পলাশীর আম্রকানন থেকে আজকের বাংলাদেশ

পলাশী। একটি আমবাগান, একটি স্থানের নাম। শব্দটি সবার চেনা। অনেক শোনা। সবারই জানা। প্রতিদিন অনেকবার হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন আসে, ট্রেন যায় পলাশী স্টেশন ছুঁয়ে। পলাশী শব্দটার আড়ালে কারো কারো চোখে ভেসে ওঠে হাজারো কষ্টের গান, কান্নার আওয়াজ। বাংলার আকাশে নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে এই প্রান্তরেই। শাসকের স্থান দখল করে নিয়েছিল ভিনদেশি শোষক। রাতারাতি ভুলিয়ে দেওয়া হয় গৌরবময় ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়। নেমক হারামির মরীচিকায় আটকা পড়ে মানবিক মূল্যবোধ। ১৭৫৭ সাল। জুন মাসের ২৩ তারিখ। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা রাখেন নবাবের সেনাপতি মীর জাফর আলী খানসহ অনেকেই। দেশপ্রেমের কষ্টিপাথরে নিজেকে প্রমাণ করলেও বাংলার বিজয় নিশ্চিত করতে পারলেন না নবাব সিরাজউদ্দৌলা। হেরে গেলেন কতিপয় ইংরেজ সেনার কূটকৌশলের কাছে। অবশেষে জীবন দিয়ে নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রমাণ করলেন। কবি ফররুখ আহমদের ভাষায়, ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদি রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী’। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলেন নবাব। মূলত এটি কোনো যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল প্রহসন। ইতিহাসের ঘৃণ্যতম বিশ্বাসঘাতকতার খেলা। ভেতর ও বাইরের ষড়যন্ত্রের ফসল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কূটকৌ

পলাশীর আম্রকানন থেকে আজকের বাংলাদেশ

পলাশী। একটি আমবাগান, একটি স্থানের নাম। শব্দটি সবার চেনা। অনেক শোনা। সবারই জানা। প্রতিদিন অনেকবার হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন আসে, ট্রেন যায় পলাশী স্টেশন ছুঁয়ে। পলাশী শব্দটার আড়ালে কারো কারো চোখে ভেসে ওঠে হাজারো কষ্টের গান, কান্নার আওয়াজ। বাংলার আকাশে নতুন ইতিহাস লেখা হয়েছে এই প্রান্তরেই। শাসকের স্থান দখল করে নিয়েছিল ভিনদেশি শোষক। রাতারাতি ভুলিয়ে দেওয়া হয় গৌরবময় ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়। নেমক হারামির মরীচিকায় আটকা পড়ে মানবিক মূল্যবোধ।

১৭৫৭ সাল। জুন মাসের ২৩ তারিখ। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা রাখেন নবাবের সেনাপতি মীর জাফর আলী খানসহ অনেকেই। দেশপ্রেমের কষ্টিপাথরে নিজেকে প্রমাণ করলেও বাংলার বিজয় নিশ্চিত করতে পারলেন না নবাব সিরাজউদ্দৌলা। হেরে গেলেন কতিপয় ইংরেজ সেনার কূটকৌশলের কাছে। অবশেষে জীবন দিয়ে নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রমাণ করলেন। কবি ফররুখ আহমদের ভাষায়, ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদি রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী’।

পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলেন নবাব। মূলত এটি কোনো যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল প্রহসন। ইতিহাসের ঘৃণ্যতম বিশ্বাসঘাতকতার খেলা। ভেতর ও বাইরের ষড়যন্ত্রের ফসল। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও কূটকৌশলের ফল। পলাশীর ঘটনা সম্পর্কে লর্ড মেকলে বলেছেন, ‌‌‘আমরা যখন ভারতীয়দের পরাভূত করি; তখন তারা সংখ্যায় ছিল আমেরিকার অধিবাসীদের তুলনায় কম করে দশগুণ। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার মান ছিল বিজয়ী স্পেনীয়দের সমতুল্য। তাদের সভ্যতাও স্পেনীয়দের মতো উচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। তারা সারাগোসা এবং টলেডোর চেয়ে বড় বড় শহর নির্মাণ করে। তাদের অট্টালিকা সেভিলের গির্জার চেয়ে সুন্দর ও ব্যয়বহুল ছিল। ভারতের ব্যাংকার-শেঠেরা ছিল বার্সিলোনা ও ক্যাডিজের ব্যাংকারদের চেয়ে ধনী। এদের রাজদূতেরা ফার্দিনান্দ দ্য ক্যাথলিকের চেয়ে চাকচিক্যময়। এদের বিরাট অশ্বারোহী এবং গোলন্দাজ সেনাদল দেখলে গ্রেট কাপ্তানও বিস্ময় মানতেন।’

তবু বিশ্বাসঘাতকতার কাছে হেরে যান নবাব। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এ পরাজয় শুধু নবাবের। এ পরাজয়ের মাশুল দেবে নবাব পরিবার। এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। পলাশীর পরাজয় শুধু নবাবের বিপদ ডাকেনি। পুরো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন করে দিয়েছে। সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি করেছে। মুসলমানদের অস্তিত্বের বিনাশ সাধন করেছে। এ যুদ্ধে শুধু বাংলা নয়, পুরো ভারতবর্ষ ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশ রাজশক্তির পদানত হয়। পলাশীর পরাজয়ের পরেই শুরু হয় নোংরা খেলা। বাংলায় মুসলমানদের নৈতিকতা ও সংস্কৃতির ওপর চলতে থাকে নিষ্ঠুর ও হৃদয়হীন হামলা। মিথ্যা আরোপ, অপপ্রচার ও সন্ত্রাস ছড়িয়ে মুসলিম সমাজকে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। দ্বৈতশাসন, নিলামি বন্দোবস্ত, দশ সালা বন্দোবস্ত, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, পত্তনি ব্যবস্থা, সূর্যাস্ত আইনসহ নানা ঘোরপ্যাঁচে মুসলিম নাগরিক জীবন তছনছ হয়ে পড়ে। সূর্যাস্ত আইনের ফলে নিলামে জমিদারি বিক্রয়, নতুন জমিদারের আবির্ভাব, প্রজাদের ওপর খাজনা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। শুরু হয় ঘন ঘন দুর্ভিক্ষ। এ সময় মুসলমান জনগোষ্ঠী আমির থেকে ফকিরে পরিণত হয়। ফলে নবাবি আমলের মাদরাসা, পাঠশালা, টোল প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোম্পানি আমলে বিলীন হয়ে যায়। ইংরেজ ও ব্রিটিশ শাসকশক্তি মুসলিম নিধনে ছিল সিদ্ধহস্ত। এখানকার মুসলিম বিদ্বেষী অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো সেই সুযোগ গ্রহণ করেছিল।

মুসলমানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুকৌশলে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন করা হয় সেখানে। এসব স্কুলে বাংলা ভাষায় যেসব পাঠ্যপুস্তক ছিল, তা সবই হিন্দু ধর্মের ইতিহাস-ঐতিহ্য নির্ভর। সূক্ষ্মভাবে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ছিল ব্রিটিশদের অন্যতম কৌশল। হিন্দু জমিদাররা ইসলামের সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত হানতে শুরু করেন। ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকেন। তারাগুনিয়ার জমিদার রামনারায়ণ, কুরগাছির জমিদারের নায়েব গৌরপ্রসাদ চৌধুরী, পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় প্রমুখ ছিলেন মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালানোর প্রধান ব্যক্তি। জমিদার কৃষ্ণদেব রায় ফরমান জারি করেন—
প্রথমত, যারা তিতুমীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করবে, দাড়ি রাখবে, গোঁফ ছাঁটবে তাদের দাড়ির জন্য আড়াই টাকা এবং গোঁফের জন্য পাঁচসিকা করে খাজনা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মসজিদ তৈরি করলে কাঁচা মসজিদের জন্য পাঁচশ টাকা এবং প্রতি পাকা মসজিদের জন্য এক হাজার টাকা করে জমিদারকে নজরানা দিতে হবে।
তৃতীয়ত, আরবি নাম রাখলে প্রত্যেক নামের জন্য খারিজানা ফিস পঞ্চাশ টাকা জমিদারকে জমা দিতে হবে।
চতুর্থত, গরু হত্যা করলে তার ডানহাত কেটে নেওয়া হবে। যাতে আর কোনোদিন গো-হত্যা করতে না পারেন।
আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে এই জরিমানার মূল্যমান কত টাকা, তা হিসেব করলে গা শিউরে ওঠে। মুসলমানরা আর কত সহ্য করবেন। আর মুখ বুজে থাকা যাবে না। তারা জেগে ওঠার জন্য শপথ নিলেন।

মুসলমানদের পুনর্জাগরণের পথে ফিরিয়ে আনতে কাজ শুরু করেন। সৈয়দ আহমদ বেরলভীর বালাকোট আন্দোলন ছিল মুসলমানদের মুক্তির জন্য অন্যতম সংগ্রাম। সংগ্রামে জেগে ওঠেন মীর নেসার আলী তিতুমীর। বাঁশের কেল্লা গড়ে তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করেন। তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হলেন। তবুও ইংরেজদের কাছে পরাজয় মেনে নেননি। মুসলমান সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে আন্দোলন শুরু করেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। তাঁর ফারায়েজি আন্দোলন সারা বাংলায় মুসলমানদের মধ্যে নতুন চেতনা জাগায়। তাঁর পুত্র হাজী মোহসীন উদ্দীন আহমদ দুদু মিয়াও সেই আন্দোলনকে সামনের দিকে নিয়ে যান। এভাবে কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, ফকির বিদ্রোহ, পাগলা বিদ্রোহ ইত্যাদি জনপ্রতিরোধের মাধ্যমে বাংলার কৃষিজীবী গ্রামীণ মানুষ বরাবরই উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে।

১৮৫৭ সালে ঘটে গেল সর্ব-ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমরা অনেকেই এটাকে সিপাহী বিদ্রোহ বলে জানি। কিন্তু এটা ছিল সর্ব-ভারতীয় প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। এ সংগ্রামে মুসলমানদের পরাজয় ঘটে। কোম্পানির শাসনের পরিবর্তে ক্ষমতার মালিক হয় ব্রিটিশ। তারা আরও বেশি সুকৌশলী ভূমিকায় রাজত্ব করতে থাকে। মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে ভাবনার উদয় হতে থাকলো। হাজী মুহম্মদ মহসীন এবং তাঁর বোন মন্নুজান সমুদয় সম্পত্তি দিয়ে মুসলিম সমাজে শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। নবাব আবদুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলী নতুনভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ তৈরি করলেন। ক্রমশ মুসলমান সমাজে শিক্ষার আলো জ্বলতে শুরু করে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অসংখ্য গুণীব্যক্তিত্বের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুসলমানরা আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে। তাঁদেরই প্রচেষ্টার ফসল আজকের বাংলাদেশ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow