নজরুলের সাংবাদিকতা ও আজকের গণমাধ্যমের বন্দিদশা
১৯২২ সালের কলকাতা। ব্রিটিশ শাসনের কড়া নজরদারির মধ্যে একটি ছোট্ট পত্রিকা বের হলো—নাম ‘ধূমকেতু’। নামের মধ্যেই যেন বিদ্রোহের আগুন। সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য।’ খুব দ্রুতই পত্রিকাটি তরুণ সমাজ, বিপ্লবী চেতনা ও ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্রে পরিণত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বুঝেছিল, এই কাগজ কেবল সাহিত্যচর্চার জন্য নয়; এটি মানুষের ভেতরে স্বাধীনতার আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলাফল—পত্রিকা বাজেয়াপ্ত, সম্পাদক গ্রেফতার, মামলা ও কারাবরণ। এক শতাব্দী পরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—সময় কি সত্যিই বদলেছে? নাকি কেবল শাসকের ভাষা বদলেছে, কিন্তু সত্য বলার শাস্তি একই রয়ে গেছে? আমরা সাধারণত নজরুলকে বিদ্রোহী কবি হিসেবেই স্মরণ করি। অথচ তাঁর সাংবাদিক পরিচয় ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। গবেষক অর্ক দেব তাঁর Kazi Nazrul Islam’s Journalism গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নজরুলের সাংবাদিকতা মূলত ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই পত্রিকাগুলো কেবল সাহিত্যপত্র ছিল না; এগুলো ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারালো সামাজিক ভাষ্য। ক
১৯২২ সালের কলকাতা। ব্রিটিশ শাসনের কড়া নজরদারির মধ্যে একটি ছোট্ট পত্রিকা বের হলো—নাম ‘ধূমকেতু’। নামের মধ্যেই যেন বিদ্রোহের আগুন। সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য।’ খুব দ্রুতই পত্রিকাটি তরুণ সমাজ, বিপ্লবী চেতনা ও ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলনের মুখপত্রে পরিণত হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বুঝেছিল, এই কাগজ কেবল সাহিত্যচর্চার জন্য নয়; এটি মানুষের ভেতরে স্বাধীনতার আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলাফল—পত্রিকা বাজেয়াপ্ত, সম্পাদক গ্রেফতার, মামলা ও কারাবরণ।
এক শতাব্দী পরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—সময় কি সত্যিই বদলেছে? নাকি কেবল শাসকের ভাষা বদলেছে, কিন্তু সত্য বলার শাস্তি একই রয়ে গেছে?
আমরা সাধারণত নজরুলকে বিদ্রোহী কবি হিসেবেই স্মরণ করি। অথচ তাঁর সাংবাদিক পরিচয় ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। গবেষক অর্ক দেব তাঁর Kazi Nazrul Islam’s Journalism গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নজরুলের সাংবাদিকতা মূলত ‘নবযুগ’, ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই পত্রিকাগুলো কেবল সাহিত্যপত্র ছিল না; এগুলো ছিল ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারালো সামাজিক ভাষ্য।
কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতা শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি বর্তমানের জন্যও একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা। একটি সমাজে সাংবাদিক যদি স্বাধীন না থাকেন, তাহলে নাগরিকও শেষ পর্যন্ত স্বাধীন থাকেন না। কারণ সংবাদমাধ্যম কেবল খবর পরিবেশন করে না; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝখানে সত্যের সেতুবন্ধন তৈরি করে। সেই সেতু দুর্বল হয়ে গেলে গুজব বাড়ে, জবাবদিহিতা কমে এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
‘নবযুগ’-এ নজরুল লিখেছেন অস্পৃশ্যতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বিস্ফোরক সাংবাদিকতার প্রকাশ ঘটে ‘ধূমকেতু’-তে। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট প্রকাশিত এই দ্বিসাপ্তাহিক পত্রিকা দ্রুতই ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম কণ্ঠে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও পত্রিকাটিকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন—‘আয় চলে আয় রে ধূমকেতু।’ যেন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই পত্রিকা নিছক সাহিত্যচর্চার জন্য আসেনি; এটি এসেছে জমাটবাঁধা ভয় ভেঙে দিতে।
নজরুল তাঁর সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘ধূমকেতু কোনো সাম্প্রদায়িক কাগজ নয়, মানুষের কাগজ।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর সাংবাদিকতার দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর মুখপাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।
ব্রিটিশ সরকার খুব দ্রুতই তাঁর লেখনীর শক্তি উপলব্ধি করে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের পর নজরুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। ১৯২৩ সালে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু কারাগারে গিয়েও তিনি নীরব হননি। তাঁর ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ বাংলা ভাষার রাজনৈতিক সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতারও এক ঐতিহাসিক দলিল। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি সত্য প্রকাশের যন্ত্র।’ এই বাক্যটি আজও সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী নৈতিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
‘ধূমকেতু’-র পর তিনি সম্পাদনা করেন ‘লাঙল’। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ছিল শ্রমিক ও কৃষকের মুখপত্র। পত্রিকার প্রচ্ছদে লাঙল কাঁধে কৃষকের ছবি ছাপা হতো। প্রথম সংখ্যায়ই নজরুল ‘সাম্যবাদী’ শিরোনামে ১১টি কবিতা প্রকাশ করেন। তিনি বুঝেছিলেন, সাংবাদিকতা যদি কেবল শহুরে অভিজাতদের ভাষা হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী নীরব থেকে যাবে। তাই তিনি কলমকে সরাসরি শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে নজরুলের সাংবাদিকতাকে নতুন করে স্মরণ করার কারণ এখানেই। কারণ বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে, অনেকে দীর্ঘদিন জামিন ছাড়াই কারাগারে আছেন, আবার অনেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের চিত্র এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও বিস্তৃত সংকটের রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই দেশে ৪১২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন সাংবাদিক গ্রেফতার, ১৬৮ জনের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল এবং শতাধিক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপেরই ইঙ্গিত দেয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১,০৭৩ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন। কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি এক বিস্তৃত ভয়ের পরিবেশের প্রতিচ্ছবি।
একই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয় ২০২৫ সালের হিসাবেও। দৈনিক কালের কণ্ঠের ১৮ মে’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর ৬২২ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৪৫৮ জনের ওপর হামলা, ১৪০ জনকে হত্যা মামলায় জড়ানো, ২১ জনকে নাশকতা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং একজন সাংবাদিক প্রাণ হারান। এই সংখ্যা শুধু ঘটনার পুনরাবৃত্তি নয়; বরং সাংবাদিকতার মাঠে ক্রমশ বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
এর আগের ধাপেও সহিংসতার চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে ১৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় ৮৫ জন হামলার শিকার হন, ৩১ জনকে হত্যা মামলায়, ১০ জনকে হত্যাচেষ্টার মামলায় এবং ১৬ জনকে নাশকতা মামলায় জড়ানো হয়। একই সময়ে পাঁচজন সাংবাদিক নিহত হন, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়েও এই প্রবণতা থেমে থাকেনি। মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফের তথ্যমতে, এই সময়ে ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন হামলার শিকার এবং তিনজন হত্যা মামলার আওতায় পড়েছেন।
এসব পরিসংখ্যান আলাদা আলাদা সংখ্যা হলেও, মিলিয়ে দেখলে একটি স্পষ্ট চিত্র সামনে আসে—সাংবাদিকতা আজ কেবল তথ্য সংগ্রহের পেশা নয়, বরং ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও চাপের এক বাস্তবতা। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং অনেক ক্ষেত্রে নীরব হয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানির যে অভিযোগ উঠছে, তা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এটি গণতান্ত্রিক চর্চার মৌলিক কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তোলে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব থেকে দায়ের হওয়া বহু মামলায় অযৌক্তিকভাবে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিকের নাম যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একদিকে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তাঁর মতে, এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ‘মামলা বাণিজ্য’ ও ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’ উদ্বেগজনকভাবে বিস্তার লাভ করেছে, যা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলতার প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে আবেগ ও প্রতিশোধপরায়ণতার জায়গা থেকে মামলা করা হচ্ছে—এমন মন্তব্য করে তিনি সতর্ক করেন যে, এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত।
অন্যদিকে, এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয়টি নিয়ে সম্পাদক পরিষদের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানান, এসব মামলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন।
১৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অংশ নেন মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান চৌধুরী ও নুরুল কবিরসহ সম্পাদক পরিষদের নেতারা। তাঁরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন এবং গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপ না থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের অংশ, নাকি তা কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রতিফলন?
সাংবাদিকতার বিশ্ব পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩৩০ জন সাংবাদিক কারাগারে ছিলেন। অর্থাৎ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এখন আর কোনো একক দেশের সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক গণতন্ত্রের এক গভীর অসুখ।
তবে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে নজরুলের সময়ের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। ব্রিটিশ শাসক ছিল দৃশ্যমান ঔপনিবেশিক শক্তি। আজকের রাষ্ট্রগুলো নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করলেও অনেক সময় সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখে। ফলে দমননীতি এখন আরও জটিল ও সূক্ষ্ম। এটি অনেক সময় আইন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কিংবা ডিজিটাল শৃঙ্খলার ভাষায় সামনে আসে।
এই পরিস্থিতিতে মুক্ত সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও সমাজ—তিন পক্ষের মানসিক পরিবর্তন। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখা শুরু হলে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপননির্ভর ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীন থাকতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন পাঠক-সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ফাউন্ডেশন মডেল এবং অলাভজনক সংবাদমাধ্যম জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে আর্থিক স্বাধীনতা অপরিহার্য।
সাংবাদিক সমাজের ভেতরেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ভুয়া তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, অতিরঞ্জন ও হলুদ সাংবাদিকতা গণমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। জনগণের আস্থা হারালে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার দাবিও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই স্বাধীনতার পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও জরুরি।
নজরুলের সাংবাদিকতা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—সত্য বলা কখনো সহজ ছিল না, আজও নয়। তিনি জানতেন, তাঁর লেখার জন্য কারাগার অপেক্ষা করছে। তবু তিনি লিখেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে সাংবাদিকতা ছিল ক্ষমতার প্রশংসা নয়; মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্ব।
আজ যখন কোনো সাংবাদিক সত্য প্রকাশের আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হন, যখন মামলা ও গ্রেফতারের ভয় সংবাদকক্ষের ভেতরে নীরবতা তৈরি করে, তখন নজরুলের সেই অগ্নিঝরা কলম আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে শেখায়—সাংবাদিকতা কি কেবল পেশা, নাকি এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব?
তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি চিরবিদ্রোহী বীর।’ এই বিদ্রোহ কেবল কবিতার অলংকার ছিল না; এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক অবস্থান। সেই অবস্থানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশগুলোর একটি ছিল তাঁর সাংবাদিকতা।
একটি সমাজে সাংবাদিক যদি স্বাধীন না থাকেন, তাহলে নাগরিকও শেষ পর্যন্ত স্বাধীন থাকেন না। কারণ সংবাদমাধ্যম কেবল খবর পরিবেশন করে না; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝখানে সত্যের সেতুবন্ধন তৈরি করে। সেই সেতু দুর্বল হয়ে গেলে গুজব বাড়ে, জবাবদিহিতা কমে এবং গণতন্ত্র ধীরে ধীরে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিকতা তাই শুধু অতীতের ইতিহাস নয়; এটি বর্তমানের জন্যও একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক নির্দেশনা। তাঁর কলম আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্ত সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি সভ্য সমাজের অস্তিত্বের শর্ত।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম
What's Your Reaction?