সরকারি টেন্ডার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সহজ করতে চালু হওয়া ই-জিপি (e-Government Procurement) ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। শুধু ই-জিপিই নয়, প্রভাব খাটিয়ে সরকারের আরও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও দপ্তরেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে দোহাটেক নিউ মিডিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক এ কে এম সামসুদ্দোহা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ) সাবেক সিপিটিইউর অধীনে পরিচালিত ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১৬ বছর ধরে একই বলয়ের আধিপত্য রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, দোহাটেকের মালিক এ কে এম সামসুদ্দোহা দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক সালমান এফ রহমান-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত। সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গেও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে তার, যা এই প্রভাববলয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে এ কে এম সামসুদ্দোহা ও সালমান এফ রহমানের নাম একসঙ্গে আলোচিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। একই সঙ্গে ‘গ্লোবাল ভয়েস ভিওয়াইপি’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে তাদের যৌথ মালিকানা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ই-জিপি চালুর পর থেকে গত প্রায় ১৬ বছরে এমন কোনো বড় কাজ দেওয়া হয়নি, যেখানে এই গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নেই। সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে পরিকল্পিতভাবে একই গোষ্ঠী কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছে। এমনকি বিশ্বব্যাংকের নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদে একই প্রতিষ্ঠানের একক আধিপত্য নিরুৎসাহিত করা হলেও, দোহাটেক নাম পরিবর্তন করে ‘eGP STAR’ নামে একই প্রকল্পে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া, পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প e-PMIS-এ শুরুতে বেক্সিমকো ও দোহাটেক যৌথভাবে কাজ করলেও পরবর্তীতে বেক্সিমকোর নাম বাদ দিয়ে এককভাবে দোহাটেককে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একইভাবে সাইবার সিকিউরিটি মনিটরিংয়ের নামে গিগাটেক লিমিটেডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগেও এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে। পাশাপাশি অতীতের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, এমনকি শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিতর্কেও এই গোষ্ঠীর নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানা যায়।
দোহাটেকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ই-জিপি সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে।
একাধিক সূত্রের দাবি, দোহাটেকের প্রজেক্ট ম্যানেজার নাজমুল হোসেন এবং তার ঘনিষ্ঠদের কাছেই সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ পাসওয়ার্ড ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেন্ডারের দর আগেভাগেই ফাঁস করে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই অনিয়মের মাধ্যমেই স্বল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন তারা। এ ছাড়া সফটওয়্যার উন্নয়নের তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণে বেশি খরচ দেখানো, প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনা—এসব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে এমনিতেই জবাবদিহি কমে যায়, আর সেটাই এখানে ঘটছে।
দোহাটেকের কাজ বিষয়টি শুধু ই-জিপিতে আটকে নেই। পরিকল্পনা কমিশনের আইএমইডি বিভাগের e-PMIS প্রকল্পে শুরুতে বেক্সিমকোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করলেও পরে একাই দায়িত্ব পায় দোহাটেক। এ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্যব্যবস্থা, রাজউকের অনলাইন অনুমোদন সিস্টেম, আরজেএসসি’র ডিজিটাল কার্যক্রম—এসব জায়গাতেও তাদের কাজ রয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সিস্টেমগুলোর বড় একটি অংশ এক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সব মিলিয়ে দোহাটেকের প্রভাব শুধু একটি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে। সামনে জুন ২০২৬-এ ই-জিপি প্রকল্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তাই এখনই স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না গেলে একই চিত্র আবারও ফিরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ, সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থা শুধু অর্থের বিষয় নয়।এটি জবাবদিহি ও সুশাসনের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।