নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ আটকে দিচ্ছে ‘ডুবোচর’, ভরা মৌসুমেও আকাল

জুন থেকে অক্টোবর মাস ইলিশের প্রধান ভরা মৌসুম। এই সময়ে নদ-নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ার কথা বড় আকারের ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। তবে বাস্তব চিত্র পুরোই ভিন্ন। ভরা মৌসুম শুরু হলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। দিনভর নদীতে জাল ফেলেও জেলেদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। এ কারণে একসময় হাঁকডাকে মুখর বরিশালের প্রধান ইলিশ মোকামজুড়ে এখন চলছে সুনসান নীরবতা। নদ-নদীতে ইলিশ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ডুবোচর’। নদীর প্রবেশ পথে চর জেগে ওঠায় সাগর থেকে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। এজন্য নদী শাসন জরুরি বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ। শুক্রবার (০২ জুন) দুপুরে সরেজমিনে বরিশাল নগরীর পোর্টরোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ আড়তে তালা ঝুলছে না। ঘাটে নেই ইলিশের ট্রলার। ব্যস্ততা নেই মৎস্য শ্রমিকদের। হাতেগোনা কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা বসে আছেন মাছের পসরা সাজিয়েছে। তার মধ্যে তিনজন ইলিশ বিক্রি করছেন। তাও আবার ক্রেতাশূন্য। পোর্টরোড শহীদ জিয়াউর রহমান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, তাদের আড়তে মোট ১৭০ জন আড়তদার আছেন। আগে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার মণ ইলিশ

নদ-নদীতে ইলিশের বিচরণ আটকে দিচ্ছে ‘ডুবোচর’, ভরা মৌসুমেও আকাল

জুন থেকে অক্টোবর মাস ইলিশের প্রধান ভরা মৌসুম। এই সময়ে নদ-নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ার কথা বড় আকারের ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। তবে বাস্তব চিত্র পুরোই ভিন্ন।

ভরা মৌসুম শুরু হলেও জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। দিনভর নদীতে জাল ফেলেও জেলেদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। এ কারণে একসময় হাঁকডাকে মুখর বরিশালের প্রধান ইলিশ মোকামজুড়ে এখন চলছে সুনসান নীরবতা।

নদ-নদীতে ইলিশ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘ডুবোচর’। নদীর প্রবেশ পথে চর জেগে ওঠায় সাগর থেকে ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। এজন্য নদী শাসন জরুরি বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

শুক্রবার (০২ জুন) দুপুরে সরেজমিনে বরিশাল নগরীর পোর্টরোড পাইকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ আড়তে তালা ঝুলছে না। ঘাটে নেই ইলিশের ট্রলার। ব্যস্ততা নেই মৎস্য শ্রমিকদের। হাতেগোনা কয়েকজন খুচরা বিক্রেতা বসে আছেন মাছের পসরা সাজিয়েছে। তার মধ্যে তিনজন ইলিশ বিক্রি করছেন। তাও আবার ক্রেতাশূন্য।

পোর্টরোড শহীদ জিয়াউর রহমান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার ইয়ার হোসেন শিকদার জানান, তাদের আড়তে মোট ১৭০ জন আড়তদার আছেন। আগে ভরা মৌসুমে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত। বেচাকেনাও কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতো। মৎস্য শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার এবং ক্রেতাদের হাঁকডাকে পুরো মোকাম জমে থাকতো। কিন্তু এখন তা ইতিহাস। এখন ভরা মৌসুমের শুরুতে দিনে ৩০ লাখ টাকাও বেচাকেনা হয় না।

লিয়া আড়তের মালিক নাসির উদ্দিন বলেন, একদিকে নদীতে ইলিশ কম ধরা পড়ছে, অন্যদিকে সাগরের ইলিশ বরিশালে নিয়ে আসা হয় না। পদ্মা সেতু হওয়ার পর থেকে পাথরঘাটা, মহিপুরের ইলিশ সোজা সড়ক পথে ঢাকায় যাচ্ছে। আবার ভোলার ইলিশ বেশিরভাগ যাচ্ছে চাঁদপুরে। গত কয়েকদিন ধরে বরিশাল মোকামে গড়ে ৫০-৬০ মণের ওপরে ইলিশ আসছে না। অথচ এই সময় ইলিশে মোকাম ভরপুর থাকার কথা।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, শুক্রবার এক কেজি সাইজের প্রতিকেজি ইলিশ পাইকারি ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের (এলসি) ইলিশ প্রতি কেজি ২৮০০, ৬০০ গ্রামের ২১০০ এবং ৪০০-৫০০ গ্রামের ইলিশের ১৮শ টাকা দরে বিক্রি হয়। এছাড়া জাটকা ইলিশ প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ১৪শ-১৫শ টাকা দরে।

পোর্টরোড মৎস্য আড়তের ইজিরাদার ও মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল সিকদার বলেন, আগের মত ইলিশ নেই। গত বছর ভরা মৌসুমে এই সময়ে যেখানে ২শ থেকে আড়াইশ মণ ইলিশ আসতো সেখানে এখন তা নেমেছে ১০-২০ মণে। শুক্রবার সারাদিনে ৮-১০ মণ ইলিশ এসেছে মোকামে। ইলিশ কম থাকায় এখন এলসি সাইজের ইলিশের মণ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। আর পাঁচশ গ্রামের ইলিশের মণ ৮০-৮৫ হাজার টাকা। এখন লাখের নদীতে ইলিশ না থাকায় এমন সংকট সৃষ্টি হয়েছে। হয়তো কিছুদিন গেলে ইলিশ বাড়তে পারে।

এদিকে- নদ-নদীতে ইলিশের আকাল থাকায় ধারদেনা করছে চলছে জেলেদের সংসার। এখন তারা অপেক্ষা করছেন বৃষ্টির। জেলেদের ধারণা, বৃষ্টি হলে ইলিশ মিলবে নদীতে।

হিজলার মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করা জেলে আব্দুস সালাম মাঝি বলেন, ‘মেঘসনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর নদী ইলিশের ভাণ্ডার। বিশেষ করে মেঘনা নদী ইলিশের আশ্রম। অথচ এই মেঘনা নদীতেই এখন ইলিশ নেই। সারাদিন জাল ফেলে কোন কোন সময় একটি ইলিশও মেলে না। এ কারণে উপার্জন বন্ধ। আড়াতদারের কাছ থেকে ধারদেনা করে সংসার চলছে। সামনে বৃদ্ধি মৌসুম শুরু হলে নদীতে ইলিশ মিলতে পারে বলেন তিনি।

এদিকে- নদ-নদীতে ইলিশ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে জেগে ওঠা চরগুলোকে দায়ী করেছেন বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান, তিনি বলেন, নদীতে ইলিশ কম। এর কারণ নদী এবং সাগরের মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, নদীতে বড় বড় ‘চর’ পড়েছে। এজন্য অতিরিক্ত স্রোত না থাকায় ইলিশ নদীতে প্রবেশ করতে পারছে না। এখন নদী শাসন বা ড্রেজিং জরুরি। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আমরা একাধিক মিটিং করেছি। নদীর প্রবেশপথগুলো ড্রেজিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এটা করতে পারলে নদ-নদীতে ইলিশের আকাল দূর হবে।

অন্যদিকে এবার জাটকা সংরক্ষণ নিয়েও দুঃসংবাদ দিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বছরে আমাদের টার্গেট থাকে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন বড় ইলিশ সংরক্ষণের। তবে এবার আমাদের সেই লক্ষ্য পূরণ হবে না। পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেট্রিকটন কম আসতে পারে।

তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই জানিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, এবার মা ইলিশের থেকে ৭০-৮০ শতাংশ জাটকা সাগরে গেছে। এখন জাটকাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাছাড়া জুন থেকে ইলিশের প্রধান মৌসুম শুরু হলেও ভরা মৌসুম শুরু হয় জুলাই থেকে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারি বৃষ্টি হলে নদীতে ইলিশ আসবে এবং সংকট কাটবে বলে আশাবাদী এই কর্মকর্তা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow