ঈদে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। গার্মেন্টস ও বিভিন্ন বেসরকারি কলকারখানায় ছুটি হওয়ায় চট্টগ্রাম নগর ছাড়ছে লাখো বাসিন্দা। কিন্তু উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার খ্যাত চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ যানজট।
গতকাল সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা আজ মঙ্গলবারও (২৬ মে) সমানতালে চলছে। তীব্র যাত্রীচাপ, মহাসড়কের পাশে পশুর হাট, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং বৃষ্টিতে স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো সড়ক।
চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কটি খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং চট্টগ্রামের উত্তর অংশের ৪টি প্রধান উপজেলায় যাতায়াতের একমাত্র রুট। চট্টগ্রাম নগরে বসবাসকারী ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী ও শিক্ষার্থীদের একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এবারের তীব্র যানজটের মূল অনুঘটক সড়ক ঘেঁষে বসা কোরবানির পশুর হাট। একদিকে অক্সিজেন-মুরাদপুর সড়কের বিবিরহাট গরুর বাজার, অন্যদিকে অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়কের চৌধুরীহাট গরুর বাজার। এই দুই বৃহৎ বাজারে গরু আনা-নেওয়ার কারণে পুরো মহাসড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে সড়কের ওপর ভাসমান দোকান, ফুটপাত দখল এবং গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এই ভোগান্তিকে আরো দ্বিগুণ করেছে।
মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমান বাজা চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কে অবস্থিত। ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে শত শত যানবাহন। বৃষ্টির মধ্যেই পরিবার, পরিজন আর ব্যাগ, পত্র নিয়ে হাজারো মানুষ সড়কের পাশে চাতক পাখির মতো গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো উপায় না দেখে অনেক যাত্রীকে পণ্যবাহী গরুর গাড়িতে ২০ টাকা ওঠানামা ভাড়ায় যাতায়াত করতে দেখা গেছে। এতে বিপদে পড়েছেন নারী যাত্রীরা।
অসুস্থ মাকে দেখতে সীতাকুণ্ড থেকে গত সোমবার আমান বাজারে বাপের বাড়ি এসেছিলেন শাপলা শর্মা। আজ শ্বশুরবাড়ির জরুরি ডাকে দ্রুত ফিরে যাওয়ার কথা। আমান বাজার থেকে বড়দীঘির পাড় হয়ে ভাটিয়ারি দিয়ে তাঁর সীতাকুণ্ড যাওয়ার কথা ছিল। সাধারণ সময়ে আমান বাজার থেকে বড়দীঘির পাড় যেতে সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট, লোকাল সিএনজি ভাড়া ১০ টাকা। কিন্তু শাপলা শর্মা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো গাড়ি পাননি। বাধ্য হয়ে অসুস্থ শরীর আর মানসিক চাপ নিয়ে হেঁটেই রওনা দেন তিনি।
অন্যদিকে, হাটহাজারী যাওয়ার জন্য আমান বাজারে ১ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন অধীর নামের এক যাত্রী। দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি সিএনজি অটোরিকশা পেলেও চালক ভাড়া দাবি করেন ৮০০ টাকা। যেখানে স্বাভাবিক সময়ে রিজার্ভ ভাড়া ২০০-২৫০ টাকা এবং লোকাল ভাড়া মাত্র ৩০-৪০ টাকা।
বড়দীঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা সায়মন খান ক্ষোভ প্রকাশ করে কালবেলাকে বলেন, সড়কের পাশে হাট হওয়ায় ব্যাপারীরা সড়কের ওপরেই গরু রেখে দিচ্ছেন। ফলে গাড়ি চলার কোনো জায়গা নেই। এই যানজট তো হবেই।
সবচেয়ে বেশি জটলা যেখানে
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের বটতল, বালুছড়া, আমান বাজার, বড়দীঘির পাড়, ফতেয়াবাদ এবং নন্দিরহাট এলাকায় যাত্রীদের চাপ ও যানজট সবচেয়ে বেশি। ফতেয়াবাদ ও চৌধুরীহাটের জ্যামের রেশ গিয়ে ঠেকছে নগরের অক্সিজেন পর্যন্ত।
এর মধ্যে যোগ হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীদের চাপ। ২৮ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ এই মহাসড়ক ব্যবহার করে বাড়ি ফিরছে। ফলে স্টেশন ও সড়কগুলোতে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভিড় ও ভোগান্তিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
চট্টগ্রাম-হাটহাজারী মহাসড়কের অক্সিজেন থেকে নতুনপাড়া অংশটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) আওতাধীন। জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম বলেন, আমাদের পুলিশ ফোর্স সড়কে যানজট নিরসনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। মূলত মহাসড়কের পাশে গরুর হাটের কারণে কিছুটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি।
এদিকে মহাসড়কের এই তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে টানা চার ঘণ্টা হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ ও চৌধুরীহাট এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও র্যাব-৭। অভিযান চলাকালে সড়ক দখল করে অবৈধ হাট বসানোর দায়ে বিপুল অংকের জরিমানা এবং চাঁদা আদায়ের সময় হাতেনাতে এক চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের এতসব তৎপরতার পরও আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত মহাসড়কে যানজটের তীব্রতা কমেনি।
মহাসড়ক সচল রাখতে পুলিশের বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান সম্পর্কে জানতে চাইলে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমরা সড়কে কঠোর অ্যাকশন নিচ্ছি এবং আজকেও বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছি। আমাদের স্পষ্ট বার্তা রাস্তায় যানজট বা জটলা সৃষ্টি করে কোনোভাবেই গরু লোড আনলোড করা যাবে না। এমনকি পণ্যবাহী ট্রাকও যত্রতত্র লোড আনলোড নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা রাস্তা সম্পূর্ণ ক্লিয়ার রেখে ব্যবসা করবেন। সবাই সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করুক সেটাই আমাদের কাম্য, তবে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা বা জনভোগান্তি সৃষ্টি করে কোনো ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বাড়ি ফেরার বিষয়ে ওসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে গাড়ি পেয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে এবং পথে কোনো ধরনের চুরি বা ছিনতাইয়ের শিকার না হয়, সেজন্য পুলিশের বিশেষ নজরদারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অবৈধ পশুর হাট এবং সড়ক দখলকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন বলেন, ফতেয়াবাদ ও চৌধুরীহাট এলাকার মূল সড়কের পাশে প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই অনেকে অবৈধভাবে পশুর হাট বসিয়েছে। আজকের অভিযানে আমরা এ ধরনের ইজারাদারদের কঠোর জরিমানা করেছি। এর মধ্যে একজনকে ১ লাখ টাকা এবং অপরজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে অবৈধভাবে চাঁদা তোলার সময় ৫ হাজার ৭৩৫ টাকাসহ এক চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষ যেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি। এই ভোগান্তি কমাতে আমাদের পরবর্তী টোটাল অ্যাকশন প্ল্যান ও অভিযানের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুতই গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।