পরিবার হোক কল্যাণ ও ভালোবাসার উৎস

প্রত্যেক মানুষের নিরাপদ আশ্রয় পরিবারে। মানুষ পরিবারেই বেড়ে ওঠে এবং পরিবারেই আশ্রয় গ্রহণ করে। আবহমানকাল থেকেই মানুষের মূল কেন্দ্র পরিবার। পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.) ও প্রথম মানবী হাওয়াকে (আ.) কেন্দ্র করে মানবজাতির প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল জান্নাতে। এই প্রথম পরিবারের সদস্য স্বামী ও স্ত্রীকে উদ্দেশ করে মহান আল্লাহ বলেছিলেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান কর এবং সেখান থেকে যা চাও খুশি মনে খাও। কিন্তু তোমরা দুজন এই গাছটির কাছে যেও না। তাহলে তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সুরা বাকারাহ : ৩৫)। পরবর্তীকালে তারা পৃথিবীতে আগমন করেন এবং এই প্রথম পরিবার থেকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে মানব জাতি। প্রথম এ দম্পতি থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানাদির মাধ্যমে পৃথিবীতে সূচিত হয় পরিবার ও পারিবারিক ব্যবস্থা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদের একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ওই দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে প্রত্যাশা করো এবং আত্মীয়তার ব

পরিবার হোক কল্যাণ ও ভালোবাসার উৎস

প্রত্যেক মানুষের নিরাপদ আশ্রয় পরিবারে। মানুষ পরিবারেই বেড়ে ওঠে এবং পরিবারেই আশ্রয় গ্রহণ করে। আবহমানকাল থেকেই মানুষের মূল কেন্দ্র পরিবার। পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.) ও প্রথম মানবী হাওয়াকে (আ.) কেন্দ্র করে মানবজাতির প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল জান্নাতে। এই প্রথম পরিবারের সদস্য স্বামী ও স্ত্রীকে উদ্দেশ করে মহান আল্লাহ বলেছিলেন, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান কর এবং সেখান থেকে যা চাও খুশি মনে খাও। কিন্তু তোমরা দুজন এই গাছটির কাছে যেও না। তাহলে তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’ (সুরা বাকারাহ : ৩৫)। পরবর্তীকালে তারা পৃথিবীতে আগমন করেন এবং এই প্রথম পরিবার থেকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে মানব জাতি। প্রথম এ দম্পতি থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানাদির মাধ্যমে পৃথিবীতে সূচিত হয় পরিবার ও পারিবারিক ব্যবস্থা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদের একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ওই দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে প্রত্যাশা করো এবং আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সদা সতর্ক তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা নিসা: ১)। একইভাবে সব নবী-রাসুলের ব্যক্তিগত জীবনে ও সময়কালে পরিবার বিদ্যমান ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তোমার আগেও আমরা অনেক রাসুল প্রেরণ করেছি এবং তাদের স্ত্রী ও সন্তানাদি দিয়েছি।’ (সুরা রাদ : ৩৮)।

পরিবার বোঝাতে আরবিতে ‘আহল’ ও ‘বাইত’ শব্দগুলো ব্যবহৃত হয় এবং পবিত্র কোরআনে শব্দগুলো পরিবার অর্থে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। কোরআনের এ আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, মানবতার ধর্ম ইসলাম পরিবার ও পারিবারিক জীবনের ওপর যথেষ্ট তাগিদ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে পরিবারের অপরিহার্যতার দিকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। পারিবারিক জীবন ছাড়া মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। মানুষের অস্তিত্বের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, উন্নতি-অগ্রগতি ইত্যাদি সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পারিবারিক জীবন অশান্ত ও নড়বড়ে হলে তাতে ভাঙন ও বিপর্যয় দেখা দিলে সমাজ জীবনে নানা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। পরিবারেই মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে এবং তাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তার নিদর্শনের একটি হচ্ছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পারো। তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এতে চিন্তাশীলদের জন্য আছে চিন্তার অনেক উপাদান।’ (সুরা রুম: ২১)। পরিবারে মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি একত্রে বসবাস করে। একসঙ্গে থাকার ফলে একে অপরের সুখে সুখী হয়, একে অপরের দুঃখে সমব্যথী হয়। এভাবে পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে।

পরিবারের অন্যতম কাজ হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা। পরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডি ও নিরাপদ আলয়ে মানুষ তার আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে এবং তার সহজাত কামনা-বাসনা পূরণ করতে পারে। মহান স্রষ্টা এই প্রশান্তি ও নিরাপত্তার উৎস হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের গৃহকে বানিয়েছেন অবস্থানের জায়গা।’ (সুরা নাহল: ৮০)। আরবি ‘সাকানা’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যার মাধ্যমে মানুষ প্রশান্তি ও তৃপ্তি লাভ করে। ঘরে প্রবেশ করার সময় ঘরে অবস্থানকারীদের সালাম দেওয়া জরুরি। পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ করো, তখন (ঘরে অবস্থানকারী) তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এটা আল্লাহর কাছ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র দোয়া। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতগুলো বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা বুঝে নাও।’ (সুরা নুর : ৬১)। এ আয়াতে ঘরে প্রবেশের আগে ঘরে অবস্থানকারীদের সালাম দেওয়াকে কল্যাণ লাভের মাধ্যম এবং দোয়া হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সালামের বিনিময়ে মহান আল্লাহতায়ালা রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ দান করবেন।

একটি আদর্শ পরিবারের ভিত্তি গৃহের সদস্যদের মধ্যকার আন্তরিক ও নিবিড় সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। পরস্পরের প্রতি দায়িত্বানুভূতি পরিবারের বন্ধনকে দৃঢ় ও অটুট রাখে। পরিবারের সদস্যরা যদি স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার করে নিজেদের মধ্যকার বন্ধনকে ধরে রাখতে পারে, তবে মানবীয় উৎকর্ষতা ও পূর্ণতা অর্জন সহজতর হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের বাহ্যিক পরিশীলতার চেয়ে আত্মিক শুদ্ধতা ও পবিত্রতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর পরিবারের সদস্যদের আন্তরিক ও নিবিড় পরিবেশে ভালোবাসা ও মমতার ছোঁয়ায় মানুষের আত্মগঠন ও সংশোধন সহজতর হয়। পারিবারিক জীবন যে শুধু দুনিয়াতেই কল্যাণ বয়ে আনে এবং এ বন্ধন যে কেবল পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়, বরং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য এ বন্ধন জান্নাতেও বিদ্যমান থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তা হলো স্থায়ী বসবাসের জান্নাত। তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের সৎকর্মশীল বাপ-দাদা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। ফেরেশতারা তাদের কাছে আসবে প্রতিটি দরজা দিয়ে।’ (সুরা রাদ : ২৩)।

পবিত্র কোরআনের আলোকে ‘পরিবার’ হচ্ছে এমন একটি সংগঠন, যার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এর সদস্যদের, যেমন—স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা ও সন্তানদের আত্মিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং তাদের সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শস্বরূপ করুন।’ (সুরা ফুরকান ৭৪)। এ আয়াতে একটি আদর্শ সমাজ গঠনের জন্য পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে একটি দেশ বা রাষ্ট্র গঠিত হয়। তাই ব্যক্তি ভালো হলে পরিবার ভালো হবে, পরিবার ভালো হলে সমাজ ভালো হবে। আর সমাজ ভালো হলে দেশ ভালো চলবে। সমাজে এখনো বহু ভালো মানুষ আছেন, যারা প্রকৃতপক্ষেই চান যে, সমাজে ভালো মানুষই থাকুক, মানবরূপী কোনো দানব না থাকুক। ব্যক্তি সংশোধনের মাধ্যমে পরিবার ঠিক করে ওইসব মানবরূপী দানবকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে পারিবারিক শান্তিশৃঙ্খলা এবং দৃঢ় করতে হবে পারস্পরিক সম্পর্কের সেতুবন্ধ। এ ক্ষেত্রে একে অন্যের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে সুন্দর পরিবার গঠন ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য।

পরিবারের মূল চাবিকাঠি থাকে পিতা-মাতার হাতেই। আর সব পিতা-মাতাই চান তাদের সন্তান ভালো হোক, ভালোভাবে চলুক এবং নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক। তাই সুন্দর একটি পরিবার গড়ে তুলতে পিতা-মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও চিরন্তন। সন্তানকে সুপথে চালিত করতে তাদেরই ভূমিকা পালন করতে হবে। উল্লেখ্য যে, পরিবারের সদস্যরা যখন আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন থাকবে; স্ত্রী তার অধিকার পূর্ণভাবে লাভ করবে; স্বামী যখন স্ত্রীর কাছে তার অধিকার পাবে, সন্তান পিতা-মাতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করবে ও তাদের অধিকার পাবে; আত্মীয়স্বজন যখন পরস্পরের যথাযথ সম্মান-মর্যাদা পাবে, তখন কোনো স্ত্রী অধিকারের দাবিতে প্রকাশ্য রাজপথে বের হবে না, কোনো স্বামী ভালোবাসা ও সুন্দর জীবনযাপনের প্রত্যাশায় অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হবে না, কোনো সন্তানই পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করবে না। বরং পরিবারে স্থাপিত সুসম্পর্কের কারণে আল্লাহর রহমত-বরকতের ফল্গুধারা বর্ষিত হবে।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow