নাব্য সংকটের অজুহাতে কাটছে না ২০ জেলার মানুষের দুর্ভোগ

উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রামে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্রহ্মপুত্র নদে রৌমারী-চিলমারী ফেরি সার্ভিস চালু হয়। কিন্তু চালুর পর প্রায় আড়াই বছরের মধ্যেই নাব্য সংকটের অজুহাতে অসংখ্যবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে নাব্য সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ফেরি। এতে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলার যানবাহন ও সাধারণ মানুষের ঢাকায় যাতায়াতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী রমনা ঘাট দিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রৌমারী প্রান্ত দিয়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার যানবাহন এ রুট ব্যবহার করে আসছিল। ফেরি সচল থাকলে এ অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২০-১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কম হতো। কিন্তু ফেরি বন্ধ থাকায় পরিবহনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি সময়, জ্বালানি ও ভাড়া বেশি লাগছে বলে জানান ট্রাকচালকরা। ট্রাকচালক ফরিদ মিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পাথর নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। চিলমারীতে ফেরি চ

নাব্য সংকটের অজুহাতে কাটছে না ২০ জেলার মানুষের দুর্ভোগ

উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত জেলা কুড়িগ্রামে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্রহ্মপুত্র নদে রৌমারী-চিলমারী ফেরি সার্ভিস চালু হয়। কিন্তু চালুর পর প্রায় আড়াই বছরের মধ্যেই নাব্য সংকটের অজুহাতে অসংখ্যবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে নাব্য সংকটের কারণে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ফেরি। এতে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলার যানবাহন ও সাধারণ মানুষের ঢাকায় যাতায়াতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী রমনা ঘাট দিয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং রৌমারী প্রান্ত দিয়ে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার যানবাহন এ রুট ব্যবহার করে আসছিল। ফেরি সচল থাকলে এ অঞ্চল থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২০-১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যায়। ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কম হতো। কিন্তু ফেরি বন্ধ থাকায় পরিবহনগুলোকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি সময়, জ্বালানি ও ভাড়া বেশি লাগছে বলে জানান ট্রাকচালকরা।

ট্রাকচালক ফরিদ মিয়া বলেন, প্রতিনিয়ত সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পাথর নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেতে হয়। চিলমারীতে ফেরি চালু হওয়ার পর থেকে অনেক সুবিধা হতো এবং খরচের পাশাপাশি সময়ও কম লাগত।

আরেক ট্রাকচালক হামিদুল ইসলাম বলেন, চিলমারী-রৌমারী রুটে যখন ফেরি চলাচল করত, তখন দুই প্রান্তে পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি থাকত। আমরাও অনেক সাশ্রয়ে পারাপার হতাম। কিন্তু বারবার নাব্য সংকটের কারণে ফেরি বন্ধ থাকায় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ফেরি চালু রাখলে অর্থনৈতিকভাবে এই এলাকা অনেক উন্নত হতো।

প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের নাব্যতা কমে যাওয়ায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়। তবে চলতি মৌসুমে আগাম পলি ভরাটের কারণে চ্যানেল সংকুচিত হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, বালুচর জেগে ওঠা এবং বেসিন এলাকায় পর্যাপ্ত গভীরতা না থাকায় ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এ রুটে নিয়োজিত দুটি ফেরি ‘কদম’ ও ‘কুঞ্জলতা’ রৌমারী প্রান্তে পন্টুনের সঙ্গে চরাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। বেসিন এলাকায় কার্যকর ড্রেজিং না হওয়ায় ফেরি দুটি বালুচরে আটকে রয়েছে। এতে ফেরিগুলোর যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতি ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন এভাবে পড়ে থাকলে সরকারের কয়েক কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নাব্য সংকটের অজুহাতে কাটছে না ২০ জেলার মানুষের দুর্ভোগ

বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে গত বছরের ৬ ডিসেম্বর ড্রেজিংয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়। এছাড়া ১ ও ১৭ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি, ৮ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখেও একাধিকবার পত্র পাঠানো হয়েছে। তবুও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেরি চালু হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১০৪ দিনে ফেরি চলেছে ৯৭ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে ২ হাজার ৮৮৫টি। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে ৬ হাজার ৫৬২টি। আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২১৮ দিনের মধ্যে ফেরি চলেছে মাত্র ৬৮ দিন। এই সময়ে গাড়ি পারাপার হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৫০টি।

২০২৪ সাল থেকে শুরু হয়েছে বিড়ম্বনা। ওই বছরে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন, বন্ধ ছিল ১২৫ দিন। তবে এ বিড়ম্বনা আরও বেড়ে যায় ২০২৫ সালে। ওই বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ফেরি চলেছে ২১৮ দিনের মধ্যে মাত্র ৬৮ দিন।

এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী-রৌমারী অঞ্চলের সহকারী ব্যবস্থাপক (হিসাব) নুরন্নবী সরকার বলেন, এই অঞ্চলে পরিবহনের চাপ ও ফেরির চাহিদা বিবেচনা করে শুকনো মৌসুমে ড্রেজিং জোরদার করলে কমপক্ষে চারটি ফেরি প্রয়োজন হবে। তাহলে সারা বছর সার্ভিস সচল রাখা সম্ভব। জ্বালানি খরচ বিবেচনায় এ রুট নিয়মিত লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফেরি চালু থাকলে কম ড্রাফটের ফেরি নিয়োগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাব্যতা রক্ষায় পরিকল্পিত ও টেকসই উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রয়োজনীয় গভীরতায় খনন না করা, চ্যানেল নির্ধারণে দুর্বলতা এবং সময়মতো ড্রেজিং না হওয়ায় প্রতিবছর একই সংকট তৈরি হচ্ছে। কাগজে-কলমে কাজ দেখালেও বাস্তবে নদী খননে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই।

চিলমারী রমনা ঘাটের হোটেল মালিক রমজান আলী বলেন, ফেরি চলাচল করলে বিভিন্ন এলাকার যানবাহন ও মানুষজন আসত। সে সময় বেচাবিক্রিও বেশ ভালো হতো।

এদিকে ফেরি বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের নৌকায় পারাপার করতে হচ্ছে। বেশি ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় পারাপারে নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে প্রায়ই যাত্রীদের সঙ্গে নৌকা মালিকদের বাকবিতণ্ডা দেখা দিচ্ছে।

তবে নাব্যতা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দাবি করেছে, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও চর সৃষ্টির কারণে নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী সমির পাল বলেন, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ড্রেজিং করে প্রায় ৪০ মিটার খনন করা হচ্ছে। আগামী এপ্রিল অথবা মে মাসের আগে ফেরি চালু করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

এফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow