বাংলাদেশের বগুড়া শহরের ছোট্ট একটি গ্রাম পঁওতা থেকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চ— এই পথচলা সহজ ছিল না।
কিন্তু স্বপ্ন, দৃঢ়তা আর শিল্পের প্রতি গভীর প্রেম একজন শিল্পীকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ পরিচালক ও অভিনেতা সাগর ইসলাম।
স্কুলের ছোট মঞ্চ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া শর্ট ফিল্ম ‘নো ডাইস’, কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন থেকে ভবিষ্যতে কোরিয়ান চলচ্চিত্রে কাজ করার স্বপ্ন— তার যাত্রা একাধারে সংগ্রাম, সাধনা ও আত্মবিশ্বাসের গল্প।
এই সময়ের এক স্বপ্নবাজ শিল্পীর মনোজগতের ভাবনা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তার সাথে কথা বলে এ স্বাক্ষাৎকারটি নির্মাণ করেছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি মৃধা আলাউদ্দিন।
❖ কালবেলা : আপনার বেড়ে ওঠা ও শিল্পের সাথে প্রথম সংযোগটা কেমন ছিলো?
সাগর ইসলাম : আমি ছোটবেলা থেকেই গল্প আর অভিনয়ের মধ্যে বড় হয়েছি। দাড়িদহ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি ছোট ছোট মঞ্চনাটক নিজেই লিখতাম, নির্দেশনা দিতাম, আবার অভিনয়ও করতাম। তখন হয়তো বুঝিনি — কিন্তু এখন মনে হয় ওই সময়টাই আমাকে ভিতর থেকে তৈরি করেছে। স্কুলের ওই ছোট মঞ্চই একসময় আমাকে বড় পর্দার স্বপ্ন দেখিয়েছে।
❖ কালবেলা : শোনা যায় ছোটবেলা থেকেই আপনার সিনেমার প্রতি গভীর টান ছিলো?
সাগর ইসলাম : হ্যাঁ, ছিলো। সত্যি বলতে ছোটবেলায় আমি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেতাম। বিশেষ করে মান্নার সিনেমা আমি খুব দেখতাম। মান্নার সাথে দেখা করার সাধ ছিলো খুব
কিন্তু আমি যখন ক্লাস নাইনে তখন তিনি মারা যান।
সাইকেল চালিয়ে বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, ঘোড়াঘাট— এই এলাকাগুলোর প্রায় ৩০টার মতো সিনেমা হলে নিয়মিত সিনেমা দেখেছি। তখনই অভিনয়ের ভুত মাথায় চাপে।
❖ কালবেলা : এই সিনেমা দেখার যাত্রায় আপনার সাথে কেউ ছিল?
সাগর ইসলাম : হ্যাঁ, আমার বন্ধু আইনুর। আমরা একসাথে সিনেমা দেখতে যেতাম সাইকেল নিয়ে, অর্ধেক রাস্তা আমি চালাতাম অর্ধেক ও চালাতো। সে আমাকে অনেকভাবে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। এখন পিছনে তাকালে বুঝি— ওই সময়গুলোই আমাকে আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে।
❖ কালবেলা : বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অভিনয় ও আবৃত্তি দুটি বিভাগেই প্রথম স্থান অধিকার করা আপনার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলেছিল?
সাগর ইসলাম : ওই অভিজ্ঞতা আমার আত্মবিশ্বাস বদলে দিয়েছিল। আমি বুঝেছিলাম— শিল্পই আমার পথ। আর সে অন্তহীন পথে আমি আজীবন দৃঢ় পায়ে হাঁটতে পারব এমন বিশ্বাস জন্মেছিল।
❖ কালবেলা : মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে আসার ভাবনাটা কবে ও কীভাবে এলো?
সাগর ইসলাম : মঞ্চ আমাকে মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছে। কিন্তু সিনেমা আমাকে মানুষের অনুভূতি দৃশ্য দিয়ে প্রকাশ করতে শিখিয়েছে। আর সিনেমা তো শিল্পের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। এটা আমাকে সীমাহীন হবার প্রেরণা দিয়েছে।
সেই প্রেরণা থেকে কয়েকবছর আগে থেকে টুকটাক শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছি। আর গতবছর আমার স্বপ্নের প্রোজেক্ট ‘নো ডাইস’ শর্টফিল্মটি নির্মাণ করেছি। মূলত গত বছরই আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের টার্নিং পয়েন্ট বলতে পারেন। আর এখন আরো বড় কিছু নিয়ে আরো দূরে যাবার বাসনা জন্মেছে ভেতরে।
❖ কালবেলা : ‘নো ডাইস’ নির্মাণের মূল ভাবনা কী ছিল?
সাগর ইসলাম : আমি চাইছিলাম মানুষ শুধু গল্প না দেখুক— একটা অন্যরকম বোধ সম্পর্কেও জানুক। জীবন, সিদ্ধান্ত আর অস্তিত্ব নিয়ে ভাবুক। আর সেই অন্যরকম ভাবনাবোধই আছে আমার শর্ট ফিল্ম "নো ডাইস" এ।
❖ কালবেলা : আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি পাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাগর ইসলাম : নিজের গল্প অন্য দেশের মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানো— এটা অসাধারণ অনুভূতি। ইটালিতে দুটি পুরস্কার, সর্বশেষ নেপালে পুরস্কার পাওয়াটা আমাকে বুঝিয়েছে যে শিল্পের কোনো বর্ডার, জাতপাত, ধনী-গরীব নাই, শিল্প সবার।
❖ কালবেলা : আপনি নাকি কোরিয়ান ভাষাও জানেন। কোরিয়ান ভাষা শেখার শুরুটা কীভাবে?
সাগর ইসলাম : কোরিয়ান মুভি ‘ওল্ডবয়’ দেখে। তখন মনে হয়েছিলো— আমি সাবটাইটেল ছাড়া সিনেমা বুঝতে চাই। সেখান থেকেই কোরিয়ান ভাষা শেখার শুরু।
❖ কালবেলা : আপনি তাহলে কোরিয়ান সিনেমার বড় ভক্ত— তাই কী?
সাগর ইসলাম : আমি শুধু কোরিয়ান মুভির ভক্ত না— আমি সংগ্রাহকও। আমার কাছে কোরিয়ান বেশকিছু মুভির ডিরেক্টরস কাট কালেক্টরস এডিশন ডিভিডিও সংগ্রহে আছে।
আমি কোরিয়ান মুভি স্টাডি করি। তাদের গল্প বলার স্টাইল, অ্যাক্টিং, মেকিং আমাকে ভীষণ টানে।
❖ কালবেলা : কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষক হিসেবেও নাকি কাজ করেন আপনি?
সাগর ইসলাম : জ্বি। কোরিয়াতে উচ্চশিক্ষা বা জবের জন্য যারা আগ্রহী তাদেরকে কোরিয়ান শিখাই। ভাষা শেখানো মানে সংস্কৃতি শেখানো, চিন্তা প্রকাশে একটা নতুন মাত্রা ও রঙ মাখানো। এটা আমার কাছে খুব গর্বের বিষয়।
❖ কালবেলা : কোরিয়ান দূতাবাস আয়োজিত বক্তব্য প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
সাগর ইসলাম : কোরিয়ান বক্তব্য প্রতিযোগিতায় দুবার পুরস্কার পাওয়া — এটা আমার কোরিয়ান ভাষা শেখা বা জানার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি বলে মনে করি।
❖ কালবেলা : ভবিষ্যতে কোরিয়ান চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছা আছে?
সাগর ইসলাম : অবশ্যই আছে। আমি ভবিষ্যতে কোরিয়ান সিনেমায় কাজ করতে চাই। সেই লক্ষ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করছি। আশা করি খুব শিগগিরই সেই সুখবরটা দিতে পারবো।
❖ কালবেলা : এই স্বপ্নের পথে আপনাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি দেয় কে?
সাগর ইসলাম : কোরিয়াতে আমার জীবনসঙ্গী আছেন কানিজ ফাতেমা জ্যোতি। তিনি আমাকে সর্বাত্মকভাবে প্রেরণা দেন। কোরিয়া সম্পর্কিত সব বিষয়ে আমাকে সহযোগিতা করেন। এটা আমার জন্য বড় শক্তি।
❖ কালবেলা : আপনার কাছে সিনেমা কী?
সাগর ইসলাম : আমার কাছে সিনেমা মানে একটা জগত। যা মানুষের ভেতরের ভয়, প্রশ্ন, ফ্যান্টাসি আর আশা নিরাশার গল্প বলার একটা জায়গা।
❖ কালবেলা : নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
সাগর ইসলাম : স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না। স্বপ্নপূরণ না হলেও স্বপ্নের পেছনে ছোটার মধ্যেও একটা অর্থবহ অনুভূতি আছে।
আর সত্যিকারের অনুভূতি থেকেই বড় শিল্প তৈরি হয়।
স্বপ্নবাজ সাগর ইসলাম : ছোটবেলার সিনেমাহল থেকে শুরু হওয়া এক কিশোরের স্বপ্ন আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছেছে। সাগর ইসলামের গল্প শুধু একজন শিল্পীর সাফল্যের গল্প নয়— এটি এক অনমনীয় বিশ্বাসের গল্প।
ভাষা, সংস্কৃতি ও শিল্প— এই তিনের সেতুবন্ধন তৈরি করে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। ভবিষ্যতে কোরিয়ান চলচ্চিত্রে কাজ করার স্বপ্নপূরণ হলে হয়তো এই যাত্রা আরও বিস্তৃত হবে।
স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে সেই স্বপ্নের পথে নিরন্তর হাঁটা— এই পথেই তৈরি হয় সত্যিকারের শিল্পী।