে পৌঁছেছেন অল্প আগেই। সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম, মাংস বিক্রির গাড়ির আসবে বলে।
এখান থেকে আধা কিলোমিটার দূরে সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সামনে একই পণ্যের আরেক বিক্রির স্থান। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ দুই জায়গায়ই মানুষের উপস্থিতি বেড়ে প্রায় ৩০-৪০ জন হয়ে গেলো। প্রতিদিন এ সময়ের মধ্যেই পণ্য বিক্রির গাড়ি চলে আসে। কিন্তু বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তখনও গাড়ির দেখা নেই।
কিছুক্ষণ পর থেকে উপস্থিত মানুষের মধ্যে কথাবার্তা বাড়ছে। একে অপরের কাছে খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সবাই জানতে চাচ্ছেন আজ গাড়ি কখন আসবে, আদৌ আসবে কি না?
গাড়ির অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ, সকাল ১০টা
সেখানে উপস্থিত থেকে সবার কথাবার্তায় বোঝা গেলো, বেশিরভাগ দিনই সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে সেখানে গাড়ি আসে। এরপর মাত্র এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে গাড়িতে থাকা সব পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যান অনেকে। তাই ৯টার পর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন ক্রেতারা। আজও সেটা হয়েছে। কিন্তু বেলা ১১টা বেজে গেলেও কোনো গাড়ির দেখা মিললো না। একই অবস্থা পাশের সেগুনবাগিচায়ও।
শুরু হলো খালি হাতে ফিরে যাওয়া
বেলা ১১টার পরেও গাড়ি না আসায় সেখানে গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা শুরু হলো। এর বড় কারণ গাড়ি আদৌ আসবে কি না সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। একজন-দুজন করে ফিরে যেতে শুরু করলেন এরপর।
গাড়ি ১১টায় আসায় অনেকে ফিরে গেছেন, বেলা ১১টা
কিছুক্ষণের মধ্যে লাইন ভেঙে অনেকে আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করলেন। কারও কারও বাড়ি কিংবা কর্মস্থলও আশপাশে। তারা পণ্যের গাড়ি এলে অন্যদের জানানোর অনুরোধ জানিয়ে চলে গেলেন। একজন আরেকজনকে ফোন নম্বরও দিয়ে গেলেন ডাকার জন্য।
১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে কাকরাইলের ওই জায়গায় মানুষের সংখ্যা কমে ৭ থেকে ৮ জনে নেমে এলো। একইভাবে তখন কমে গেছে সেগুনবাগিচার গাড়ির জন্য অপেক্ষমাণ লোকজনও।
তখনও দাঁড়িয়ে থাকা মেহেদী হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, দুই ঘণ্টা যখন দাঁড়িয়েছিই, আর কিছুক্ষণ থাকি। এমন সাধারণত হয় না। ১০টার মধ্যে গাড়ি চলে আসে। আজ নিশ্চয় কোনো সমস্যা হয়েছে।
পাশের একজন বলেন, গাড়ি আসবে কি আসবে না, সেটা নিশ্চিত হওয়া গেলেও সুবিধা হতো। রোজা রেখে এমন অপেক্ষা করা খুব কঠিন।
রমজানের এ সুলভ মূল্যে বিক্রি কার্যক্রম প্রথম রোজা থেকে চলছে। দাঁড়িয়ে থাকা মুন্নি বেগম বলেন, দেরি করে এলে গরুর মাংস পাই না। এজন্য কাজ ফেলে সকালে চলে এসেছি। সবাই চলে গেলো, কিন্তু গাড়ি এলো না।
তিনি বলেন, আমি দাঁড়িয়ে আছি, দেখি যদি এর মধ্যে গাড়ি আসে। তাহলে গরুর মাংস পাওয়া যাবে।
গাড়ি এলো সাড়ে ১১টার পর
খামারবাড়ি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে পণ্য নিয়ে এসব গাড়ি স্পটে এলো সাড়ে ১১টার পরে। কাকরাইলে এসেছে ঠিক ১১টা ৩৬ মিনিটে। সেগুনবাগিচায় ৫-১০ মিনিট আগে-পিছে হবে। যখন গাড়ি এলো তখন প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গ্রাহক পণ্য না নিয়ে খালি হাতে ফিরে গেছেন।
কিন্তু গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের অনেক মানুষ ছুটে এলেন। যারা আগে লাইনে ছিলেন না। আবার অনেক পথচারী পণ্য দেখে কিনতে এগিয়ে এলেন। নতুন-পুরোনো সবমিলে ১৫ থেকে ২০ জনের লাইন হয়ে গেলো আবারও।
পাশ থেকে ছুটে এসে এ সময় লাইনে দাঁড়িয়েছেন চায়ের দোকানি খালেক। তিনি বলেন, আজ দেখলাম দেরিতে গাড়ি আসায় লাইন ভেঙে লোক চলে গেছে। এখন লোক কম, তাই এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রায় প্রতিদিন ভাবি কিছু কিনবো। কিন্তু সময়মতো গাড়ি এলে অনেক লোক থাকে। অনেক বড় লাইন হয়। দোকান ছেড়ে এত সময় দেওয়া যায় না।
বিক্রি শুরু হতেই অপেক্ষার বিরক্তি ছাপিয়ে মুখে তৃপ্তির হাসি
প্রায় আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে যখন গাড়ি এলো, তখনও অনেক ক্রেতার মুখে তৃপ্তি দেখা গেলো। এমনকি, দ্রুত ও সুন্দরভাবে যেন বিক্রি কার্যক্রম শুরু হয় সেজন্য কিছু গ্রাহক নিজ হাতে পণ্য বিক্রির ব্যানার টাঙিয়ে দিলেন। কাউকে দেখা গেলো, যে টেবিল-চেয়ারে বসে বিক্রয় প্রতিনিধি বিক্রি কার্যক্রম চালাবেন, সেগুলো পেতে দিতে।
তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর পণ্য পেয়ে হাসি
গাড়ি প্রস্তুত ও বিক্রি কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগলো ১৫ থেকে ২০ মিনিট। এর মধ্যে কেউ প্রতিনিধিদের সহায়তায় ব্যস্ত। আবার কেউ দাম দেখে টাকার হিসাব মেলাচ্ছেন, কেউ খুচরা টাকার ব্যবস্থায় লেগে পড়েছেন।
এদিকে কাকরাইলের চেয়ে তখনও লোক কম সেগুনবাগিচায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, লাইন নেই, ক্রেতা তিন-চারজন, বেশিরভাগ ফিরে গেছেন। গাড়ি নিয়ে বিক্রেতারা বসে আছেন। কিছুক্ষণ পরপর চলতি পথে এক-দুজন ক্রেতা এসব পণ্য কিনছেন।
কিনতে পারলে সাশ্রয় কেমন
এ বিক্রি কার্যক্রমে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি (ড্রেসড-চামড়া ছাড়ানো) ২৪৫ টাকা, পাস্তুরিত দুধ ৮০ টাকা ও ৯৬ টাকায় এক ডজন ডিম কেনা যায়।
একজন ভোক্তা প্রতিটি গাড়ি থেকে ৬৫০ টাকায় ১ কেজি গরুর মাংস, ২৪৫ টাকায় চামড়া ছাড়া ব্রয়লার মুরগি, ৮০ টাকায় ১ লিটার পাস্তুরিত দুধ ও ৯৬ টাকায় ১ ডজন ডিম কিনতে পারছেন। এতে একজন ভোক্তার সব মিলিয়ে ১ হাজার ৭১ টাকা লাগছে। বাজার থেকে এসব পণ্য কিনতে আরও অন্তত ২০০ টাকা বেশি লাগতো।
কাকরাইলের ওই গাড়ির সামনে জিগাতলা থেকে এসেছেন রফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘কিছু টাকা সাশ্রয়ের জন্য এখানে এসেছি। অন্য কোথায় এসব পণ্য দেয় কি না জানি না। কাল এখানে গাড়ি দেখেছিলাম, আজ চলে এসেছি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শরিফুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘রমজান মাস উপলক্ষে সংস্থাটি ঢাকা শহরের ২৫টি গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে সুলভ মূল্যে এসব পণ্য বিক্রি করছে। ঢাকার বাইরেও অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা শহরে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ২৮ রমজান পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে।’
দেরি কেন হলো
স্বাভাবিক অন্যদিনের চেয়ে গাড়ি পৌঁছাতে দেরি হয়েছে বলে জানান শরিফুল হক। তিনি বলেন, ‘খামারবাড়ি থেকে গাড়িগুলো দেরিতে ছাড়তে হয়েছে। কারণ ডিম সরবরাহকারীরা ডিম পৌঁছাতে দেরি করেছেন। যে কারণে বিঘ্ন হয়েছে। অন্যদিন ১০টার মধ্যে সব স্পটে গাড়ি পৌঁছে যায়।
চাহিদার চেয়ে পণ্য কম
আজ দেরি করে গাড়ি এলেও চলতি পথের ক্রেতা কিন্তু সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কাকরাইলে গ্রাহকের তুলনায় গাড়িতে পণ্যের পরিমাণ কম। এতে অনেকেই বিক্রি শুরুর আধাঘণ্টা পর থেকে কাঙ্ক্ষিত পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। আবার সেগুনবাগিচায় গ্রাহকের উপস্থিতি কিছুটা কম। কারণ, ওই সব স্থান সম্পর্কে গ্রাহকরা জানতেনই না। যারা জানতেন, তারা ফিরে গেছেন।
পল্টন এলাকার বাসিন্দা মিনু আক্তার দুপুরে বাজারের জন্য যাচ্ছিলেন। সেগুনবাগিচায় অধিদপ্তরের গাড়ি পেয়ে গরু ও মুরগির মাংস এবং দুধ কেনেন। সেখানে তখন লাইন ছিল না। এসব পণ্য কিনতে তার সময় লেগেছে মাত্র তিন মিনিট। তিনি বলেন, প্রতিদিন লক্ষ্য রাখি, আজ হুট করে ফাঁকা পেলাম।
কাকরাইলে গাড়ির হিসাবরক্ষক শাওন বলেন, ‘আমাদের গাড়িতে গরুর মাংস ৯০ কেজি, মুরগি ৮০ কেজি, ১২০ লিটার দুধ ও ১ হাজার ৮০০ পিস ডিম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে এসব পণ্য শেষ হয়ে যায়।
অন্যদিন আসার আগেই ৪০-৫০ জনের একটা সারি থাকে। গাড়ি দাঁড়ানোর পর সেটি আরও দীর্ঘ হয়। আজ লোক কম, কারণ আসতে দেরি হয়েছে।
চাহিদা কত?
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকার ২৫ বিক্রয় কেন্দ্রে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার কেজি গরুর মাংস, ৫০ হাজার পিস ডিম, সাড়ে ৩ হাজার লিটার পাস্তুরিত দুধ, ২ হাজার কেজি চামড়া ছাড়া ব্রয়লার মুরগি বিক্রি করছে।
মুরগি ও ডিম দিয়ে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি), গরুর মাংস দিয়ে বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএফএ) ও দুধ দিয়ে দেশের কয়েকটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানসহ অন্য অংশীজন এবং প্রান্তিক খামারিরা।
বেশি চাহিদা গরুর মাংসের
৯০ কেজি গরুর মাংস নিয়ে আসা কাকরাইলের গাড়ির মাংস প্রথম ৩০-৪০ জনের মধ্যেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। কারণ গরুর মাংসে বাজারদরের চেয়ে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা সাশ্রয় হয়।
ষাটোর্ধ্ব মালেকা বেগম বলেন, দুদিন ঘুরেও মাংস পাই না। আধাঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার করেও কেনার সুযোগ পাইনি। গরুর মাংস বিক্রি শেষ গেছে। বাজারের দামে গরুর মাংস কিনে খেতে পারি না। এখানে একটু কমে দেয়, এজন্য আসছিলাম।
বিক্রি শুরুর অধাঘণ্টা পরে মালেকা বেগমের মতো আরও অন্তত ৩০ জন মানুষ গরুর মাংস কিনতে পারেননি। আবার অনেকে আসছেন শুরু গরুর মাংস কিনতে, যারা অন্য পণ্য নিতে চান না। তাদের শুধু মাংস বিক্রি করা হয় না প্যাকেজ ছাড়া।
উপ-পরিচালক শরিফুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘মাংসের চাহিদা সব সময় বেশি সেটা ঠিক। তবে মাংস সোর্সিং, কোল্ড চেইন মেনটেইন করা কঠিন। আগের চেয়ে মাংসের বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। তবে খুব পর্যাপ্ত এখনো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এনএইচ/এএসএ
What's Your Reaction?